Skip to main content


উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণ (Renascence)

ভূমিকা:

উনিশ শতকে ব্রিটিশ শাসনের সংস্পর্শে এসে ইংরেজি শিক্ষার প্রভাবে বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক জীবনে যে অভূতপূর্ব পরিবর্তন ঘটে, তাকেই 'বাংলার নবজাগরণ' বলা হয়। ইতালির নবজাগরণের অনুকরণে বাংলায় এই পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল মূলত কলকাতাকে কেন্দ্র করে।

১. পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব:

পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারের ফলে বাংলার শিক্ষিত তরুণ সমাজের মধ্যে যুক্তিজাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং উদারপন্থা জাগ্রত হয়। হিন্দু কলেজ (বর্তমান প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) এই চিন্তাধারার প্রসারে প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল। রাজা রামমোহন রায়, ডিরোজিও ও তাঁর অনুগামীরা (ইয়ং বেঙ্গল) কুসংস্কারের বদলে যুক্তির ওপর জোর দেন।

২. সমাজ সংস্কার আন্দোলন:

নবজাগরণের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিল সমাজ সংস্কার। রাজা রামমোহন রায়ের প্রচেষ্টায় সতীদাহ প্রথা রদ (১৮২৯) এবং পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নেতৃত্বে বিধবা বিবাহ আইন (১৮৫৬) পাশ হওয়া ছিল নবজাগরণের বড় সাফল্য। এ ছাড়া বাল্যবিবাহ রোধ এবং নারীশিক্ষার প্রসারেও এই সময় ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া হয়।

৩. ধর্মীয় সংস্কার:

নবজাগরণের প্রভাবে ধর্মের গোঁড়ামি ও মূর্তিপূজার বিরোধিতা শুরু হয়। রামমোহন রায় স্থাপন করেন 'ব্রাহ্মসভা' (পরে ব্রাহ্মসমাজ), যা একেশ্বরবাদের প্রচার চালায়। পরবর্তীকালে স্বামী বিবেকানন্দ এবং শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ধর্মের এক নতুন ও উদার ব্যাখ্যা প্রদান করেন, যা মানুষের সেবা ও আধ্যাত্মিক চেতনার মেলবন্ধন ঘটায়।

৪. সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশ:

এই সময় বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগ শুরু হয়। মধুসূদন দত্তের মহাকাব্য, বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস এবং দীনবন্ধু মিত্রের নাটকে জাতীয়তাবোধ ও দেশপ্রেম ফুটে ওঠে। মুদ্রণযন্ত্রের প্রসারের ফলে সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্র (যেমন: সমাচার দর্পণ, সংবাদ কৌমুদী) জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৫. সীমাবদ্ধতা:

বাংলার নবজাগরণের কিছু সীমাবদ্ধতাও ছিল। ঐতিহাসিকদের মতে, এই আন্দোলন মূলত শহরকেন্দ্রিক এবং উচ্চবিত্ত হিন্দু সমাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সাধারণ কৃষক সমাজ বা মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর এর প্রভাব ছিল অত্যন্ত নগণ্য। তাই ড. অনিল শীল একে 'এলিটদের আন্দোলন' বলে অভিহিত করেছেন।

উপসংহার:

সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও, উনিশ শতকের নবজাগরণ বাঙালির আত্মপরিচয় জাগিয়ে তুলেছিল। এর ফলেই পরবর্তীকালে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায় এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়।

পরবর্তী পদক্ষেপ:

আপনার কি মাধ্যমিক ইতিহাসের অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের (যেমন: নীল বিদ্রোহ বা বিদ্যাসাগরের শিক্ষা সংস্কার) ওপর নোট প্রয়োজন? অথবা আপনার "SHESHER KABITA SUNDARBON" চ্যানেলের জন্য এই বিষয়ের ওপর কোনো ছোট ভিডিও স্ক্রিপ্ট লিখে দেব?


Comments

Popular posts from this blog

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর।

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মাইনর সিলেবাস)  ১)চার্বাক মতে ভূত কয়টি ও কি কি? উত্তরঃচার্বাক মতে ভূত চারটি- ক্ষিতি, অপ্ , তেজ ও মরুৎ ২) স্বভাববাদ কী? উত্তরঃ চার্বাক জড়বাদের ভিত্তি হল স্বভাববাদ। যে মতবাদ অনুসারে স্বভাব থেকেই ভূত সৃষ্টি, আবার স্বভাব থেকেই বিচ্ছেদ। যার জন্য ঈশ্বরকে স্বীকার করা প্রয়োজন নেই। ৩) অব্যাপ্যদেশ কথাটির অর্থ লেখো। উত্তরঃ অব্যাপ্যদেশ বলতে বোঝায়- অশাব্দ অর্থাৎ যাকে শব্দের দ্বারা প্রকাশ করা যায় না। ৫) জ্ঞান লক্ষণ প্রত্যক্ষ কাকে বলে?  কোন একটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তার নিজের বিষয়ীভূত গুণ ছাড়াও যদি অপর একটি ইন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূত গুণকে প্রত্যক্ষ করার হয়, তাহলে সেই প্রত্যক্ষকে জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ বলা হয়। ৬) ন্যায় মতে প্রমাণের প্রকার  উত্তরঃ ন্যায় মতে প্রমাণ চার প্রকার। প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান এবং শাব্দ। ৭) সন্নিকর্ষ কাকে বলে? উত্তরঃ ন্যায় মতে ইন্দ্রিয় ও কোন বাস্তব পদার্থের মধ্যে একপ্রকার বিশেষ সম্পর্ক ঘটলে তবেই আমাদের একটি বস্তুর প্রত্যক্ষজ্ঞান ।আর ঐ বিশেষ বিশেষ সম্পর্কের পারিভাষিক নাম হলো সন...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...

ব্রিটিশ(3rd.Sem) পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর সিলেবাস)।         আমরা জানি যে,ব্রিটেনের সংবিধান অলিখিত বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি, পার্লামেন্ট প্রণীত আইন প্রভৃতির মাধ্যমে পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট আইনানুগ সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব নয়। আর সেখানে ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে আইনানুগ সার্বভৌমত্ব বলা হয়, কারণ-       যেকোনো বিষয়ে পার্লামেন্ট আইন প্রণনয়নের অধিকারী। তবে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হওয়ায় পার্লামেন্টে কোন আইন প্রণয়নের সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না। আসলে সেখানে কমন্সসভা তথা নিম্নকক্ষের সার্বভৌমত্বকেই বলা হয় পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব।     ••ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে সার্বভৌমত্ব বলার কারণ- ১) পার্লামেন্টের ওপর আইনগত কোনরূপ বাধানিষেধ আরোপ করা যায় না। ২) পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের বৈধতার ব্যাপারে আদালত কোন প্রশ্ন তুলতে পারেনা। ব্রিটেনের আদালত পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের ওপর বিচার বি...