হাজার চুরাশির মা' উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে সুজাতার বিবর্তন আলোচনা করো। একজন সাধারণ ঘরোয়া মা থেকে কীভাবে তিনি এক বিপ্লবী সত্তার জননী হয়ে উঠলেন? আলোচনা করো।
'হাজার চুরাশির মা' উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে সুজাতার বিবর্তন আলোচনা করো। একজন সাধারণ ঘরোয়া মা থেকে কীভাবে তিনি এক বিপ্লবী সত্তার জননী হয়ে উঠলেন? আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মাইনর, Unit-4/b
আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সুজাতা চ্যাটার্জির বিবর্তন একাধারে যন্ত্রণাময় এবং মুক্তিপ্রদ। একজন সাধারণ উচ্চবিত্ত পরিবারের অন্তরালবর্তী গৃহবধূ থেকে তাঁর ‘হাজার চুরাশির মা’ তথা এক বিপ্লবী সত্তার জননী হয়ে ওঠা সুজাতা চরিত্রের বিবর্তন ও উত্তরণে আমরা দেখতে পাই-
•উপন্যাসের শুরুতে সুজাতা একজন সাধারণ ঘরোয়া মা এবং এক অবদমিত গৃহবধূ।যিনি তাঁর স্বামী দিব্যনাথের আধিপত্যবাদী এবং নীতিহীন সংসারে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন। দিব্যনাথের লম্পটতা ও সুবিধাবাদী আচরণের বিপরীতে সুজাতা ছিলেন শান্ত ও নিরুদ্দেশ। তাঁর একমাত্র মানসিক আশ্রয় ছিল তাঁর ছোট ছেলে ব্রতী। ব্রতী কেন নকশাল আন্দোলনে জড়িয়েছিল, তার রাজনৈতিক আদর্শ কী ছিল-তা সুজাতা শুরুতে জানতেন না। তিনি কেবল জানতেন ব্রতী তাঁর একান্ত আপন। তবে-
ব্রতীর মৃত্যুর খবর যখন আসে, তখন পরিবারের অন্য সদস্যরা নিজেদের ‘সম্মান’ বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু সুজাতা একাই মর্গে যান তাঁর সন্তানের লাশ শনাক্ত করতে। সেখানে ব্রতী আর ‘ব্রতী’ ছিল না, সে ছিল স্রেফ ‘১০৮৪ নম্বর লাশ’। এই সংখ্যাটিই সুজাতার আমূল পরিবর্তনের প্রথম সোপান। মর্গের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা সুজাতাকে ঘরোয়া গণ্ডি থেকে বাইরের রূঢ় বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
ব্রতীর পৃথিবীকে আবিষ্কার করতে চায় মা সুজাতা।ব্রতীর মৃত্যুর পর সুজাতা স্থির হয়ে ঘরে বসে থাকেননি। তিনি ব্রতীর আদর্শের উৎস খুঁজতে বের হন। তিনি যান ব্রতীর সহযোদ্ধা সোমু বা ললুর বাড়িতে। নিম্নবিত্ত সেই পরিবারগুলোর দারিদ্র্য এবং বীরত্ব দেখে সুজাতা স্তম্ভিত হন। তিনি উপলব্ধি করেন, তাঁর ছেলে কোনো ‘সন্ত্রাসবাদী’ ছিল না, বরং সে এক পচা-গলা সমাজব্যবস্থাকে ভাঙতে চেয়েছিল। আর সে কারণেই মা সুজাতাকে বলতে শুনি-
“ব্রতী আর নেই, কিন্তু ব্রতীর সেই পৃথিবীটা আছে। সেই পৃথিবীটার খবর সুজাতা রাখত না।”
সুজাতার বিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর মাতৃত্বের বিশ্বজনীনতা। অর্থাৎ এখানে সুজাতার মাতৃত্বের রূপান্তর ও বিপ্লবী সত্তার স্বীকৃতি পায়।যেখানে তিনি বুঝতে পারেন যে,তাঁর পরিবারের মেকি আভিজাত্য আসলে ব্রতীর হত্যার জন্য দায়ী। ব্রতীর বিশ্বাসঘাতক বন্ধু অনপ বা নিজের পরিবারের প্রতি তাঁর ঘৃণা বাড়তে থাকে। তিনি আবিষ্কার করেন যে ব্রতীর লড়াই আসলে তাঁর নিজেরও লড়াই-দিব্যনাথের মতো শোষকদের বিরুদ্ধে।তবে-
সুজাতা যখন নিজেকে ‘হাজার চুরাশির মা’ হিসেবে গ্রহণ করেন, তখন তিনি আর কেবল একজন বিলাপকারী মা থাকেন না, তিনি হয়ে ওঠেন শোষিত ও বিদ্রোহী প্রজন্মের অভিভাবক।
“১০৮৪-র লাশটার কি কোনো নাম নেই? ওর নাম ব্রতী। ও আমার ছেলে।”
-এই সংলাপের মাধ্যমেই সুজাতা রাষ্ট্রীয় যান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে নিজের মাতৃত্বের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন।
সুজাতার চূড়ান্ত বিদ্রোহ ও চরিত্রের বিবর্তন।উপন্যাসের শেষে আমরা এক অন্য সুজাতাকে দেখি। নীতু ও টনির বাগদান অনুষ্ঠানে যখন পরিবারের সবাই আনন্দে মত্ত, তখন সুজাতা সেই পরিবেশের কৃত্রিমতায় অসুস্থ বোধ করেন। তাঁর অ্যাপেন্ডিক্সের ব্যথা আসলে তাঁর ভেতরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের প্রতীক। তিনি উপলব্ধি করেন যে যারা ব্রতীকে হত্যা করেছে, তারাই আজ উৎসব করছে।আর সেখানে-
সুজাতার এই উপলব্ধিই তাঁকে বিপ্লবী সত্তার জননী করে তোলে। তিনি বুঝতে পারেন ব্রতী মৃত হলেও তাঁর আদর্শ বেঁচে আছে সেই সব যুবকদের মধ্যে যারা এখনো লড়াই করছে।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,সুজাতা চরিত্রের বিবর্তন আসলে একটি লাঞ্ছিত সত্তার জাগরণ। ঘরোয়া কোণঠাসা জীবন থেকে তিনি বেরিয়ে এসেছেন এক বৃহৎ রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনার আঙিনায়। মহাশ্বেতা দেবী দেখিয়েছেন, মৃত সন্তানের রক্ত মাখানো নম্বরটিই সুজাতার নবজন্মের কারণ। তাই সুজাতা কেবল একটি চরিত্র নন, তিনি হয়ে উঠেছেন রাষ্ট্রের দমননীতির বিরুদ্ধে এক চিরন্তন প্রতিবাদী মায়ের কণ্ঠস্বর।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, সাজেশন, টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHERKABITA KABITA SUNDORBON YouTube channel SAMARESH SIR
Comments
Post a Comment