Skip to main content

ঝুমুর দল ও ঝুমুর গান এই উপন্যাসে আঞ্চলিক এই শিল্পধারাগুলো কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং কাহিনির চালিকাশক্তি- আলোচনা করো

ঝুমুর দল ও ঝুমুর গান এই উপন্যাসে আঞ্চলিক এই শিল্পধারাগুলো কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং কাহিনির চালিকাশক্তি- আলোচনা করো পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মেজর।

           আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কবি' উপন্যাসে ঝুমুর দল ও ঝুমুর গান কোনো অলঙ্কার মাত্র নয়; বরং এটি উপন্যাসের মূল ঘটনার বুনন, চরিত্রের রূপান্তর এবং জীবনদর্শনের প্রধান চালিকাশক্তি। বীরভূমের রুক্ষ লাল মাটির সংস্কৃতির সাথে মিশে থাকা এই লোকশিল্পটি কীভাবে কাহিনিকে গতিদান করেছে। আর সেই গতিদানে আমরা লক্ষ্য করি যে-

    ঝুমুর দল হলো নিম্নবর্গের জীবন সংগ্রামের দর্পণ ইতিহাস।উপন্যাসের শুরুতেই আমরা দেখি-নিতাই তার চোর-ডাকাতের বংশীয় পরিচয় মুছে ফেলে একজন 'কবি' হতে চায়। তার এই শিল্পীসত্তার উত্তরণ ঘটে ঝুমুর দলের সংস্পর্শে আসার মাধ্যমে। ঝুমুর দলগুলো তৎকালীন বীরভূমের প্রান্তিক মানুষের এক বিচিত্র জীবিকা ছিল। তারা মেলায় মেলায় ঘুরে গান গেয়ে বেড়াত। এই দলগুলোর যাযাবর জীবন এবং তাদের ভেতরের নৈতিক ও সামাজিক সংকট নিতাইয়ের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ঝুমুর দলের মাধ্যমেই নিতাই মহাদেবপুরের সংকীর্ণ গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর জগতের সম্মুখীন হয়।

      প্রেমের অনুঘটক ও মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন ইতিহাস কবি উপন্যাস। আর সেখানে ঝুমুর গান ও নাচ এই উপন্যাসে প্রেমের এক অনন্য ক্ষেত্র তৈরি করেছে।আসলে ঝুমুর দলের প্রধান আকর্ষণ 'বসন'। বসনের নাচ ও গানের মাধ্যমেই নিতাইয়ের সাথে তার প্রণয় দানা বাঁধে। বসন যখন ঝুমুর গানে নিজের জীবনকে বিলিয়ে দেয়, তখন নিতাইয়ের কবিত্বে এক নতুন মাত্রা যোগ হয়। যেখানে আমরা নিতাই মুখে শুনতে পাই যে-

    "কালো যদি মন্দ তবে কেশ পাকিলে কান্দ কেনে?"

        আসলে নিতাইয়ের এই বিখ্যাত পদটি ঝুমুর দলের আসরেই প্রাণ পায়। ঝুমুর গান এখানে কেবল সুর নয়, বরং নিতাই ও বসনের অন্তরের আকুলতা প্রকাশের মাধ্যম। ঝুমুর দলের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, দারিদ্র্য এবং বসনের অকাল মৃত্যু নিতাইকে জীবনের চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। আর এই পটপ্রেক্ষিতে উপন্যাসে উঠে আসে-

          জীবনদর্শনের বহিঃপ্রকাশ।ঝুমুর গানের ভাবধারা ও তার সুরের মধ্য দিয়ে বীরভূমের মানুষের সহজ সরল অথচ গভীর জীবনদর্শন ফুটে উঠেছে। ঝুমুর গানের ছত্রে ছত্রে লুকিয়ে আছে বিচ্ছেদ ও বৈরাগ্যের সুর। ঝুমুর দলের যাযাবর জীবন নিতাইকে শিখিয়েছে যে পৃথিবীটা একটা বিশাল সরাইখানা। আজ এখানে তো কাল অন্য কোথাও। এই যাযাবরবৃত্তিই নিতাইকে শেষ পর্যন্ত বৈরাগ্যের পথে নিয়ে যায়। ঝুমুর দলের গান থেকেই উঠে আসে সেই অমর প্রশ্ন-

               "জীবন এত ছোট কেনে?"

         এই একটি জিজ্ঞাসা কেবল বসনের নয়, এটি পুরো ঝুমুর সংস্কৃতির প্রতিনিধি যারা প্রতিনিয়ত বিনোদন বিলিয়েও নিজেরা অতৃপ্ত থেকে যায়।আসলে-

      কাহিনির মোড় পরিবর্তনে ঝুমুর গান।কাহিনির প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঝুমুর গানের সাথে যুক্ত। যেখানে নিতাইয়ের কবিয়াল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় ঝুমুর দলের আসরে।শুধু তাই নয়-ঝুমুর দলের লোলুপ দৃষ্টি এবং বসনের প্রতি সামাজিক অবজ্ঞা নিতাইয়ের মনে বিদ্রোহের জন্ম দেয়।আর সেখানে বসনের মৃত্যুর পর ঝুমুর গানের সেই চটুল সুর নিতাইয়ের কাছে করুণ বিলাপ হয়ে ধরা দেয়, যা তাকে সংসারত্যাগী করে তোলে।

      আঞ্চলিক সংহতি ও সমাজবাস্তবতাময় কবি উপন্যাস।বীরভূমের গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থায় ঝুমুর গান ছিল নিম্নবর্গের মানুষের প্রধান বিনোদন। কিন্তু তারাশঙ্কর দেখিয়েছেন এই শিল্পের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার। ঝুমুর দলের মেয়েরা কীভাবে শোষিত হয় এবং সমাজ তাদের কীভাবে দেখে, তা উপন্যাসের কাহিনিকে এক করুণ বাস্তবতার দিকে ঠেলে দেয়। বসন ও তার মায়ের জীবনের ট্র্যাজেডি এই ঝুমুর সংস্কৃতিরই এক অভিশপ্ত দিক, যা কাহিনিকে এক গভীর ট্র্যাজিক পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।আর সেখানে-

     ঝুমুর গানের ভূমিকা কাহিনির উপর প্রভাব পড়ে। তাইতো জন্ম হয় শিল্পীর জন্ম। আর সেখান থেকে উঠে আসে নিতাইয়ের ডোম পরিচয় থেকে 'কবি' হয়ে ওঠা বিষয়টি। তাই উপন্যাসে আমরা দেখতে পাই আবেগীয় সংঘাত।বসনের প্রতি প্রেম ও তার করুণ মৃত্যু।আসলে-ঝুমুর দলের সাথে গ্রাম থেকে স্টেশনে স্টেশনে ভ্রমণ।আর সেখানে জীবনের অনিত্যতা বুঝে নিতাইয়ের বৈরাগ্য গ্রহণ। |

            পরিশেষে বলতে পারি যে, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় 'কবি' উপন্যাসে ঝুমুর গান ও ঝুমুর দলকে কেবল বীরভূমের লোকজ উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেননি। এটি উপন্যাসের মেরুদণ্ড। ঝুমুর গানের সুরেই নিতাইয়ের প্রেম জেগেছে, আবার সেই সুরের করুণ পরিণতিতেই সে জীবনের মোহ ত্যাগ করেছে। তাই ঝুমুর গান এখানে কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং কাহিনির গতিপথ নির্ধারণকারী এক শক্তিশালী চালিকাশক্তি

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...