Skip to main content

হাজার চুরাশির মা’ উপন্যাসের নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করো।

হাজার চুরাশির মা’ উপন্যাসের নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করো পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (WBSU) ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মাইনর

           আমরা জানি যে,সাহিত্যের সার্থক নামকরণের মধ্য দিয়ে লেখকের জীবনদর্শন ও গল্পের মূল সুরটি প্রতিফলিত হয়।আর এই প্রেক্ষিতে  মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’ (১৯৭৪) উপন্যাসটি কেবল একটি রাজনৈতিক আখ্যান নয়, এটি সত্তরের দশকের অগ্নিগর্ভ পশ্চিমবঙ্গের এক অসামান্য দলিল।যেখানে একটি লাশের শনাক্তকরণ নম্বর কীভাবে একজন মায়ের ব্যক্তিগত শোককে বিশ্বজনীন প্রতিবাদে রূপান্তরিত করে, তা এই নামকরণের মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর সেখানে আমরা দেখি যে-

১. সংখ্যাতত্ত্ব ও ব্যক্তিপরিচয়ের বিলোপ

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সুজাতা চ্যাটার্জির মেজো ছেলে ব্রতী নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। পুলিশের গুলিতে তার মৃত্যু হয়। রাষ্ট্রীয় নথিতে ব্রতী তখন আর কোনো নাম নয়, সে কেবল একটি সংখ্যা-১০৮৪। মর্গের ডোম বা পুলিশের লাল খাতার পাতায় তার পরিচয় ছিল 'হাজার চুরাশি নম্বর লাশ' (Corpse No. 1084)।

রাষ্ট্র যখন একজন জলজ্যান্ত তরুণকে স্রেফ একটি সংখ্যায় পরিণত করে, তখন তার মানবিক অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হয়। মহাশ্বেতা দেবী এই নম্বরটিকেই শিরোনাম হিসেবে ব্যবহার করে রাষ্ট্রের সেই নিষ্ঠুরতা ও অমানবিকতাকে তীব্র কটাক্ষ করেছেন।

২. সুজাতার মাতৃত্বের রূপান্তর

উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সুজাতার যে মানসিক যাত্রা, তা হলো ব্রতীর মা থেকে ‘হাজার চুরাশির মা’ হয়ে ওঠা। সুজাতার উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্যরা ব্রতীর এই মৃত্যুকে ‘কলঙ্ক’ হিসেবে দেখে তা লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু সুজাতা একা বেরিয়ে পড়েন তার ছেলের আদর্শকে বুঝতে। তিনি যখন ব্রতীর সহযোদ্ধা সোমু বা ললুর পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন, তখন তিনি অনুভব করেন যে ব্রতী কেবল তার একার সন্তান ছিল না; সে ছিল এক বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখা এক লড়াকু প্রজন্মের প্রতিনিধি।

> উদ্ধৃতি: “দশশো চুরাশির লাশটার কি কোনো নাম নেই? ওর নাম ব্রতী। ও আমার ছেলে।”

সুজাতা যখন নিজেকে ‘হাজার চুরাশির মা’ হিসেবে পরিচয় দেন, তখন তিনি আসলে সেই সমস্ত লাঞ্ছিত, বিদ্রোহী ও নিহত সন্তানদের মা হিসেবে নিজেকে ঘোষণা করেন। এখানে মাতৃত্ব ব্যক্তিগত গণ্ডি ছাড়িয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতায় উন্নীত হয়।

৩. মেকি আভিজাত্য বনাম নগ্ন বাস্তবতা

উপন্যাসে সুজাতার স্বামী দিব্যনাথ চ্যাটার্জি এবং তার বাকি সন্তানেরা সুবিধাবাদী সমাজের প্রতিনিধি। তারা ব্রতীর মৃত্যু সংবাদ পেয়েও নিজেদের পার্টি বা সামাজিক প্রতিষ্ঠা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। দিব্যনাথ ব্রতীর লাশ শনাক্ত করতেও অস্বীকার করেছিলেন পাছে তার ‘সম্মান’হানি হয়।

এর বিপরীতে সুজাতা যখন মর্গে গিয়ে ১০৮৪ নম্বর লাশের সামনে দাঁড়ান, তখন তিনি এক নগ্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হন।

> উদ্ধৃতি: “ব্রতী আর নেই, কিন্তু ব্রতীর সেই পৃথিবীটা আছে। সেই পৃথিবীটার খবর সুজাতা রাখত না।”

নামকরণের মাধ্যমে মহাশ্বেতা দেবী দেখিয়েছেন যে, ১০৮৪ সংখ্যাটি আসলে সেই সমস্ত ব্রতীদের প্রতীক যারা সমাজের পচাগলা ব্যবস্থাকে ভাঙতে চেয়েছিল। সুজাতা সেই বিদ্রোহের উত্তরসূরি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

৪. ব্যঞ্জনা ও সামাজিক প্রতিবাদ

নামকরণটি এখানে গভীর ব্যঞ্জনা বহন করে। ‘হাজার চুরাশির মা’ শব্দটি উচ্চারণ করার অর্থ হলো রাষ্ট্রের সেই ব্যবস্থার গালে চড় মারা, যা মানুষকে সংখ্যা দিয়ে বিচার করে। উপন্যাসের শেষে সুজাতার আর্তনাদ ও অসুস্থতা আসলে সমাজের জড়তার বিরুদ্ধে এক চূড়ান্ত ধিক্কার।

