Skip to main content

থমাস হবসের সামাজিক চুক্তি মতবাদ ব্যাখ্যা করো।

থমাস হবসের সামাজিক চুক্তি মতবাদ ব্যাখ্যা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রথম সেমিস্টার।

         আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,সপ্তদশ শতাব্দীর ইংরেজ দার্শনিক থমাস হবস তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'লেভিয়াথান' (Leviathan, ১৬৫১)-এ সামাজিক চুক্তি মতবাদের মাধ্যমে রাষ্ট্রের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর এই দর্শনের মূল ভিত্তি হলো মানবপ্রকৃতি এবং প্রকৃতির রাজ্য।আর সেখানে-

        হবসের মতে মানব প্রকৃতি হলো- মানুষ স্বভাবগতভাবেই স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক এবং ক্ষমতালোভী। মানুষ কেবল নিজের আনন্দ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়। তিনি বিশ্বাস করতেন যে মানুষের সমস্ত কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় আবেগ ও কামনার দ্বারা, যেখানে যুক্তির স্থান গৌণ।যেখানে

    হবসের মতে প্রকৃতি রাজ্য হলো-রাষ্ট্র সৃষ্টির পূর্বে মানুষ যেখানে বাস করত, হবস তাকে 'প্রকৃতির রাজ্য' বলে অভিহিত করেছেন। হবসের বর্ণনায় এই অবস্থা ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। আর সেখানে আমরা দেখতে পাই -

        •যেহেতু মানুষের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না, তাই প্রকৃতির রাজ্য ছিল "সকলের বিরুদ্ধে সকলের যুদ্ধ" (War of all against all)। শুধু তাই নয়- সেখানে কোনো আইন বা ন্যায়-বিচার ছিল না। 'জোর যার মুলুক তার'-এই নীতিই প্রচলিত ছিল।আবার-

      • হবস এই জীবনের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, প্রকৃতির রাজ্যে মানুষের জীবন ছিল "একাকী, দরিদ্র, নোংরা, পাশবিক এবং স্বল্পস্থায়ী" (Solitary, poor, nasty, brutish and short)।যেখানে-

      সামাজিক চুক্তির কারণ হিসেবে দেখতে পাই-প্রকৃতির রাজ্যের এই চরম অরাজকতা ও মৃত্যুভয় থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মানুষ একটি স্থায়ী শান্তির পথ খুঁজতে শুরু করে। জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই তারা নিজেদের মধ্যে একটি চুক্তিতে উপনীত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পাশাপাশি আমরা আরো দেখতে পাই যে-

    হবসের সামাজিক চুক্তির স্বরূপ।হবসের মতে- এই চুক্তিটি হয়েছিল জনগণের নিজেদের মধ্যে। তারা প্রত্যেকে প্রত্যেকের সাথে এই মর্মে চুক্তিবদ্ধ হয় যে— "আমি আমার নিজের ওপর শাসন করার অধিকার পরিত্যাগ করছি এবং এই ব্যক্তি বা ব্যক্তিসংসদকে সমস্ত ক্ষমতা অর্পণ করছি, এই শর্তে যে তুমিও তোমার অধিকার ত্যাগ করবে।"তবে-শাসকরা নিজে এই চুক্তির কোনো পক্ষ ছিলেন না।

       সার্বভৌম শক্তি হিসেবে সামাজিক চুক্তির ফলে যে সর্বোচ্চ ক্ষমতার সৃষ্টি হয়, হবস তাকেই 'সার্বভৌম' বা 'লেভিয়াথান' বলেছেন।আসলে হবসের মতে সার্বভৌম শক্তি হলো-

     •অসীম ও অবিভাজ্য।শাসকের ক্ষমতা হবে নিরঙ্কুশ। তার আদেশই হলো আইন।অপ্রতিরোধ্য। প্রজাদের বিদ্রোহ করার কোনো অধিকার নেই, কারণ তারা স্বেচ্ছায় সমস্ত ক্ষমতা অর্পণ করেছে। একমাত্র যদি শাসক প্রজাদের জীবন রক্ষা করতে ব্যর্থ হন, তবেই আনুগত্য ত্যাগের প্রশ্ন ওঠে।

