Skip to main content

 


'হাজার চুরাশির মা' উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে সুজাতার বিবর্তন আলোচনা করো। একজন সাধারণ ঘরোয়া মা থেকে কীভাবে তিনি এক বিপ্লবী সত্তার জননী হয়ে উঠলেন? আলোচনা করো।

          আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সুজাতা চ্যাটার্জির বিবর্তন একাধারে যন্ত্রণাময় এবং মুক্তিপ্রদ। একজন সাধারণ উচ্চবিত্ত পরিবারের অন্তরালবর্তী গৃহবধূ থেকে তাঁর ‘হাজার চুরাশির মা’ তথা এক বিপ্লবী সত্তার জননী হয়ে ওঠা সুজাতা চরিত্রের বিবর্তন ও উত্তরণে আমরা দেখতে পাই-

          •উপন্যাসের শুরুতে সুজাতা একজন সাধারণ ঘরোয়া মা এবং এক অবদমিত গৃহবধূ।যিনি তাঁর স্বামী দিব্যনাথের আধিপত্যবাদী এবং নীতিহীন সংসারে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন। দিব্যনাথের লম্পটতা ও সুবিধাবাদী আচরণের বিপরীতে সুজাতা ছিলেন শান্ত ও নিরুদ্দেশ। তাঁর একমাত্র মানসিক আশ্রয় ছিল তাঁর ছোট ছেলে ব্রতী। ব্রতী কেন নকশাল আন্দোলনে জড়িয়েছিল, তার রাজনৈতিক আদর্শ কী ছিল-তা সুজাতা শুরুতে জানতেন না। তিনি কেবল জানতেন ব্রতী তাঁর একান্ত আপন। তবে-

        ব্রতীর মৃত্যুর খবর যখন আসে, তখন পরিবারের অন্য সদস্যরা নিজেদের ‘সম্মান’ বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু সুজাতা একাই মর্গে যান তাঁর সন্তানের লাশ শনাক্ত করতে। সেখানে ব্রতী আর ‘ব্রতী’ ছিল না, সে ছিল স্রেফ ‘১০৮৪ নম্বর লাশ’। এই সংখ্যাটিই সুজাতার আমূল পরিবর্তনের প্রথম সোপান। মর্গের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা সুজাতাকে ঘরোয়া গণ্ডি থেকে বাইরের রূঢ় বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

    ব্রতীর পৃথিবীকে আবিষ্কার করতে চায় মা সুজাতা।ব্রতীর মৃত্যুর পর সুজাতা স্থির হয়ে ঘরে বসে থাকেননি। তিনি ব্রতীর আদর্শের উৎস খুঁজতে বের হন। তিনি যান ব্রতীর সহযোদ্ধা সোমু বা ললুর বাড়িতে। নিম্নবিত্ত সেই পরিবারগুলোর দারিদ্র্য এবং বীরত্ব দেখে সুজাতা স্তম্ভিত হন। তিনি উপলব্ধি করেন, তাঁর ছেলে কোনো ‘সন্ত্রাসবাদী’ ছিল না, বরং সে এক পচা-গলা সমাজব্যবস্থাকে ভাঙতে চেয়েছিল। আর সে কারণেই মা সুজাতাকে বলতে শুনি-

 “ব্রতী আর নেই, কিন্তু ব্রতীর সেই পৃথিবীটা আছে। সেই পৃথিবীটার খবর সুজাতা রাখত না।”

         সুজাতার বিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর মাতৃত্বের বিশ্বজনীনতা। অর্থাৎ এখানে সুজাতার মাতৃত্বের রূপান্তর ও বিপ্লবী সত্তার স্বীকৃতি পায়।যেখানে তিনি বুঝতে পারেন যে,তাঁর পরিবারের মেকি আভিজাত্য আসলে ব্রতীর হত্যার জন্য দায়ী। ব্রতীর বিশ্বাসঘাতক বন্ধু অনপ বা নিজের পরিবারের প্রতি তাঁর ঘৃণা বাড়তে থাকে। তিনি আবিষ্কার করেন যে ব্রতীর লড়াই আসলে তাঁর নিজেরও লড়াই-দিব্যনাথের মতো শোষকদের বিরুদ্ধে।তবে-

       সুজাতা যখন নিজেকে ‘হাজার চুরাশির মা’ হিসেবে গ্রহণ করেন, তখন তিনি আর কেবল একজন বিলাপকারী মা থাকেন না, তিনি হয়ে ওঠেন শোষিত ও বিদ্রোহী প্রজন্মের অভিভাবক।

 “১০৮৪-র লাশটার কি কোনো নাম নেই? ওর নাম ব্রতী। ও আমার ছেলে।”

     -এই সংলাপের মাধ্যমেই সুজাতা রাষ্ট্রীয় যান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে নিজের মাতৃত্বের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন।

