Skip to main content

 

অষ্টাদশ শতাব্দীতে শাক্ত পদাবলীর উদ্ভবের কারণসমূহ

 আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে বৈষ্ণব পদাবলীর পর শাক্ত পদাবলীই ছিল সবচেয়ে প্রভাবশালী ধারা। এই ধারার উদ্ভবের পেছনে তৎকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় প্রেক্ষাপট ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। আর এই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা শাক্তপদাবলীর উদ্ভবের কারণসমূহ গুলি নিম্ন সুত্রাকারে বলতে পারি। 

       •রাজনৈতিক অস্থিরতা ও চরম বিপর্যয়ের ছবি চিত্রাংকন শাক্ত পদাবলী।অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলা ছিল চরম বিশৃঙ্খলার সময়। মোগল সাম্রাজ্যের পতন, নবাবী শাসনের দুর্বলতা এবং মারাঠা দস্যু বা 'বর্গী' হাঙ্গামায় বাংলার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। ১৭৭০ সালের (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) ভয়াবহ 'ছিয়াত্তরের মন্বন্তর' মানুষের মনে এক গভীর নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে। এই চরম সংকটের মুহূর্তে মানুষ বৈষ্ণব ধর্মের কোমল 'পরকীয়া' প্রেমের চেয়ে মহাশক্তির আরাধনায় বেশি ভরসা খুঁজে পায়। আদ্যাশক্তি চণ্ডী বা কালীর চরণে আশ্রয় পাওয়ার আকুতি থেকেই শাক্ত পদাবলীর জন্ম।

২. বৈষ্ণব পদাবলীর অতি-আতিশয্য ও বিবর্তন

চতুর্দশ থেকে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত বৈষ্ণব পদাবলী বাংলার আকাশ-বাতাস মুখরিত করে রেখেছিল। কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীতে এসে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা অনেকটা গতানুগতিক ও দেহজ কামনার পর্যায়ে নেমে আসে। বিদ্যাপতি-চণ্ডীদাসের সেই গভীর আধ্যাত্মিক আবেদন তখন স্তিমিত। সাধারণ মানুষ তখন রাধার বিরহের চেয়ে নিজের ঘরের অভাব-অনটন এবং বাস্তব জীবনের যন্ত্রণাকে বেশি প্রাধান্য দিতে শুরু করে। ফলে আধ্যাত্মিক তৃষ্ণার মোড় ঘোরে শক্তির আরাধনার দিকে।

৩. বাৎসল্য রসের নতুন আবেদন (উমা-মেনকা সংবাদ)

শাক্ত পদাবলীর একটি প্রধান অংশ হলো 'আগমনী-বিজয়া'। এখানে দেবী দুর্গা বা উমা ঘরের মেয়ে হিসেবে কল্পিত। অষ্টাদশ শতাব্দীর ভেঙে পড়া সমাজব্যবস্থায় কন্যাকে অল্প বয়সে শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ার যে সামাজিক যন্ত্রণা ছিল, মেনকা ও উমার সম্পর্কের মাধ্যমে পদকর্তারা তা ফুটিয়ে তুলেছেন। বৈষ্ণব পদাবলীতে যে 'বাৎসল্য রস' (যশোদা-কৃষ্ণ) ছিল, তা শাক্ত পদাবলীতে এসে বাঙালি মা ও মেয়ের চিরায়ত করুণ রসে রূপান্তরিত হয়। রামপ্রসাদ সেনের পদে ফুটে ওঠে:

> "গিরি, এবার আমার উমা এলে, আর উমা পাঠাব না।"

৪. লৌকিক চণ্ডীমঙ্গলের বিবর্তন

মঙ্গলকাব্য ধারায় চণ্ডী বা কালীর মহিমা আগে থেকেই গীত হতো। কিন্তু মঙ্গলকাব্য ছিল আখ্যানধর্মী এবং দীর্ঘ। অষ্টাদশ শতাব্দীর মানুষ বড় কাব্যের চেয়ে সংক্ষিপ্ত ও গীতিধর্মী পদের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়। চণ্ডীমঙ্গলের সেই রুদ্রাণী চণ্ডীই শাক্ত পদাবলীতে এসে স্নেহময়ী মা এবং ঘরের মেয়ে উমায় পরিণত হন। শাক্ত কবিরা দেবীকে স্বর্গ থেকে নামিয়ে মর্ত্যের বাঙালির ঘরে ঠাঁই দেন।

৫. রামপ্রসাদ সেন ও কমলাকান্তের আবির্ভাব

যেকোনো সাহিত্যিক ধারার উত্থানের পেছনে কোনো না কোনো প্রতিভাধর স্রষ্টার অবদান থাকে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে রামপ্রসাদ সেন তাঁর ভক্তিপূর্ণ কণ্ঠ ও মরমী সুরের (প্রসাদী সুর) মাধ্যমে শাক্ত পদাবলীকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন। তাঁর কালজয়ী পঙক্তি:

> "মা আমায় ঘুরাবি কত? / যেমন কলুর চোখ-ঢাকা বলদ গাছ ঘুরপাক খায় অবিরত।।"

