Skip to main content

শিবরাম চক্রবর্তীর 'ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা গ্রন্থের নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করো।

শিবরাম চক্রবর্তীর 'ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা গ্রন্থের নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করো(পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর)।

     আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,শিবরাম চক্রবর্তীর আত্মজীবনী 'ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা' বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য সৃষ্টি। প্রথাগত আত্মজীবনীর গাম্ভীর্য এড়িয়ে তিনি তাঁর জীবনকে এক দার্শনিক অথচ রসাত্মক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করেছেন। আসলে শিবরাম চক্রবর্তীর 'ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা' কোনো সাধারণ আত্মজীবনী নয়, বরং এটি একটি জীবনদর্শনের দলিল।আর সেখানে নামকরণের সার্থকতা বুঝতে হলে লেখকের জীবনবোধের সেই তিনটি স্তরকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। সেই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি-

         শিবরামের জীবনে 'ঈশ্বর' শব্দটির আগমন ঘটেছিল তাঁর বাবার উদাসীন বৈরাগ্য এবং মায়ের গভীর ভক্তি থেকে। তাঁর আত্মজীবনীর একদম শুরুতেই এই নামকরণের সূত্রটি স্পষ্ট হয়-

  "ঈশ্বর থেকে পৃথিবীতে এলাম-পৃথিবীকে পেলাম। পৃথিবীর পরিচয়ে ভালোবাসাকে আনলাম। এই আমার বর্ণপরিচয়। ঈশ্বর, পৃথিবী, ভালোবাসা-এই তিনটি শব্দে আমার জীবনটি আঁটা।"

          শিবরাম তাঁর বাবাকে বর্ণনা করেছেন একজন শান্ত, ঋষিকল্প মানুষ হিসেবে। তাঁর ভাষায়, তাঁর শৈশব ছিল ঈশ্বরের আশীর্বাদে এবং শাসনে ধন্য। পারিবারিক সেই আধ্যাত্মিক আবহে তিনি যে 'ঈশ্বর'কে চিনেছিলেন, তা প্রথাগত মূর্তিপূজা নয়, বরং এক আদি ও অকৃত্রিম পরম সত্তা।

         শিবরাম চক্রবর্তীর কাছে মুক্তি ও অভিজ্ঞতার বিচিত্র পাঠশালা হলো পৃথিবী। আর সেই পৃথিবীর বুকে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করেন-'ঈশ্বর' যদি হয় উৎস, তবে 'পৃথিবী' হলো তাঁর বিচরণক্ষেত্র। শিবরাম তাঁর জীবনে ঘরসংসার বলতে যা বোঝায়, তা ত্যাগ করে বার বার এই পৃথিবীর পথে নেমে এসেছিলেন। তিনি নিজেই বলেছেন-

"পৃথিবীর পাঠশালাতেই আমার আসল পড়াশোনা। সেখানে মাস্টার নেই, কিন্তু শিক্ষা আছে পদে পদে।" 

          আসলে শিবরাম চক্রবর্তীর কাছে পৃথিবী মানে ছিল- কৈশোরেই বাড়ি থেকে পালিয়ে পাহাড়-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো অর্থাৎ ভবঘুরে জীবন। আর সেই জীবনে মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটের সেই বিখ্যাত মেসবাড়িতে বসে সারা পৃথিবী তাঁর লেখায় রাস্তার ভিক্ষুক থেকে শুরু করে বড় লেখক-সবাই পৃথিবীর অবিচ্ছেদ্য অংশ।আসলে তিনি পৃথিবীকে দেখেছিলেন এক রঙ্গমঞ্চ হিসেবে, যেখানে শোকের চেয়ে কৌতুকেরই প্রাধান্য বেশি।যেখানে-

          শিবরাম চক্রবর্তীর কাছে জীবনধারণের সঞ্জীবনী রসহলো ভালোবাসা।নামকরণের তৃতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো 'ভালোবাসা'। শিবরামের কাছে ভালোবাসা মানে নিছক মোহ নয়, বরং এটি এক গভীর মানবিক বোধ। তিনি লিখেছেন-

"ভালোবাসা না থাকলে এই ধুলোবালির পৃথিবী মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে যেত। মানুষকে ভালোবেসেই মানুষ অমর হতে চায়।"

        শিবরাম চক্রবর্তীর ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা গ্রন্থে ভালোবাসার বিভিন্ন রূপ ফুটে উঠেছে। আর সেখানে আমরা দেখি-রিনির প্রতি ভালোবাসা। তাঁর জীবনের এক অমলিন স্মৃতি হলো রিনি। এই প্রেমের বর্ণনায় কোনো কামনার পঙ্কিলতা নেই, আছে এক স্নিগ্ধ বিষাদ।আছে নিঃস্বার্থ মমতা। জেলখানায় রাজনৈতিক বন্দিদের প্রতি ভালোবাসা বা পথের তুচ্ছ মানুষের প্রতি তাঁর যে টান, তাই-ই এই নামকরণের মূল ভিত্তি।যেখানে শিবরাম মনে করতেন, পৃথিবীকে ভালোবাসার শ্রেষ্ঠ উপায় হলো হাসিমুখে একে গ্রহণ করা। আর সেখানে থাকবে কৌতুকপ্রিয়তা।আসলে নামকরণের সামগ্রিক সার্থকতায়-

