যখন ছোট ছিলাম গ্রন্থ অবলম্বনে গড়পারের বাড়ি থেকে ভবানীপুর বাড়িতে কী কী পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিলেন সত্যজিৎ রায় তা আলোচনা করো।
যখন ছোট ছিলাম গ্রন্থ অবলম্বনে গড়পারের বাড়ি থেকে ভবানীপুর বাড়িতে কী কী পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিলেন সত্যজিৎ রায় তা আলোচনা করো পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,সত্যজিৎ রায়ের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ 'যখন ছোট ছিলাম' তাঁর শৈশবস্মৃতির এক অনন্য দলিল। এই গ্রন্থে উত্তর কলকাতার গড়পার রোড থেকে দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরে স্থানান্তরের ঘটনাটি কেবল একটি আবাসন পরিবর্তন ছিল না, বরং লেখকের দৃষ্টিতে তা ছিল জীবনযাত্রার এক আমূল পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের প্রধান দিকগুলো হলো-
গড়পারের বাড়িটি ছিল রায়ের পৈতৃক ভিটা, যেখানে তাঁর পিতা সুকুমার রায় এবং পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী বাস করতেন। সেখানে একটা আভিজাত্য এবং শিল্পীসুলভ পরিবেশ ছিল। অন্যদিকে, ভবানীপুরের বকুলবাগানের বাড়িটি ছিল তাঁর মাতুলালয়।গড়পারের বাড়ির বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি লিখেছেন-
"আমাদের গড়পারের বাড়িটার মতো অত বড়ো বাড়ি আমি আর দেখিনি।... একতলায় ছিল ছাপাখানা, দোতলায় আমরা থাকতাম, আর তেতলায় ছিল বড়ো বড়ো স্টুডিও।"
ভবানীপুরের বাড়িটি ছিল তুলনায় ছিমছাম এবং গলিঘুঁজির মধ্যে। সেখানে গড়পারের মতো সেই বিশাল ছাদ বা বড় বড় ঘর ছিল না।
গড়পারের বাড়িতে সত্যজিৎ বড় হয়েছিলেন একান্নবর্তী পরিবারের আভিজাত্যে। সেখানে ইউ রায় অ্যান্ড সন্স-এর ছাপাখানা থাকার কারণে যন্ত্রের শব্দ এবং ব্লকের গন্ধ ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। কিন্তু ভবানীপুরে এসে তিনি পেলেন মামারবাড়ির আদর এবং এক ভিন্ন ধরণের সরগরম পরিবেশ।ভবানীপুরের স্মৃতি নিয়ে তিনি লিখেছেন-
"ভবানীপুরে এসেই আমার নতুন এক ধরণের জীবন শুরু হল। সেখানে পিসতুতো-খুড়তুতো ভাইবোনদের বদলে পেলাম একগাদা মামাদের।"
গড়পারের দিনগুলো ছিল অনেকটা শৃঙ্খলাপরায়ণ এবং কিছুটা গাম্ভীর্যপূর্ণ। কিন্তু ভবানীপুরে তিনি দেখলেন অনেক বেশি সামাজিক মেলামেশা। গড়পারের বাড়িতে তাঁর পিতা সুকুমার রায়ের অসুস্থতা এবং মৃত্যুর ছায়া ছিল বিষণ্ণ। ভবানীপুরে সেই শোকের ছায়া কাটিয়ে তিনি অনেকটা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠেন।গড়পার থেকে ভবানীপুরে যাওয়ার পর তাঁর কাছে যাতায়াতের মাধ্যমগুলো বদলে গেল। উত্তর কলকাতার চওড়া রাস্তা আর ট্রামলাইনের বদলে দক্ষিণ কলকাতার শান্ত পরিবেশ তাঁকে আকর্ষণ করত। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে ভবানীপুর অঞ্চলটি তখন উত্তর কলকাতার তুলনায় অনেক বেশি ফাঁকা এবং গাছপালা সমৃদ্ধ ছিল।
গড়পারের বাড়িতে পড়ার ঘরের চেয়ে ছাপাখানার কাজ তাঁকে বেশি টানত। সেখানে তিনি ব্লক তৈরি বা প্রুফ সংশোধন দেখতেন। কিন্তু ভবানীপুরে আসার পর তাঁর জীবনে পড়াশোনা এবং স্কুলে যাতায়াতের গুরুত্ব বেড়ে যায়। বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর যাতায়াতের গণ্ডি আরও বেড়ে যায়।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,সত্যজিৎ রায়ের ভাষায়, গড়পার ছিল তাঁর 'শৈশবের ভিত্তি', আর ভবানীপুর ছিল তাঁর 'কৈশোরের উন্মেষ'। গড়পার তাঁকে দিয়েছিল শিল্পের উত্তরাধিকার, আর ভবানীপুর দিয়েছিল সামাজিক সজীবতা। তাঁর স্মৃতিচারণে এই দুই বাড়ির পার্থক্য কেবল ইটের দেয়ালের ছিল না, বরং তা ছিল দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির মেলবন্ধন।
Comments
Post a Comment