Skip to main content

কবি' উপন্যাসের নামকরণ কতটা সার্থকতা লাভ করেছে তা আলোচনা করো। কেন কবিয়াল নিতাই শেষ পর্যন্ত এক নিঃসঙ্গ 'কবি' হয়ে উঠল, তা বিশ্লেষণ করো।

 

কবি' উপন্যাসের নামকরণ কতটা সার্থকতা লাভ করেছে তা আলোচনা করো। কেন কবিয়াল নিতাই শেষ পর্যন্ত এক নিঃসঙ্গ 'কবি' হয়ে উঠল, তা বিশ্লেষণ করো। (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মেজর)

             আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কবি' (১৯৪৪) উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের একটি কালজয়ী সৃষ্টি, যেখানে রাঢ় বাংলার রুক্ষ মাটির প্রেক্ষাপটে এক কবিয়ালের জীবন-জিজ্ঞাসা মূর্ত হয়ে উঠেছে। উপন্যাসের নামকরণটি কেবল কেন্দ্রীয় চরিত্রের পেশাকে নির্দেশ করে না, বরং এটি এক সাধারণ মানুষের 'কবি' হয়ে ওঠার আধ্যাত্মিক ও মানসিক উত্তরণের ইতিহাস। আসলে কবি' উপন্যাসের নামকরণের সার্থকতা ও নিতাইয়ের কবি-সত্ত্বার বিবর্তনের মতো বিষয়টি এই উপন্যাসের মধ্যে নিহিত। আর সেখানে আমরা দেখি উপন্যাসের  নামকরণের সার্থকতা ও নিতাইয়ের পেশা থেকে শিল্পে উত্তরণের পথ। যেখানে-

       উপন্যাসের শুরুতে আমরা দেখি নিতাইচরণ চোর-ডাকাতের বংশে জন্মেও সহজাত ছন্দের টানে 'কবিগান' বা 'ঝুমুর গান' গাইতে চায়। তার এই শিল্পী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ছিল বংশগত কলঙ্ক থেকে মুক্তির এক পথ। কিন্তু তারাশঙ্কর এই উপন্যাসের নাম 'কবিয়াল' না রেখে 'কবি' রেখেছেন অত্যন্ত সচেতনভাবে। একজন কবিয়াল কেবল আসর মাতানো গান বাঁধেন, কিন্তু একজন 'কবি' জীবনের গভীর সত্যকে স্পর্শ করেন। নিতাইয়ের যাত্রাপথটি ঠিক এই বিন্দুর দিকেই প্রবাহিত। আর প্রবাহিত সেই পথেই নিতাইয়ের প্রেমানুভূতি ও সৃজনশীলতার বিকাশ। সেখানে-

       নিতাইয়ের কবি-সত্ত্বার বিকাশে নারী ও প্রেমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। 'কালো মেয়ে' ঠাকুরঝির প্রতি তার যে প্রেম, তা ছিল নিষ্কাম ও পবিত্র। ঠাকুরঝির জন্য তার অন্তরের আর্তি প্রথম তাকে প্রকৃত কবির ভাষায় কথা বলতে শেখায়। সে গান বাঁধে-

        "কালো যদি মন্দ তবে কেশ পাকিলে কান্দ কেনে?

          কালো চুলে রাঙা কুসুম হেরেছি কি নয়নে?"

      আসলে এই সহজ কিন্তু গভীর সত্যের উপলব্ধিই তাকে সাধারণ লোকগায়ক থেকে উচ্চতর স্তরের শিল্পী করে তোলে।যেখানে নিতাইয়ের জীবনদর্শন উপলব্ধিতে উঠে আসে-"জীবন এত ছোট কেনে?"

      আলোচ্য কবি উপন্যাসে আমরা লক্ষ্যণীয় ভাবে দেখতে   পাই যে,নিতাইয়ের জীবনে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে বসন্ত বা 'বসন'-এর অকাল মৃত্যুতে। বসন্তের মৃত্যু তাকে জীবনের নশ্বরতা সম্পর্কে সচেতন করে দেয়। সে উপলব্ধি করে যে, জীবনের আনন্দ ও প্রেম সবই ক্ষণস্থায়ী। তার এই হাহাকার এক বিশ্বজনীন দর্শন হয়ে ফুটে ওঠে তার গানে। যে গানে উঠে আসে নিতাইয়ের জীবন দর্শন। তাই নিতাই কে বলতে শুনি-

      "জীবন এত ছোট কেনে?এ ভুবনে! সবাই তরে আসা যাওয়া, মিটল না তো প্রাণের পাওয়া,একটু হেসে একটু কেঁদে ফুরিয়ে গেল ক্ষণে।"

        আসলে নিতাইয়ের এই যে জীবনের অপূর্ণতার বোধ, এটাই হলো একজন প্রকৃত কবির প্রধান লক্ষণ।তাই বসন্তের শেষ বিদায়ের পর নিতাইয়ের ভেতর থেকে ছটফটে কবিয়াল সত্ত্বাটি মরে গিয়ে এক ধীর-স্থির 'কবি' জন্ম নেয়। তবে আমাদের মনে জিজ্ঞাসা জাগে যে-কেন নিতাই নিঃসঙ্গ 'কবি' হয়ে উঠল?