         শিবরাম চক্রবর্তী তাঁর আত্মজীবনীর নামটির মাধ্যমে জীবনের এক ক্রমবিকাশকে বুঝিয়েছেন। তাঁর মতে-মানুষের চেতনার আদি বিন্দু হলো ঈশ্বর।সেই চেতনার কর্মভূমি বা বিকাশের ক্ষেত্র পৃথিবী। যে পৃথিবীতে বাসযোগ্য এবং সুন্দর করে তোলে একমাত্র ভালোবাসা। আসলে শিবরাম চক্রবর্তী এই তিনটি শব্দকে তাঁর জীবনের 'বর্ণপরিচয়' বা 'প্রথম পাঠ' বলেছেন। তাঁর ভাষায়- 

"বিধাতা আমার সামনে তাঁর বর্ণপরিচয় খুলে ধরেছিলেন-যার প্রথম পাঠ ঈশ্বর, দ্বিতীয় পাঠ পৃথিবী এবং অন্তিম ও শ্রেষ্ঠ পাঠ হলো ভালোবাসা।"

             পরিশেষে বলতে পারি যে, 'ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা' গ্রন্থটিতে লেখক কেবল নিজের কথা বলেননি, বরং ঈশ্বরপ্রদত্ত এই পৃথিবীতে এসে ভালোবাসার মাধ্যমে কীভাবে জীবনের সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায়, তার দিকনির্দেশ করেছেন। হাস্যরসের মোড়কে মোড়া এক গভীর জীবনসত্য এই তিনটি শব্দের মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়েছে। তাই বলা যায়, গ্রন্থের বিষয়বস্তু ও লেখকের মূল ভাবনার সঙ্গে 'ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা' নামকরণটি সর্বাংশে সার্থক ও শিল্পসম্মত হয়েছে।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, সাজেশন, টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KABITA SUNDARBON YouTube channel SAMARESH sir 





Comments

Popular posts from this blog

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর।

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মাইনর সিলেবাস)  ১)চার্বাক মতে ভূত কয়টি ও কি কি? উত্তরঃচার্বাক মতে ভূত চারটি- ক্ষিতি, অপ্ , তেজ ও মরুৎ ২) স্বভাববাদ কী? উত্তরঃ চার্বাক জড়বাদের ভিত্তি হল স্বভাববাদ। যে মতবাদ অনুসারে স্বভাব থেকেই ভূত সৃষ্টি, আবার স্বভাব থেকেই বিচ্ছেদ। যার জন্য ঈশ্বরকে স্বীকার করা প্রয়োজন নেই। ৩) অব্যাপ্যদেশ কথাটির অর্থ লেখো। উত্তরঃ অব্যাপ্যদেশ বলতে বোঝায়- অশাব্দ অর্থাৎ যাকে শব্দের দ্বারা প্রকাশ করা যায় না। ৫) জ্ঞান লক্ষণ প্রত্যক্ষ কাকে বলে?  কোন একটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তার নিজের বিষয়ীভূত গুণ ছাড়াও যদি অপর একটি ইন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূত গুণকে প্রত্যক্ষ করার হয়, তাহলে সেই প্রত্যক্ষকে জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ বলা হয়। ৬) ন্যায় মতে প্রমাণের প্রকার  উত্তরঃ ন্যায় মতে প্রমাণ চার প্রকার। প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান এবং শাব্দ। ৭) সন্নিকর্ষ কাকে বলে? উত্তরঃ ন্যায় মতে ইন্দ্রিয় ও কোন বাস্তব পদার্থের মধ্যে একপ্রকার বিশেষ সম্পর্ক ঘটলে তবেই আমাদের একটি বস্তুর প্রত্যক্ষজ্ঞান ।আর ঐ বিশেষ বিশেষ সম্পর্কের পারিভাষিক নাম হলো সন...

ব্রিটিশ(3rd.Sem) পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর সিলেবাস)।         আমরা জানি যে,ব্রিটেনের সংবিধান অলিখিত বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি, পার্লামেন্ট প্রণীত আইন প্রভৃতির মাধ্যমে পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট আইনানুগ সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব নয়। আর সেখানে ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে আইনানুগ সার্বভৌমত্ব বলা হয়, কারণ-       যেকোনো বিষয়ে পার্লামেন্ট আইন প্রণনয়নের অধিকারী। তবে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হওয়ায় পার্লামেন্টে কোন আইন প্রণয়নের সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না। আসলে সেখানে কমন্সসভা তথা নিম্নকক্ষের সার্বভৌমত্বকেই বলা হয় পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব।     ••ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে সার্বভৌমত্ব বলার কারণ- ১) পার্লামেন্টের ওপর আইনগত কোনরূপ বাধানিষেধ আরোপ করা যায় না। ২) পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের বৈধতার ব্যাপারে আদালত কোন প্রশ্ন তুলতে পারেনা। ব্রিটেনের আদালত পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের ওপর বিচার বি...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...