সুজাতা যখন ব্রতীর বন্ধুদের বাড়িতে যান, তিনি দেখেন যে দারিদ্র্য ও নিপীড়ন সত্ত্বেও তারা মাথা নত করেনি। এই অভিজ্ঞতা তাকে শেখায় যে ব্রতী কোনো ভুল করেনি। এই উপলব্ধির মাধ্যমেই তিনি ‘হাজার চুরাশির মা’ হিসেবে সার্থকতা খুঁজে পান।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, মহাশ্বেতা দেবী কোনো অলঙ্কারিক নাম ব্যবহার না করে একটি রূঢ় ও যান্ত্রিক সংখ্যাকে (১০৮৪) শিরোনাম হিসেবে বেছে নিয়ে উপন্যাসের ট্র্যাজেডিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। এই নামকরণটি যেমন চরিত্রধর্মী (সুজাতার উত্তরণ), তেমনি এটি গভীর রাজনৈতিক ইঙ্গিতবহ। লাশের নম্বরকে অবলম্বন করে একটি মহৎ মাতৃত্বের লড়াই ও চেতনার জাগরণ চিত্রিত হয়েছে বলে এই নামকরণটি শিল্পগত ও বিষয়গত দিক থেকে সম্পূর্ণ সার্থক ও কালোত্তীর্ণ।

পরীক্ষার জন্য বিশেষ টিপস:

 * উত্তরে '১০৮৪' সংখ্যাটি এবং সুজাতা বনাম দিব্যনাথের বৈপরীত্য অবশ্যই উল্লেখ করবেন।

 * মহাশ্বেতা দেবীর কলমে সত্তরের দশকের নকশাল আন্দোলনের প্রেক্ষাপটটি এক লাইনে ছুঁয়ে যাবেন।

 * উদ্ধৃতিগুলো নীল কালিতে বা ইনভার্টেড কমার মধ্যে লিখলে উত্তরটির মান বাড়বে।

আপনার পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য আর কোনো সাহায্য প্রয়োজন?


Comments

Popular posts from this blog

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর।

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মাইনর সিলেবাস)  ১)চার্বাক মতে ভূত কয়টি ও কি কি? উত্তরঃচার্বাক মতে ভূত চারটি- ক্ষিতি, অপ্ , তেজ ও মরুৎ ২) স্বভাববাদ কী? উত্তরঃ চার্বাক জড়বাদের ভিত্তি হল স্বভাববাদ। যে মতবাদ অনুসারে স্বভাব থেকেই ভূত সৃষ্টি, আবার স্বভাব থেকেই বিচ্ছেদ। যার জন্য ঈশ্বরকে স্বীকার করা প্রয়োজন নেই। ৩) অব্যাপ্যদেশ কথাটির অর্থ লেখো। উত্তরঃ অব্যাপ্যদেশ বলতে বোঝায়- অশাব্দ অর্থাৎ যাকে শব্দের দ্বারা প্রকাশ করা যায় না। ৫) জ্ঞান লক্ষণ প্রত্যক্ষ কাকে বলে?  কোন একটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তার নিজের বিষয়ীভূত গুণ ছাড়াও যদি অপর একটি ইন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূত গুণকে প্রত্যক্ষ করার হয়, তাহলে সেই প্রত্যক্ষকে জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ বলা হয়। ৬) ন্যায় মতে প্রমাণের প্রকার  উত্তরঃ ন্যায় মতে প্রমাণ চার প্রকার। প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান এবং শাব্দ। ৭) সন্নিকর্ষ কাকে বলে? উত্তরঃ ন্যায় মতে ইন্দ্রিয় ও কোন বাস্তব পদার্থের মধ্যে একপ্রকার বিশেষ সম্পর্ক ঘটলে তবেই আমাদের একটি বস্তুর প্রত্যক্ষজ্ঞান ।আর ঐ বিশেষ বিশেষ সম্পর্কের পারিভাষিক নাম হলো সন...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...

ব্রিটিশ(3rd.Sem) পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর সিলেবাস)।         আমরা জানি যে,ব্রিটেনের সংবিধান অলিখিত বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি, পার্লামেন্ট প্রণীত আইন প্রভৃতির মাধ্যমে পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট আইনানুগ সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব নয়। আর সেখানে ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে আইনানুগ সার্বভৌমত্ব বলা হয়, কারণ-       যেকোনো বিষয়ে পার্লামেন্ট আইন প্রণনয়নের অধিকারী। তবে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হওয়ায় পার্লামেন্টে কোন আইন প্রণয়নের সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না। আসলে সেখানে কমন্সসভা তথা নিম্নকক্ষের সার্বভৌমত্বকেই বলা হয় পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব।     ••ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে সার্বভৌমত্ব বলার কারণ- ১) পার্লামেন্টের ওপর আইনগত কোনরূপ বাধানিষেধ আরোপ করা যায় না। ২) পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের বৈধতার ব্যাপারে আদালত কোন প্রশ্ন তুলতে পারেনা। ব্রিটেনের আদালত পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের ওপর বিচার বি...