         উপন্যাসের শেষে নিতাই যখন ট্রেনের কামরায় একা বসে থাকে, তখন সে এক চরম একাকীত্বের সম্মুখীন হয়। তার এই নিঃসঙ্গতার কারণগুলি হলো-বিচ্ছেদ ও মৃত্যুর বিষয় দুটি নিতাইকে নিঃসঙ্গ করে তোলে। ঠাকুরঝির বিচ্ছেদ এবং বসন্তের মৃত্যু তাকে জাগতিক বাঁধন থেকে মুক্ত করে দেয়। তার আপন বলতে আর কেউ অবশিষ্ট থাকে না।তাই-প্রকৃত সৃষ্টিশীল মানুষ সবসময়ই একাকী। নিতাইয়ের অন্তরে তখন এক বৈরাগ্য দানা বেঁধেছে। সে বুঝতে পেরেছে যে-—

             "এই খেদ আমার মনে-ভালবেসে মিটল না আশ, কুলাল না এ জীবনে!" 

        আসলে কবিয়াল হিসেবে সে ছিল জনরঞ্জক, কিন্তু যখন সে জীবনের গভীর সত্য খুঁজে পেল, তখন সাধারণ মানুষের আসর আর তার ভালো লাগে না। সে তখন অন্তরের নিঃসঙ্গতাকে সঙ্গী করে অজানার পথে পা বাড়ায়।

       পরিশেষে বলতে পারি যে, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় নিতাইকে কেবল একটি চরিত্র হিসেবে আঁকেননি, বরং শিল্পী-জীবনের এক চিরন্তন ট্র্যাজেডিকে ফুটিয়ে তুলেছেন। কবিগান গাইতে গাইতে নিতাই যেভাবে জীবনের পরম সত্যকে স্পর্শ করল এবং নিঃসঙ্গতার মাঝে নিজের সৃষ্টিকে খুঁজে পেল, তাতেই উপন্যাসের নামকরণ 'কবি' চরম সার্থকতা লাভ করেছে। নিঃসঙ্গতাই এখানে তার শিল্পের শ্রেষ্ঠ অলঙ্কার।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং 𝐒𝐡𝐞𝐬𝐡𝐞𝐫 𝐊𝐚𝐛𝐢𝐭𝐬 𝐒𝐮𝐧𝐝𝐚𝐫𝐛𝐨𝐧 𝐘𝐨𝐮𝐭𝐮𝐛𝐞 𝐂𝐡𝐚𝐧𝐞𝐥 𝐒𝐀𝐌𝐒𝐑𝐄𝐒𝐇 𝐒𝐈𝐑


Comments

Popular posts from this blog

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর।

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মাইনর সিলেবাস)  ১)চার্বাক মতে ভূত কয়টি ও কি কি? উত্তরঃচার্বাক মতে ভূত চারটি- ক্ষিতি, অপ্ , তেজ ও মরুৎ ২) স্বভাববাদ কী? উত্তরঃ চার্বাক জড়বাদের ভিত্তি হল স্বভাববাদ। যে মতবাদ অনুসারে স্বভাব থেকেই ভূত সৃষ্টি, আবার স্বভাব থেকেই বিচ্ছেদ। যার জন্য ঈশ্বরকে স্বীকার করা প্রয়োজন নেই। ৩) অব্যাপ্যদেশ কথাটির অর্থ লেখো। উত্তরঃ অব্যাপ্যদেশ বলতে বোঝায়- অশাব্দ অর্থাৎ যাকে শব্দের দ্বারা প্রকাশ করা যায় না। ৫) জ্ঞান লক্ষণ প্রত্যক্ষ কাকে বলে?  কোন একটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তার নিজের বিষয়ীভূত গুণ ছাড়াও যদি অপর একটি ইন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূত গুণকে প্রত্যক্ষ করার হয়, তাহলে সেই প্রত্যক্ষকে জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ বলা হয়। ৬) ন্যায় মতে প্রমাণের প্রকার  উত্তরঃ ন্যায় মতে প্রমাণ চার প্রকার। প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান এবং শাব্দ। ৭) সন্নিকর্ষ কাকে বলে? উত্তরঃ ন্যায় মতে ইন্দ্রিয় ও কোন বাস্তব পদার্থের মধ্যে একপ্রকার বিশেষ সম্পর্ক ঘটলে তবেই আমাদের একটি বস্তুর প্রত্যক্ষজ্ঞান ।আর ঐ বিশেষ বিশেষ সম্পর্কের পারিভাষিক নাম হলো সন...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...

ব্রিটিশ(3rd.Sem) পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর সিলেবাস)।         আমরা জানি যে,ব্রিটেনের সংবিধান অলিখিত বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি, পার্লামেন্ট প্রণীত আইন প্রভৃতির মাধ্যমে পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট আইনানুগ সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব নয়। আর সেখানে ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে আইনানুগ সার্বভৌমত্ব বলা হয়, কারণ-       যেকোনো বিষয়ে পার্লামেন্ট আইন প্রণনয়নের অধিকারী। তবে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হওয়ায় পার্লামেন্টে কোন আইন প্রণয়নের সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না। আসলে সেখানে কমন্সসভা তথা নিম্নকক্ষের সার্বভৌমত্বকেই বলা হয় পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব।     ••ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে সার্বভৌমত্ব বলার কারণ- ১) পার্লামেন্টের ওপর আইনগত কোনরূপ বাধানিষেধ আরোপ করা যায় না। ২) পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের বৈধতার ব্যাপারে আদালত কোন প্রশ্ন তুলতে পারেনা। ব্রিটেনের আদালত পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের ওপর বিচার বি...