Skip to main content

চর্যাপদে প্রতিফলিত বাংলার ব্রাত্য জীবনকথার পরিচয় দাও।

চর্যাপদে প্রতিফলিত বাংলার ব্রাত্য জীবনকথার পরিচয় দাও(সমাজচিত্র)।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মেজর।

       আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধ সহজিয়া সিদ্ধাচার্যদের সাধন-সংগীত হলেও এর পরতে পরতে মিশে আছে হাজার বছর আগের বাঙালির প্রাত্যহিক জীবনের ধুলোবালির কর্মকথা। শুধু তাই নয়,সমকালীন সমাজব্যবস্থায় উচ্চবর্গের শোষণে কোণঠাসা যে 'ব্রাত্য' বা অন্ত্যজ শ্রেণী, তাঁদের জীবনই চর্যাকারদের রূপক ও প্রতীকের প্রধান উৎস।আসলে ধর্মতত্ত্বের আড়ালে এখানে ফুটে উঠেছে সাধারণ মানুষের অভাব, পেশা, আমোদ-প্রমোদ এবং সামাজিক সংগ্রামের এক জীবন্ত দলিল। আর সেই জীবন্ত দলিলে আমরা দেখতে পাই-

       •সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও অস্পৃশ্যতার চর্যাপদের একটি অন্যতম মূল্যবান সম্পদ। আসলে চর্যাপদের যুগে সমাজ ছিল বর্ণাশ্রমের কঠোর শাসনে আবদ্ধ। ডোম, চণ্ডাল, শবর প্রভৃতি নিম্নবর্গের মানুষেরা নগরের সীমানার মধ্যে থাকার অধিকার পেত না। সমাজতাত্ত্বিক বিচারে তারা ছিল একান্তভাবে 'অস্পৃশ্য'। আর সেখানে আমরা চর্যাপদ গ্রন্থে কাহ্নপাদের ১০ নম্বর পদে আমরা দেখতে পাই-

 "নগর বাহিরি রে ডোম্বি তোহোরি কুড়িয়া।

ছোই ছোই যাহ সো বাহ্মণ নাড়িয়া।।"

     আসলে সে যুগে নিম্ন শ্রেণীর মানুষ অর্থাৎ ডোম্বিদের বাস নগরের বাইরে এবং উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণরা তাদের স্পর্শ বাঁচিয়ে চলতেন। আর এই পরিপ্রেক্ষিতে উক্ত পঙক্তিটি তৎকালীন ব্রাত্য সমাজের প্রান্তিক অবস্থানের এক অকাট্য প্রমাণ করে দেয়। শুধু তাই নয়-

      •দারিদ্র্যের নগ্ন রূপের সমাজ চিত্র চর্যাপদে স্পষ্টভাবে লক্ষণীয়। আসলে সে যুগে ব্রাত্য জীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল চরম দারিদ্র্য। ঢেনঢণ পা-র ৩৩ নম্বর পদে বাঙালির চিরকালীন অন্নকষ্টের যে ছবি ফুটেছে, তা আজও প্রাসঙ্গিক। শুধুমাত্র প্রাসঙ্গিক নয় দারিদ্রতার চরম রূপ লক্ষণীয়। এখানে আমরা দেখি-

"টালত মোর ঘর নাহি পড়বেষী।

হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী।।"

        আসলে উক্ত পদের মধ্যে দিয়ে আমরা জানতে পারি যে পাহাড়ের টিলায় একাকী ঘর, প্রতিবেশীর অভাব এবং হাঁড়িতে প্রতিদিনের অন্ন নেই-এই চিত্রটি ব্রাত্য মানুষের নুন আনতে পান্তা ফুরানোর জীবনসংগ্রামকে চিত্রিত করে। দারিদ্র্যের কারণে তাদের অভাব ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। পাশাপাশি আমরা আরও দেখতে পাই যে -

