"ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাসে বাস্তিল দুর্গের পতনের কারণ ও তাৎপর্য" আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (WBSU) ষষ্ঠ সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর (History Minor) পাঠ্যসূচি অনুযায়ী।
আলোচনার শুরুতেই আমরা ভুলতে পারি যে,১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ই জুলাই ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে উত্তেজিত জনতা কর্তৃক কুখ্যাত 'বাস্তিল দুর্গ' (Bastille)-এর পতন ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা।তবে এই বাস্তিল দুর্গ কেবল একটি সামরিক কেল্লা ছিল না, এটি ছিল ফরাসি রাজতন্ত্রের স্বৈরাচার, অত্যাচার ও শোষণের এক মূর্ত প্রতীক। ঐতিহাসিক ল্যাভিসের মতে-
"বাস্তিল দুর্গের পতন ছিল পুরাতনতন্ত্রের পতনের প্রতীক।"
১. বাস্তিল দুর্গের পতনের কারণসমূহ- বাস্তিল দুর্গের পতন কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক কারণ জড়িত ছিল। আর সেই কারণগুলি হলো -
ক)•নেকারের পদচ্যুতি ও গণ-অসন্তোষঃফরাসি সম্রাট ষোড়শ লুই ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ১১ই জুলাই জনপ্রিয় ফরাসি অর্থমন্ত্রী জ্যাক নেকারকে (Jacques Necker) পদচ্যুত করেন। নেকারকে তৃতীয় সম্প্রদায়ের (Third Estate) সমর্থক মনে করা হতো। তাঁর পদচ্যুতির খবর ১২ই জুলাই প্যারিসে পৌঁছালে সাধারণ মানুষ চরম উত্তেজিত হয়ে ওঠে।
খ)•সৈন্য সমাবেশ ও আতঙ্কঃসম্রাট ষোড়শ লুই প্যারিস এবং ভার্সাই অঞ্চলের সুরক্ষার অজুহাতে প্রায় ২০,০০০ বিদেশি সৈন্য মোতায়েন করেন। সাধারণ মানুষের মনে আশঙ্কা তৈরি হয় যে, সম্রাট জোরপূর্বক 'জাতীয় সভা' (National Assembly) ভেঙে দেবেন এবং প্যারিসবাসীকে দমন করবেন।
গ)•অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ও অস্ত্রের সন্ধানঃউত্তেজিত জনতা নিজেদের রক্ষা করার জন্য অস্ত্রের সন্ধান শুরু করে। ১৪ই জুলাই সকালে প্রায় ৩০,০০০ মানুষ 'Hotel des Invalides' নামক সামরিক হাসপাতাল থেকে প্রচুর বন্দুক ও কামান দখল করে। কিন্তু সেগুলোতে ব্যবহারের জন্য কোনো বারুদ ছিল না। জনতা জানতে পারে যে, বাস্তিল দুর্গে বিপুল পরিমাণ বারুদ ও গোলাবারুদ মজুত রয়েছে।
ঘ)•খাদ্য সংকট ও মূল্যবৃদ্ধিঃ ১৭৮৮-৮৯ খ্রিস্টাব্দের তীব্র শীত ও খরা ফ্রান্সে ভয়াবহ খাদ্য সংকট তৈরি করেছিল। রুটির দাম সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে গিয়েছিল। এই অর্থনৈতিক ক্ষুধা ও ক্ষোভ সাধারণ মানুষকে বারুদের স্তূপে পরিণত করেছিল, যার বিস্ফোরণ ঘটে বাস্তিল দুর্গের সামনে।
•১৪ই জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ•
১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ই জুলাই সকাল থেকেই উত্তেজিত জনতা বাস্তিল দুর্গের সামনে জড়ো হতে থাকে। তারা দুর্গের শাসক লর্ড দ্য লনের (Marquis de Launay) কাছে বারুদ এবং কেল্লা সমর্পণের দাবি জানায়। দ্য লনে আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকার করলে জনতা দুর্গ আক্রমণ করে।আর সেদিন-
বিকেলের দিকে একদল ফরাসি রক্ষীবাহিনী (French Guards) কামানের গোলার সাহায্যে দুর্গের মূল ফটক ভেঙে ফেলে। উত্তেজিত জনতা দুর্গের ভেতর প্রবেশ করে বারুদ দখল করে এবং কারাবন্দীদের মুক্ত করে। সংঘর্ষে দ্য লনে সহ বেশ কিছু রক্ষী নিহত হন।
•বাস্তিল দুর্গের পতনের তাৎপর্য ও গুরুত্ব•
ফরাসি বিপ্লবের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে বাস্তিল দুর্গের পতন সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল।আর সেখানে আমরা দেখতে পাই-
১)স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের পরাজয়ঃ বাস্তিল ছিল ফরাসি রাজাদের নিরঙ্কুশ ও স্বৈরাচারী ক্ষমতার প্রতীক (Bourbon Despotism)। এর পতন প্রমাণ করে যে, রাজার দৈব ক্ষমতা জনগণের সম্মিলিত শক্তির কাছে পরাস্ত হতে বাধ্য।
২)জনসাধারণের ক্ষমতার উত্থানঃ এই ঘটনার মাধ্যমে ফরাসি বিপ্লবের নেতৃত্ব বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর হাত থেকে সাময়িকভাবে প্যারিসের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ বা 'সা-কুলোৎ' (Sans-culottes)-দের হাতে চলে যায়। বিপ্লবে আমজনতার গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
৩)সম্রাটের আত্মসমর্পণঃ বাস্তিলের পতনে ভীত হয়ে সম্রাট ষোড়শ লুই প্যারিসের নতুন পুরসভা (Commune) এবং জাতীয় রক্ষীবাহিনী (National Guard)-কে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হন। তিনি বিপ্লবের প্রতীক হিসেবে লাল, সাদা ও নীল রঙের 'ত্রিবর্ণ রঞ্জিত ককড' (Cockade) টুপি মাথায় ধারণ করেন।
৪)সামন্ততন্ত্রের অবসান ও 'মহা আতঙ্ক' ঃ বাস্তিল পতনের খবর ফ্রান্সের গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে পড়লে কৃষকরা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। তারা বিভিন্ন জমিদার বাড়ি ও সামন্ততান্ত্রিক দুর্গ আক্রমণ করে করের দলিল পুড়িয়ে দেয়। এই ঘটনার রেশ ধরেই ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ৪ঠা আগস্ট জাতীয় সভা ফ্রান্সে 'সামন্ততন্ত্রের অবসান' ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।
৫)বিপ্লবের বৈশ্বিক প্রভাবঃ বাস্তিলের পতন কেবল ফ্রান্সের নয়, সমগ্র ইউরোপের মুক্তিকামী মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ইংরেজ কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ এই ঘটনার আনন্দে লিখেছিলেন-
"An innocent field into a Witche’s caldron."
পরিশেষে বলা যায় যে, বাস্তিল দুর্গের পতন ফরাসি বিপ্লবকে একটি গতিশীল এবং অপ্রতিরোধ্য রূপ দান করেছিল। ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ই জুলাইয়ের পর থেকে ফ্রান্সে 'পুরাতন তন্ত্র' বা Ancien Régime-এর ভিত্তি চিরতরে ভেঙে পড়ে। এই ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণেই ১৪ই জুলাই দিনটিকে বর্তমান ফ্রান্সের 'জাতীয় দিবস' (Bastille Day) হিসেবে অত্যন্ত মর্যাদার সাথে পালন করা হয়।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, সাজেশন, টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং Shesher kabita Sundarbon YouTube channel SAMARESH sir
Comments
Post a Comment