      সুজাতার চূড়ান্ত বিদ্রোহ ও চরিত্রের বিবর্তন।উপন্যাসের শেষে আমরা এক অন্য সুজাতাকে দেখি। নীতু ও টনির বাগদান অনুষ্ঠানে যখন পরিবারের সবাই আনন্দে মত্ত, তখন সুজাতা সেই পরিবেশের কৃত্রিমতায় অসুস্থ বোধ করেন। তাঁর অ্যাপেন্ডিক্সের ব্যথা আসলে তাঁর ভেতরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের প্রতীক। তিনি উপলব্ধি করেন যে যারা ব্রতীকে হত্যা করেছে, তারাই আজ উৎসব করছে।আর সেখানে-

        সুজাতার এই উপলব্ধিই তাঁকে বিপ্লবী সত্তার জননী করে তোলে। তিনি বুঝতে পারেন ব্রতী মৃত হলেও তাঁর আদর্শ বেঁচে আছে সেই সব যুবকদের মধ্যে যারা এখনো লড়াই করছে।

উপসংহার

সুজাতা চরিত্রের বিবর্তন আসলে একটি লাঞ্ছিত সত্তার জাগরণ। ঘরোয়া কোণঠাসা জীবন থেকে তিনি বেরিয়ে এসেছেন এক বৃহৎ রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনার আঙিনায়। মহাশ্বেতা দেবী দেখিয়েছেন, মৃত সন্তানের রক্ত মাখানো নম্বরটিই সুজাতার নবজন্মের কারণ। তাই সুজাতা কেবল একটি চরিত্র নন, তিনি হয়ে উঠেছেন রাষ্ট্রের দমননীতির বিরুদ্ধে এক চিরন্তন প্রতিবাদী মায়ের কণ্ঠস্বর।



Comments

Popular posts from this blog

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর।

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মাইনর সিলেবাস)  ১)চার্বাক মতে ভূত কয়টি ও কি কি? উত্তরঃচার্বাক মতে ভূত চারটি- ক্ষিতি, অপ্ , তেজ ও মরুৎ ২) স্বভাববাদ কী? উত্তরঃ চার্বাক জড়বাদের ভিত্তি হল স্বভাববাদ। যে মতবাদ অনুসারে স্বভাব থেকেই ভূত সৃষ্টি, আবার স্বভাব থেকেই বিচ্ছেদ। যার জন্য ঈশ্বরকে স্বীকার করা প্রয়োজন নেই। ৩) অব্যাপ্যদেশ কথাটির অর্থ লেখো। উত্তরঃ অব্যাপ্যদেশ বলতে বোঝায়- অশাব্দ অর্থাৎ যাকে শব্দের দ্বারা প্রকাশ করা যায় না। ৫) জ্ঞান লক্ষণ প্রত্যক্ষ কাকে বলে?  কোন একটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তার নিজের বিষয়ীভূত গুণ ছাড়াও যদি অপর একটি ইন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূত গুণকে প্রত্যক্ষ করার হয়, তাহলে সেই প্রত্যক্ষকে জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ বলা হয়। ৬) ন্যায় মতে প্রমাণের প্রকার  উত্তরঃ ন্যায় মতে প্রমাণ চার প্রকার। প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান এবং শাব্দ। ৭) সন্নিকর্ষ কাকে বলে? উত্তরঃ ন্যায় মতে ইন্দ্রিয় ও কোন বাস্তব পদার্থের মধ্যে একপ্রকার বিশেষ সম্পর্ক ঘটলে তবেই আমাদের একটি বস্তুর প্রত্যক্ষজ্ঞান ।আর ঐ বিশেষ বিশেষ সম্পর্কের পারিভাষিক নাম হলো সন...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...

ব্রিটিশ(3rd.Sem) পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর সিলেবাস)।         আমরা জানি যে,ব্রিটেনের সংবিধান অলিখিত বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি, পার্লামেন্ট প্রণীত আইন প্রভৃতির মাধ্যমে পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট আইনানুগ সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব নয়। আর সেখানে ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে আইনানুগ সার্বভৌমত্ব বলা হয়, কারণ-       যেকোনো বিষয়ে পার্লামেন্ট আইন প্রণনয়নের অধিকারী। তবে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হওয়ায় পার্লামেন্টে কোন আইন প্রণয়নের সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না। আসলে সেখানে কমন্সসভা তথা নিম্নকক্ষের সার্বভৌমত্বকেই বলা হয় পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব।     ••ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে সার্বভৌমত্ব বলার কারণ- ১) পার্লামেন্টের ওপর আইনগত কোনরূপ বাধানিষেধ আরোপ করা যায় না। ২) পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের বৈধতার ব্যাপারে আদালত কোন প্রশ্ন তুলতে পারেনা। ব্রিটেনের আদালত পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের ওপর বিচার বি...