Skip to main content

উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণ ও সমাজ সংস্কারের ইতিহাসে রাজা রামমোহন রায় এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্মসমাজের ভূমিকা আলোচনা করো।।

উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণ ও সমাজ সংস্কারের ইতিহাসে রাজা রামমোহন রায় এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্মসমাজের ভূমিকা আলোচনা করো।

       আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,রাজা রামমোহন রায় আধুনিক ভারতের জনক। আসলে রাজা রামমোহন রায় ছিলেন প্রথম ভারতীয়, যিনি মধ্যযুগীয় কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলে আধুনিক ও যুক্তিবাদী সমাজ গঠনের ডাক দিয়েছিলেন।আবার সেইসাথে-

       রামমোহনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো সতীদাহ প্রথা রোধ।শাস্ত্রীয় প্রমাণ দিয়ে তিনি দেখিয়েছিলেন যে সহমরণ কোনো ধর্মীয় আবশ্যিকতা নয়। তাঁর আন্দোলনের ফলেই ১৮২৯ সালে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৭ নং রেগুলেশন জারি করে এই নিষ্ঠুর প্রথা নিষিদ্ধ করেন।শুধু তাই নয়- তিনি বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহের বিরোধিতা করেন এবং সম্পত্তিতে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানান।যেখানে-

           রামমোহন রায় হিন্দুদের পৌত্তলিকতা ত্যাগ করে এক পরম ব্রহ্মের উপাসনা করার কথা বলেন, যা মূলত 'বেদান্ত' ও 'উপনিষদ' ভিত্তিক।

 ব্রাহ্মসমাজের ভূমিকা ও প্রসার

        ১৮২৮ সালে রামমোহন 'ব্রাহ্মসভা' প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরে ১৮৩০ সালে ব্রাহ্মসমাজে পরিণত হয়। তাঁর পরবর্তী সময়ে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কেশবচন্দ্র সেনের নেতৃত্বে এই সমাজ আন্দোলন আরও তীব্র হয়।

         ব্রাহ্মসমাজ মূর্তিপূজা, যজ্ঞ এবং পুরোহিততন্ত্রের বিরোধিতা করে একেশ্বরবাদ প্রচার করে। জাতিভেদ প্রথা ও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে তারা সরব হয়। ব্রাহ্ম আন্দোলনের ফলে বাংলায় নারী শিক্ষার প্রসার ঘটে। কেশবচন্দ্র সেনের উদ্যোগে 'বামাবোধিনী' পত্রিকা নারীদের সচেতন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। আন্তঃবর্ণ বিবাহ (এক জাতির সাথে অন্য জাতির বিবাহ) শুরু করার ক্ষেত্রেও ব্রাহ্মদের অবদান অনস্বীকার্য।

           ব্রাহ্মসমাজ মদ্যপান, বাল্যবিবাহ এবং অশিক্ষা দূর করতে নিরলস কাজ করে। তারা বিধবা বিবাহের পক্ষেও জোরালো জনমত গড়ে তোলে।যদিও-ব্রাহ্ম আন্দোলন প্রধানত শহরকেন্দ্রিক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং সাধারণ গ্রামবাংলার মানুষের কাছে পৌঁছাতে কিছুটা ব্যর্থ হয়েছিল, তবুও এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।

        পরিশেষে বলা যায় যে,রাজা রামমোহন রায় এবং ব্রাহ্মসমাজ না থাকলে বাংলার সমাজ সংস্কার আন্দোলন গতি পেত না। তাঁদের লড়াইয়ের ফলেই বাঙালি সমাজ অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্ত হয়ে আধুনিকতার পথে পা বাড়াতে শুরু করে। এজন্যই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রামমোহনকে 'ভারতপথিক' বলে অভিহিত করেছেন।


Comments

Popular posts from this blog

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর।

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মাইনর সিলেবাস)  ১)চার্বাক মতে ভূত কয়টি ও কি কি? উত্তরঃচার্বাক মতে ভূত চারটি- ক্ষিতি, অপ্ , তেজ ও মরুৎ ২) স্বভাববাদ কী? উত্তরঃ চার্বাক জড়বাদের ভিত্তি হল স্বভাববাদ। যে মতবাদ অনুসারে স্বভাব থেকেই ভূত সৃষ্টি, আবার স্বভাব থেকেই বিচ্ছেদ। যার জন্য ঈশ্বরকে স্বীকার করা প্রয়োজন নেই। ৩) অব্যাপ্যদেশ কথাটির অর্থ লেখো। উত্তরঃ অব্যাপ্যদেশ বলতে বোঝায়- অশাব্দ অর্থাৎ যাকে শব্দের দ্বারা প্রকাশ করা যায় না। ৫) জ্ঞান লক্ষণ প্রত্যক্ষ কাকে বলে?  কোন একটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তার নিজের বিষয়ীভূত গুণ ছাড়াও যদি অপর একটি ইন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূত গুণকে প্রত্যক্ষ করার হয়, তাহলে সেই প্রত্যক্ষকে জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ বলা হয়। ৬) ন্যায় মতে প্রমাণের প্রকার  উত্তরঃ ন্যায় মতে প্রমাণ চার প্রকার। প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান এবং শাব্দ। ৭) সন্নিকর্ষ কাকে বলে? উত্তরঃ ন্যায় মতে ইন্দ্রিয় ও কোন বাস্তব পদার্থের মধ্যে একপ্রকার বিশেষ সম্পর্ক ঘটলে তবেই আমাদের একটি বস্তুর প্রত্যক্ষজ্ঞান ।আর ঐ বিশেষ বিশেষ সম্পর্কের পারিভাষিক নাম হলো সন...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...

ব্রিটিশ(3rd.Sem) পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর সিলেবাস)।         আমরা জানি যে,ব্রিটেনের সংবিধান অলিখিত বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি, পার্লামেন্ট প্রণীত আইন প্রভৃতির মাধ্যমে পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট আইনানুগ সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব নয়। আর সেখানে ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে আইনানুগ সার্বভৌমত্ব বলা হয়, কারণ-       যেকোনো বিষয়ে পার্লামেন্ট আইন প্রণনয়নের অধিকারী। তবে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হওয়ায় পার্লামেন্টে কোন আইন প্রণয়নের সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না। আসলে সেখানে কমন্সসভা তথা নিম্নকক্ষের সার্বভৌমত্বকেই বলা হয় পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব।     ••ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে সার্বভৌমত্ব বলার কারণ- ১) পার্লামেন্টের ওপর আইনগত কোনরূপ বাধানিষেধ আরোপ করা যায় না। ২) পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের বৈধতার ব্যাপারে আদালত কোন প্রশ্ন তুলতে পারেনা। ব্রিটেনের আদালত পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের ওপর বিচার বি...