         মূল্যায়নঃহবসের এই মতবাদ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি বেশ কিছু কারণে সমালোচিত হয়েছে। আর সেই সমালোচিত বিষয়গুলি হলো-

ক) হবস্ মানবপ্রকৃতির কেবল নেতিবাচক ও অন্ধকার দিকটিই তুলে ধরেছেন।খ) হবসের এই দর্শন প্রকারান্তরে স্বৈরতন্ত্রকে সমর্থন করে।গ) রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে তিনি কোনো পার্থক্য করেননি।

       পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,হবসের সামাজিক চুক্তির মতবাদ তীব্র সমালোচনা সত্ত্বেও, হবস প্রথম রাষ্ট্রকে একটি ঈশ্বরদত্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে না দেখে মানুষের তৈরি কৃত্রিম প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।যেটি অবশ্যই মধ্যযুগীয় চিন্তা থেকে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় উত্তরণের ক্ষেত্রে তাঁর এই সামাজিক চুক্তি মতবাদ এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে বিবেচিত।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট ও SHESHER KABITA SUNDARBON YouTube channel SAMARESH sir 


Comments

Popular posts from this blog

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর।

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মাইনর সিলেবাস)  ১)চার্বাক মতে ভূত কয়টি ও কি কি? উত্তরঃচার্বাক মতে ভূত চারটি- ক্ষিতি, অপ্ , তেজ ও মরুৎ ২) স্বভাববাদ কী? উত্তরঃ চার্বাক জড়বাদের ভিত্তি হল স্বভাববাদ। যে মতবাদ অনুসারে স্বভাব থেকেই ভূত সৃষ্টি, আবার স্বভাব থেকেই বিচ্ছেদ। যার জন্য ঈশ্বরকে স্বীকার করা প্রয়োজন নেই। ৩) অব্যাপ্যদেশ কথাটির অর্থ লেখো। উত্তরঃ অব্যাপ্যদেশ বলতে বোঝায়- অশাব্দ অর্থাৎ যাকে শব্দের দ্বারা প্রকাশ করা যায় না। ৫) জ্ঞান লক্ষণ প্রত্যক্ষ কাকে বলে?  কোন একটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তার নিজের বিষয়ীভূত গুণ ছাড়াও যদি অপর একটি ইন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূত গুণকে প্রত্যক্ষ করার হয়, তাহলে সেই প্রত্যক্ষকে জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ বলা হয়। ৬) ন্যায় মতে প্রমাণের প্রকার  উত্তরঃ ন্যায় মতে প্রমাণ চার প্রকার। প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান এবং শাব্দ। ৭) সন্নিকর্ষ কাকে বলে? উত্তরঃ ন্যায় মতে ইন্দ্রিয় ও কোন বাস্তব পদার্থের মধ্যে একপ্রকার বিশেষ সম্পর্ক ঘটলে তবেই আমাদের একটি বস্তুর প্রত্যক্ষজ্ঞান ।আর ঐ বিশেষ বিশেষ সম্পর্কের পারিভাষিক নাম হলো সন...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...

ব্রিটিশ(3rd.Sem) পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর সিলেবাস)।         আমরা জানি যে,ব্রিটেনের সংবিধান অলিখিত বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি, পার্লামেন্ট প্রণীত আইন প্রভৃতির মাধ্যমে পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট আইনানুগ সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব নয়। আর সেখানে ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে আইনানুগ সার্বভৌমত্ব বলা হয়, কারণ-       যেকোনো বিষয়ে পার্লামেন্ট আইন প্রণনয়নের অধিকারী। তবে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হওয়ায় পার্লামেন্টে কোন আইন প্রণয়নের সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না। আসলে সেখানে কমন্সসভা তথা নিম্নকক্ষের সার্বভৌমত্বকেই বলা হয় পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব।     ••ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে সার্বভৌমত্ব বলার কারণ- ১) পার্লামেন্টের ওপর আইনগত কোনরূপ বাধানিষেধ আরোপ করা যায় না। ২) পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের বৈধতার ব্যাপারে আদালত কোন প্রশ্ন তুলতে পারেনা। ব্রিটেনের আদালত পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের ওপর বিচার বি...