অপসঙ্গতি Maladjustment)কাকে বলে? অপসংগতির কারণগুলি আলোচনা কর অপসংগতি দূরীকরণের উপায় গুলি কি কি? পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার এডুকেশন মাইনর।
•অপসঙ্গতির ধারণাঃ আমরা জানি যে,সঙ্গতিবিধান হলো একটি গতিশীল প্রক্রিয়া। যখন কোনো ব্যক্তি তার জৈবিক বা মনস্তাত্ত্বিক চাহিদার সাথে পরিবেশের প্রতিকূলতার সমন্বয় ঘটাতে পারে না, তখন তার মধ্যে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। মনোবিদ ল্যাজারাস (Lazarus)-এর মতে, যখন কোনো ব্যক্তি তার পরিবেশের সাথে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়, তখনই অপসঙ্গতির সৃষ্টি হয়। এর ফলে ব্যক্তির মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ, অতিরিক্ত উদ্বেগ, অহেতুক ভয় বা আক্রমণাত্মক মনোভাব দেখা দেয়।অ
•অপসঙ্গতির কারণসমূহ (Causes of Maladjustment)•
আমরা জানি যে,অপসঙ্গতির কারণগুলি বহুমুখী।তাই একে প্রধানত চারটি স্তম্ভে ভাগ করে আলোচনা করা যেতে পারে। আর সেই ভাগগুলি হলো-
ক) জৈবিক ও শারীরিক কারণ (Biological Causes):
* বংশগতি: অনেক সময় বংশগতভাবে প্রাপ্ত স্নায়বিক দুর্বলতা বা মানসিক অস্থিরতা অপসঙ্গতির ভিত্তি তৈরি করে।
* শারীরিক গঠন ও ত্রুটি: দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা, পঙ্গুত্ব বা শারীরিক কদর্যতা শিক্ষার্থীর মনে হীনম্মন্যতা (Inferiority Complex) তৈরি করে, যা তাকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
* গ্রন্থিগত প্রভাব: অন্তঃক্ষরা গ্রন্থির (Endocrine Glands) নিঃসরণে ভারসাম্যহীনতা দেখা দিলে মেজাজ খিটখিটে হওয়া বা অতি-উত্তেজনা দেখা দিতে পারে।
খ) মনস্তাত্ত্বিক কারণ (Psychological Causes):
* প্রেষণাভঙ্গ বা হতাশা (Frustration): শিক্ষার্থী যখন তার লক্ষ্য পূরণে বারবার ব্যর্থ হয়, তখন তার মধ্যে হতাশা জন্মে যা অপসঙ্গতির প্রধান কারণ।
* মানসিক দ্বন্দ্ব (Conflict): "পড়তে ইচ্ছে করছে না, আবার পরীক্ষায় ফেল করার ভয়"—এই ধরনের পরস্পরবিরোধী ইচ্ছার টানাপোড়েন মানসিক অস্থিরতা তৈরি করে।
* অনিরাপত্তা বোধ: ভালোবাসা বা স্বীকৃতির অভাব থেকে শিশুর মনে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়, যা তাকে অসামাজিক আচরণের দিকে ঠেলে দেয়।
গ) পারিবারিক কারণ (Home Environment):
* পিতামাতার অতি-সংরক্ষণশীলতা: সন্তানকে সবসময় আগলে রাখলে তার মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব ঘটে এবং সে বাইরের জগতের সাথে মানিয়ে নিতে পারে না।
* ভগ্ন পরিবার: বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ, মৃত্যু বা প্রতিনিয়ত ঝগড়া শিশুর মানসিক বিকাশে বিষক্রিয়ার মতো কাজ করে।
* প্রত্যাশার চাপ: মেধার বাইরে গিয়ে পিতামাতা যখন আকাশছোঁয়া প্রত্যাশা চাপিয়ে দেন, তখন সেই চাপে শিশু ভেঙে পড়ে।
ঘ) সামাজিক ও বিদ্যালয়ের কারণ (Social & School Factors):
* ত্রুটিপূর্ণ পাঠ্যক্রম: শিক্ষার্থীর রুচি ও সামর্থ্যের বাইরে একঘেয়ে পাঠ্যক্রম তাকে বিদ্যালয়বিমুখ করে তোলে।
* সহপাঠীদের উৎপীড়ন (Bullying): সহপাঠীদের দ্বারা উপহাস বা অবহেলার শিকার হলে শিক্ষার্থী হীনম্মন্যতায় ভোগে।
* ত্রুটিপূর্ণ পরীক্ষা ব্যবস্থা: কেবল নম্বরের ভিত্তিতে বিচার করার প্রথা দুর্বল শিক্ষার্থীদের মধ্যে হীনম্মন্যতা তৈরি করে।
৩. অপসঙ্গতি দূরীকরণে শিক্ষকের বিস্তারিত ভূমিকা (Role of the Teacher)
শিক্ষক কেবল পাঠদান করবেন না, তিনি একজন 'মেন্টর' হিসেবে কাজ করবেন। তার ভূমিকাগুলি হলো:
১. ব্যক্তিগত বৈষম্য নীতি (Individual Differences): শিক্ষককে মনে রাখতে হবে প্রতিটি শিশু আলাদা। সবার থেকে একই ফল আশা না করে প্রত্যেকের ক্ষমতা অনুযায়ী কাজ দিতে হবে।
২. গণতান্ত্রিক পরিবেশ: শ্রেণিকক্ষে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী নির্ভয়ে তার মনের কথা বলতে পারে। শিক্ষকের আচরণ হবে বন্ধুর মতো, শাসকের মতো নয়।
৩. আগ্রহ ও সামর্থ্য অনুযায়ী নির্দেশনা: যে শিক্ষার্থী পড়াশোনায় দুর্বল কিন্তু খেলাধুলা বা আঁকায় ভালো, তাকে সেই দিকে উৎসাহ দিয়ে তার আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে।
৪. সুপ্ত আবেগ মোক্ষণ (Catharsis): নাটক, বিতর্ক বা সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর মনের জমে থাকা রাগ বা দুঃখ প্রকাশের সুযোগ করে দিতে হবে।
৫. অভিভাবক-শিক্ষক সমন্বয় (PTM): শিক্ষার্থীর সমস্যা বুঝতে নিয়মিত অভিভাবকদের সাথে আলোচনা করতে হবে এবং গৃহ-পরিবেশের উন্নয়ন ঘটাতে পরামর্শ দিতে হবে।
৬. আদর্শ আচরণ প্রদর্শন: শিক্ষক নিজে যদি সুসংগতিপূর্ণ হন, তবে শিক্ষার্থীরা তাকে অনুকরণ করে সঠিক আচরণ শিখবে।
উপসংহার:
অপসঙ্গতি কোনো অপরাধ নয়, বরং এটি একটি মানসিক অবস্থা যা সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে পরিবর্তন করা সম্ভব। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় 'Child-Centric Education'-এর মূল লক্ষ্যই হলো শিশুর মানসিক বাধাগুলি দূর করে তাকে সুস্থ সামাজিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।
পরীক্ষার টিপস: উত্তরটি লেখার সময় উপরে দেওয়া বিভাগগুলো (জৈবিক, মনস্তাত্ত্বিক ইত্যাদি) আলাদা সাব-হেডিং দিয়ে লিখলে এবং গুরুত্বপুর্ণ শব্দগুলো বোল্ড বা আন্ডারলাইন করলে ১০-এ ভালো নম্বর পাওয়া যাবে।
Comments
Post a Comment