      •বৈচিত্র্যময় পেশা ও জীবনসংগ্রামের ছবি চর্যাপদ।চর্যাপদের ব্রাত্য মানুষগুলো অলস ছিল না। জীবনধারণের জন্য তারা নানা কঠিন পরিশ্রমের পেশা বেছে নিয়েছিল। আর সেই সকল পেশার মধ্যে অন্যতম ছিল -শিকারী ও ব্যাধ জীবন। আর সেখানে  শবর ও নিষাদরা পাহাড়ে বাস করত এবং পশুপাখি শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করত। তাদের জীবন ছিল রোমাঞ্চ ও ঝুঁকিতে ভরা। পাশাপাশি আমরা আরও দেখতে পাই যে-

      • নদীমাতৃক বাংলার খেয়া পারাপার ছিল অন্যতম পেশা। ডোম-ডোম্বিনীরা নৌকা বেয়ে পারাপারের কাজ করত।আবার-বিরুআ পা-র  একটি পদে 'শুঁড়ি' বা মদ বিক্রেতা নারীর উল্লেখ পাওয়া যায়, যারা সরু নল দিয়ে মদ চোলাই করত।সেইসাথে- তুলা ধুনে পেঁজা এবং কাপড় বোনার কারিগরদের জীবনও চর্যাপদে স্থান পেয়েছে।এরই পাশাপাশি-

        •নারীর অবস্থান ও পারিবারিক জীবন চর্যাপদের বহু আলোচিত বিষয়।ব্রাত্য সমাজে নারীরাও পুরুষের সমান পরিশ্রম করত। তাদের সাজসজ্জায় কোনো রাজকীয় জৌলুস ছিল না, বরং ছিল অরণ্যের সহজ সৌন্দর্য। শবরী নারীর বর্ণনায় উঠে এসেছে -

"গুঞ্জরী মালী গাহিরে শবরী পাগল শবরো পৈঠো মোরে।।"

        গলায় গুঞ্জা ফুলের মালা পরে শবরী নারী অরণ্যে ঘুরে বেড়াত। আবার পরিবারে শাশুড়ি-বউয়ের দ্বন্দ্ব, সন্তান জন্মদান এবং গৃহস্থালি কাজের নানা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বর্ণনায় সেকালের সাধারণ সমাজ ধরা পড়েছে। এই সাধারণ সমাজ চিত্রের মধ্যে আরও আমরা দেখতে পাই -

      •আমোদ-প্রমোদ ও লৌকিক সংস্কৃতির চিত্র চর্যাপদে বৈচিত্র্যময়।কঠোর দারিদ্র্যের মধ্যেও ব্রাত্য মানুষেরা উৎসবে মেতে উঠত। বিবাহ ছিল তাদের জীবনের এক বড় উৎসব। বাদ্যযন্ত্র হিসেবে মাদল, করণ্ড ও বাঁশির ব্যবহার ছিল। ১৯ নম্বর পদে ডোম-কন্যার বিবাহের রূপকের মাধ্যমে তৎকালীন বরযাত্রী ও উৎসবের বর্ণনা পাওয়া যায়। এছাড়া পাশা খেলা এবং মদ পান ছিল তাদের অবসরের সঙ্গী।তবে-

      •অরণ্য ও নদীনির্ভর জীবন চর্যাপদের নিম্ন শ্রেণীর মানুষগুলির।ব্রাত্য মানুষের ঘরবাড়ি ছিল মূলত বাঁশ, লতাপাতা ও খড়ের তৈরি কুঁড়েঘর। তারা নদী পার হওয়ার জন্য সাকো বা ভেলা ব্যবহার করত। নদীপথের দস্যু বা চোরদের ভয়েও তারা তটস্থ থাকত, যা তৎকালীন সময়ের আইনশৃঙ্খলার অবনতি নির্দেশ করে।

         পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে , চর্যাপদ কোনো রাজকীয় ইতিহাস নয়, বরং এটি বাংলার জল-কাদার মানুষের জীবনগাথা। ড. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ঠিকই বলেছিলেন যে, এই পদগুলোর মধ্যে দিয়ে বৌদ্ধধর্মের গুহ্য কথা ব্যক্ত হলেও, এর পটভূমি লৌকিক ও প্রাকৃত। সমকালীন ব্রাত্য সমাজের লাঞ্ছনা, দারিদ্র্য ও অপরাজেয় জীবনবোধের এমন স্বচ্ছ প্রতিফলন আদি বাংলা সাহিত্যের অন্য কোথাও মেলা ভার। তাই সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে চর্যাপদ আদি বাংলার ব্রাত্য মানুষের এক বিশ্বস্ত প্রতিচ্ছবি ।

 অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KABITA SUNDARBON YouTube channel SAMARESH sir.


Comments

Popular posts from this blog

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর।

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মাইনর সিলেবাস)  ১)চার্বাক মতে ভূত কয়টি ও কি কি? উত্তরঃচার্বাক মতে ভূত চারটি- ক্ষিতি, অপ্ , তেজ ও মরুৎ ২) স্বভাববাদ কী? উত্তরঃ চার্বাক জড়বাদের ভিত্তি হল স্বভাববাদ। যে মতবাদ অনুসারে স্বভাব থেকেই ভূত সৃষ্টি, আবার স্বভাব থেকেই বিচ্ছেদ। যার জন্য ঈশ্বরকে স্বীকার করা প্রয়োজন নেই। ৩) অব্যাপ্যদেশ কথাটির অর্থ লেখো। উত্তরঃ অব্যাপ্যদেশ বলতে বোঝায়- অশাব্দ অর্থাৎ যাকে শব্দের দ্বারা প্রকাশ করা যায় না। ৫) জ্ঞান লক্ষণ প্রত্যক্ষ কাকে বলে?  কোন একটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তার নিজের বিষয়ীভূত গুণ ছাড়াও যদি অপর একটি ইন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূত গুণকে প্রত্যক্ষ করার হয়, তাহলে সেই প্রত্যক্ষকে জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ বলা হয়। ৬) ন্যায় মতে প্রমাণের প্রকার  উত্তরঃ ন্যায় মতে প্রমাণ চার প্রকার। প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান এবং শাব্দ। ৭) সন্নিকর্ষ কাকে বলে? উত্তরঃ ন্যায় মতে ইন্দ্রিয় ও কোন বাস্তব পদার্থের মধ্যে একপ্রকার বিশেষ সম্পর্ক ঘটলে তবেই আমাদের একটি বস্তুর প্রত্যক্ষজ্ঞান ।আর ঐ বিশেষ বিশেষ সম্পর্কের পারিভাষিক নাম হলো সন...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...

ব্রিটিশ(3rd.Sem) পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর সিলেবাস)।         আমরা জানি যে,ব্রিটেনের সংবিধান অলিখিত বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি, পার্লামেন্ট প্রণীত আইন প্রভৃতির মাধ্যমে পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট আইনানুগ সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব নয়। আর সেখানে ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে আইনানুগ সার্বভৌমত্ব বলা হয়, কারণ-       যেকোনো বিষয়ে পার্লামেন্ট আইন প্রণনয়নের অধিকারী। তবে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হওয়ায় পার্লামেন্টে কোন আইন প্রণয়নের সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না। আসলে সেখানে কমন্সসভা তথা নিম্নকক্ষের সার্বভৌমত্বকেই বলা হয় পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব।     ••ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে সার্বভৌমত্ব বলার কারণ- ১) পার্লামেন্টের ওপর আইনগত কোনরূপ বাধানিষেধ আরোপ করা যায় না। ২) পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের বৈধতার ব্যাপারে আদালত কোন প্রশ্ন তুলতে পারেনা। ব্রিটেনের আদালত পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের ওপর বিচার বি...