সমাজ ও সভ্যতার সংজ্ঞা দাও। সমাজ ও সভ্যতার মধ্যে পার্থক্য লেখো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার দর্শন মাইনর
সমাজঃসাধারণ অর্থে 'সমাজ' বলতে একদল মানুষের সমষ্টিকে বোঝায় যারা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সাধনের জন্য একত্রিত হয়। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাকাইভার ও পেজ (MacIver and Page)-এর মতে-
"সমাজ হলো সামাজিক সম্পর্কের একটি জাল" (Society is the web of social relationships)।"
অর্থাৎ, যখন একাধিক ব্যক্তি পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এবং সম্পর্কের ভিত্তিতে একটি সুসংগঠিত কাঠামো গড়ে তোলে, তাকেই সমাজ বলে। সমাজের মূল ভিত্তি হলো চেতনা এবং সহযোগিতা।
২. সম্প্রদায়ঃ সম্প্রদায় হলো সমাজের একটি নির্দিষ্ট অংশ যেখানে মানুষ একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় বসবাস করে এবং তাদের মধ্যে এক গভীর একাত্মবোধ বা 'আমরা-বোধ' (We-feeling) কাজ করে।সমাজবিজ্ঞানী বোগার্ডাস (Bogardus)-এর মতে-
"সম্প্রদায় হলো এমন একটি সামাজিক গোষ্ঠী যেখানে কিছুটা হলেও 'আমরা-বোধ' কাজ করে এবং যারা একটি নির্দিষ্ট স্থানে বসবাস করে।"
•সমাজ ও সভ্যতার পার্থক্য•
১. নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা এলাকা।
সমাজের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা থাকা বাধ্যতামূলক নয়। সমাজ একটি বিমূর্ত ধারণা যা দেশ-কালের সীমানা ছাড়িয়ে বিস্তৃত হতে পারে।কিন্তু-
সম্প্রদায়ের একটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য হলো নির্দিষ্ট ভূখণ্ড। একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাস না করলে তাকে সম্প্রদায় বলা যায় না।
২. স্থায়িত্ব।
সমাজ কোনো নির্দিষ্ট স্থান পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে না, এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক কাঠামো।কিন্তু-
কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকা ত্যাগ করলে বা সদস্যদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হলে সেই সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব বিলীন হতে পারে।
৩. আমরা-বোধ বা সম্প্রদায়গত চেতনা।
সমাজে পারস্পরিক সম্পর্ক থাকলেও সদস্যদের মধ্যে সবসময় গভীর মানসিক একাত্মবোধ বা 'আমরা-বোধ' কাজ নাও করতে পারে।কিন্তু-
সম্প্রদায়ের মূল ভিত্তিই হলো সদস্যদের মধ্যে তীব্র 'আমরা-বোধ' বা গোষ্ঠীচেতনা। যেমন— গ্রামের মানুষ বা কোনো বিশেষ জাতিগোষ্ঠী।
৪. পরিধি বা ব্যাপকতা।
সমাজের পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। একটি বৃহৎ সমাজের মধ্যে অনেকগুলো ছোট ছোট সম্প্রদায় থাকতে পারে।কিন্তু-
সম্প্রদায়ের পরিধি তুলনামূলকভাবে ছোট এবং সীমাবদ্ধ। এটি সমাজেরই একটি অংশ বিশেষ।
৫. মূর্ত বনাম বিমূর্ত ধারণা।
সমাজ হলো সামাজিক সম্পর্কের একটি বিমূর্ত (Abstract) জাল। সম্পর্কগুলো চোখে দেখা যায় না, কেবল অনুভব করা যায়।কিন্তু -
সম্প্রদায় হলো একটি মূর্ত (Concrete) সামাজিক গোষ্ঠী। কারণ একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাসকারী জনসমষ্টিকে সরাসরি দেখা ও চিহ্নিত করা যায়।
৬. বৈচিত্র্য ও সাদৃশ্য।
সমাজে সদস্যদের মধ্যে রুচি, পেশা ও চিন্তাভাবনার ব্যাপক বৈচিত্র্য বা পার্থক্য থাকতে পারে। সমাজ মূলত 'পার্থক্য' ও 'সহযোগিতা' উভয়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। কিন্তু-
সম্প্রদায়ের সদস্যদের মধ্যে জীবনযাত্রার ধরন, ভাষা ও আচার-আচরণে অনেক বেশি সাদৃশ্য বা মিল লক্ষ্য করা যায়।
৭. লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।
সমাজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বহুমুখী এবং বিচিত্র। বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে সমাজের সদস্য হয়।কিন্তু -
সম্প্রদায়ের সদস্যদের লক্ষ্য সাধারণত জীবনযাপনের সাধারণ ও মৌলিক বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে।
৮. সংগঠনের প্রকার।
সমাজ একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা যেখানে বিভিন্ন নিয়ম-কানুন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কাজ করে।কিন্তু-
সম্প্রদায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠে। এর জন্য সবসময় সুপরিকল্পিত সংগঠনের প্রয়োজন হয় না।
৯. ব্যক্তিগত ও নৈর্ব্যক্তিক সম্পর্ক।
সমাজে সম্পর্কগুলো অনেক সময় যান্ত্রিক বা নৈর্ব্যক্তিক (Impersonal) হতে পারে (যেমন— বড় শহরের জীবন)।কিন্তু-
সম্প্রদায়ের সদস্যদের মধ্যে ব্যক্তিগত এবং ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে।কিন্তু-
১০. অন্তর্ভুক্তির ধরন।
মানুষ বিভিন্ন সামাজিক সম্পর্কের মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের সমাজের অংশ হতে পারে।কিন্তু-
একজন ব্যক্তি সাধারণত জন্মসূত্রে বা দীর্ঘস্থায়ী বসবাসের মাধ্যমে কোনো একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়।
Comments
Post a Comment