> পরবর্তীতে দেওয়ান কমলাকান্ত ভট্টাচার্য এই ধারাকে আরও মার্জিত ও দার্শনিক রূপ দান করেন। তাঁদের ব্যক্তিগত সাধনা ও কবিত্বশক্তি শাক্ত পদাবলীর উদ্ভবকে ত্বরান্বিত করে।

৬. তান্ত্রিক সাধনার প্রভাব ও লোকবিশ্বাস

অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাংলায় তন্ত্রসাধনার একটি অন্তঃসলিলা ধারা প্রবাহিত ছিল। বীরভূম, বর্ধমান ও নদীয়া অঞ্চলে তান্ত্রিক সাধকদের প্রভাব বাড়তে থাকে। সাধারণ মানুষের মধ্যে রক্ষাকালী বা শ্যামা মায়ের প্রতি ভীতি ও ভক্তি দুই-ই বিদ্যমান ছিল। শাক্ত পদাবলী এই তান্ত্রিক দর্শনকে সাধারণ মানুষের বোধগম্য এবং গীতিময় করে তোলে।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, অষ্টাদশ শতাব্দীতে শাক্ত পদাবলীর উদ্ভব কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল একদিকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে আধ্যাত্মিক প্রতিবাদ, অন্যদিকে বাঙালির পারিবারিক অনুভূতির শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ। বৈষ্ণব ধর্মের 'মধুর রস' যেখানে হার মেনেছিল, শাক্ত ধর্মের 'বাৎসল্য' ও 'ভক্তি রস' সেখানে বাঙালির আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের মতো সামন্ত প্রভুদের পৃষ্ঠপোষকতাও এই ধারার বিকাশে সহায়ক হয়েছিল। ধর্ম, সমাজ এবং মানবিক বেদনার এই ত্রিবেণী সঙ্গমেই জন্ম নেয় কালজয়ী শাক্ত পদাবলী।


Comments

Popular posts from this blog

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর।

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মাইনর সিলেবাস)  ১)চার্বাক মতে ভূত কয়টি ও কি কি? উত্তরঃচার্বাক মতে ভূত চারটি- ক্ষিতি, অপ্ , তেজ ও মরুৎ ২) স্বভাববাদ কী? উত্তরঃ চার্বাক জড়বাদের ভিত্তি হল স্বভাববাদ। যে মতবাদ অনুসারে স্বভাব থেকেই ভূত সৃষ্টি, আবার স্বভাব থেকেই বিচ্ছেদ। যার জন্য ঈশ্বরকে স্বীকার করা প্রয়োজন নেই। ৩) অব্যাপ্যদেশ কথাটির অর্থ লেখো। উত্তরঃ অব্যাপ্যদেশ বলতে বোঝায়- অশাব্দ অর্থাৎ যাকে শব্দের দ্বারা প্রকাশ করা যায় না। ৫) জ্ঞান লক্ষণ প্রত্যক্ষ কাকে বলে?  কোন একটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তার নিজের বিষয়ীভূত গুণ ছাড়াও যদি অপর একটি ইন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূত গুণকে প্রত্যক্ষ করার হয়, তাহলে সেই প্রত্যক্ষকে জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ বলা হয়। ৬) ন্যায় মতে প্রমাণের প্রকার  উত্তরঃ ন্যায় মতে প্রমাণ চার প্রকার। প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান এবং শাব্দ। ৭) সন্নিকর্ষ কাকে বলে? উত্তরঃ ন্যায় মতে ইন্দ্রিয় ও কোন বাস্তব পদার্থের মধ্যে একপ্রকার বিশেষ সম্পর্ক ঘটলে তবেই আমাদের একটি বস্তুর প্রত্যক্ষজ্ঞান ।আর ঐ বিশেষ বিশেষ সম্পর্কের পারিভাষিক নাম হলো সন...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...

ব্রিটিশ(3rd.Sem) পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর সিলেবাস)।         আমরা জানি যে,ব্রিটেনের সংবিধান অলিখিত বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি, পার্লামেন্ট প্রণীত আইন প্রভৃতির মাধ্যমে পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট আইনানুগ সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব নয়। আর সেখানে ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে আইনানুগ সার্বভৌমত্ব বলা হয়, কারণ-       যেকোনো বিষয়ে পার্লামেন্ট আইন প্রণনয়নের অধিকারী। তবে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হওয়ায় পার্লামেন্টে কোন আইন প্রণয়নের সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না। আসলে সেখানে কমন্সসভা তথা নিম্নকক্ষের সার্বভৌমত্বকেই বলা হয় পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব।     ••ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে সার্বভৌমত্ব বলার কারণ- ১) পার্লামেন্টের ওপর আইনগত কোনরূপ বাধানিষেধ আরোপ করা যায় না। ২) পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের বৈধতার ব্যাপারে আদালত কোন প্রশ্ন তুলতে পারেনা। ব্রিটেনের আদালত পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের ওপর বিচার বি...