আন্তর্জাতিক ধ্বনিমূলক বর্ণমালা (IPA): সংজ্ঞা, উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তা আলোচনা কর পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার, বাংলা মেজর।
আমরা জানি যে,বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার ধ্বনিসমূহকে একটি সুনির্দিষ্ট ও একক লিপির মাধ্যমে প্রকাশ করার জন্য যে আন্তর্জাতিক বর্ণমালা ব্যবহৃত হয়, তাকেই আন্তর্জাতিক ধ্বনিমূলক বর্ণমালা বা International Phonetic Alphabet (IPA) বলা হয়। ১৮৮৬ সালে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে 'International Phonetic Association' নামক একটি সংস্থা এটি প্রবর্তন করে। আরোও সহজ করে বলতে গেলে বলতে হয়--
বানান যাই হোক না কেন, পৃথিবীর যেকোনো ভাষার সঠিক উচ্চারণ যাতে একটি নির্দিষ্ট চিহ্নের মাধ্যমে যে কেউ বুঝতে পারে, সেই লক্ষ্যেই IPA তৈরি হয়েছে। যেমন: ইংরেজি 'Cat' এবং 'Character'—উভয় শব্দে 'C' থাকলেও এদের উচ্চারণ আলাদা। IPA-তে এদের সঠিক ধ্বনিগত রূপ যথাক্রমে [kæt] এবং [kærəktə] হিসেবে লেখা হয়।
•আন্তর্জাতিক ধ্বনিমূলক বর্ণমালা (IPA)প্রবর্তনের উদ্দেশ্য
আমরা জানি যে,IPA সৃষ্টির পেছনে প্রধানত তিনটি উদ্দেশ্য কাজ করেছে। আর সেই তিনটি উদ্দেশ্য হলো যথাক্রমে-
১)এক ধ্বনি-এক লিপি প্রবর্তন।বিশ্বের সব ভাষার জন্য এমন একটি বর্ণমালা তৈরি করা, যেখানে প্রতিটি নির্দিষ্ট ধ্বনির জন্য কেবল একটিই নির্দিষ্ট চিহ্ন থাকবে।
২) উচ্চারণগত সমতা।বানান-বিভ্রাট দূর করে শব্দের প্রকৃত উচ্চারণকে দৃশ্যমান করা।
৩) সর্বজনীনতা। ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ করে বিদেশী ভাষা শেখার সময় যাতে উচ্চারণ নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি না থাকে, তার একটি বিশ্বজনীন মানদণ্ড তৈরি করা।
•আন্তর্জাতিক ধ্বনিমূলক বর্ণমালা (IPA)-র প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব
বাংলা ভাষাবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক ভাষা চর্চায় IPA-এর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।এর প্রধান দিকগুলো নিম্নে তথ্যাকারে আলোচনা করা হলো-
(ক) বানান ও উচ্চারণের বৈষম্য দূর করা।বাংলা বা ইংরেজি-অনেক ভাষাতেই বানান ও উচ্চারণ এক হয় না। বাংলায় 'অ' ধ্বনিটি কখনও সংবৃত (যেমন: অতি [oti]) আবার কখনও বিবৃত (যেমন: অমল [ɔmol]) হয়। সাধারণ বর্ণমালায় এই পার্থক্য বোঝা যায় না, কিন্তু IPA-তে নির্দিষ্ট প্রতীকের সাহায্যে এই পার্থক্য স্পষ্ট করা সম্ভব।
(খ) ধ্বনিবিজ্ঞানের বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা।ভাষাবিজ্ঞানে ধ্বনির বর্গীকরণ (যেমন: কণ্ঠ্য, তালব্য, দন্ত্য ইত্যাদি) এবং উচ্চারণের স্থান ও প্রকৃতি বিশ্লেষণের জন্য IPA অপরিহার্য। এটি শব্দের অতি-ক্ষুদ্র ধ্বনিগত পার্থক্যকেও নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করতে পারে।
(গ) বিদেশী ভাষা শিক্ষা ও অভিধান প্রণয়ন।কোনো অজানা ভাষার সঠিক উচ্চারণ শেখার জন্য IPA হলো শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। আধুনিক উন্নত মানের অভিধানগুলোতে শব্দের পাশে IPA চিহ্ন দেওয়া থাকে যাতে পাঠক সহজেই বুঝতে পারেন শব্দটি কীভাবে উচ্চারিত হবে।
(ঘ) উপভাষা ও আঞ্চলিকতার গবেষণা।বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের উপভাষা (যেমন: রাঢ়ী, বঙ্গালী, কামরূপী) বিশ্লেষণের সময় ধ্বনিগত পরিবর্তনগুলো (যেমন: 'অপিনিহিতি' বা 'অভিশ্রুতি') নিখুঁতভাবে তুলে ধরার জন্য IPA চিহ্ন ব্যবহার করা হয়।
(ঙ) কম্পিউটার ও প্রযুক্তিগত ব্যবহার।বর্তমানে 'স্পিচ টু টেক্সট' (Speech-to-Text) বা ভয়েস রিকগনিশন সফটওয়্যার তৈরিতে কম্পিউটারের বোধগম্য ধ্বনি-লিপি হিসেবে IPA ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ধনীমূলক বর্ণমালার (IPA)-এর প্রধান কিছু চিহ্ন ও বৈশিষ্ট্য।
IPA-তে স্বরধ্বনি, ব্যঞ্জনধ্বনি এবং কিছু বিশেষ চিহ্ন (Diacritics) ব্যবহৃত হয়। আর সেই চিহ্ন গুলি হলো-
•অনুনাসিকতা।শব্দের ওপর টিল্ড (\sim) চিহ্ন ব্যবহার করা হয় (যেমন: চাঁদ [t\tilde{a}d])।
•দীর্ঘতা।কোলন (:) চিহ্ন দিয়ে ধ্বনির দীর্ঘতা বোঝানো হয়।
•বন্ধনীর ব্যবহার।IPA লিপ্যন্তর করার সময় সবসময় থার্ড ব্র্যাকেট [ ] ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক।
পরিশেষে বিশেষভাবে আমরা বলতে পারি যে, আন্তর্জাতিক ধ্বনিমূলক বর্ণমালা কেবল ভাষা শিক্ষার্থী বা শিক্ষকদের জন্য নয়, বরং আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের একটি অপরিহার্য অস্ত্র। এটি ভাষাকে বানানের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে তার প্রকৃত রূপ অর্থাৎ 'ধ্বনি'র মর্যাদা দান করেছে। বাংলা ভাষার ধ্বনিতাত্ত্বিক বিচারে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাকে উপস্থাপনের জন্য IPA-এর গুরুত্ব অপরিসীম।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KABITA SUNDARBON YouTube channel SAMARESH sir.
Comments
Post a Comment