Skip to main content

বাল্মীকি রামায়ণ কীভাবে কৃত্তিবাসের হাত ধরে বাংলার লোক জীবনের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে উঠেছে আলোচনা করো।

বাল্মীকি রামায়ণ কীভাবে কৃত্তিবাসের হাত ধরে বাংলার লোক জীবনের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে উঠেছে আলোচনা করো।(কৃত্তিবাসী রামায়ণ বাংলার লোকজীবনের মহাকাব্য) পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মেজার।

         আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,বাল্মীকি রামায়ণ সংস্কৃত সাহিত্যের এক অনন্য কীর্তি। কিন্তু বাঙালির হৃদয়ে রাম-সীতার কাহিনী যতটা না সংস্কৃত শ্লোকে বিধৃত, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি জীবন্ত কৃত্তিবাস ওঝার 'শ্রীরামপাঁচালী'বা 'কৃত্তিবাসী রামায়ণ'-এর মাধ্যমে। পঞ্চদশ শতকের এই কবি বাল্মীকির মূল কাঠামোকে অক্ষুণ্ণ রেখেও তাতে এমন এক সুনিপুণ রদবদল ঘটিয়েছেন, যার ফলে রামকথা বাঙালির ঘরের কথা হয়ে উঠেছে। আর সেই বাঙালি ঘরে আমরা দেখতে পাই-

         •প্রেক্ষাপট ও জনমুখী চরিত্র চিত্রণে অনবদ্য শিল্পসম্মত পূরণ কাহিনী রামায়ণ।বাল্মীকির রাম ছিলেন 'ধীরোদাত্ত' গুণসম্পন্ন এক মহিমান্বিত ক্ষত্রিয় বীর। অন্যদিকে, কৃত্তিবাস তাঁর রামকে সাজিয়েছেন বাঙালির প্রিয় আদর্শ পুরুষ হিসেবে। বাল্মীকির রাম যেখানে বীরত্বের পরাকাষ্ঠা, কৃত্তিবাসের রাম সেখানে করুণ রসের আধার। বাঙালির কোমল আবেগ, ভক্তি এবং পারিবারিক মূল্যবোধকে এই কাব্যে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। শুধুমাত্র তাই নয়-

       • বাঙালির গার্হস্থ্য জীবনের প্রতিফলন ঘটেছে রামায়ণ কাব্যে।কৃত্তিবাস রামায়ণকে অনুবাদ করেননি, বরং তাকে অভিযোজিত করেছেন। অযোধ্যার রাজপ্রাসাদ কৃত্তিবাসের কলমে হয়ে উঠেছে মধ্যযুগের কোনো এক বাঙালি জমিদারের অন্দরমহল। বিবাহ, অন্নপ্রাসনিক আচার-অনুষ্ঠান,নারীর সাজসজ্জা এবং বাঙালির খাদ্যাভ্যাস এই কাব্যে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। আর সেই চিত্রে আমরা দেখতে পাই-

  কৌশল্যার পুত্রবাৎসল্য বা সীতার বিরহ-সবই সাধারণ বাঙালি মায়ের বা স্ত্রীর দুঃখের প্রতিচ্ছবি।

      আসলে রামের বনবাসে যাওয়ার দৃশ্যে বাঙালির চিরকালীন বিদায়বেলার করুণ সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে। যে সুর বাঙালির সামাজিক জীবনে ভীষণ মর্ম বিদারক।তবুও এই সকল মর্ম বিদারক সুর প্রতিধ্বনিত হওয়ার পরও রামন কাপে আমরা দেখতে পাই- 

      ভক্তিবাদের প্রভাব ও চরিত্রায়নের অনবদ্য পুরান কাহিনী রামায়ণ মহাকাব্য।কৃত্তিবাসী রামায়ণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বীরত্বের ওপর ভক্তির জয়গান। বাল্মীকির রাবণ ছিলেন এক উদ্ধত রাক্ষসরাজ, কিন্তু কৃত্তিবাসের রাবণ মনের অন্তরালে একজন পরম রামভক্ত। যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুকালে রাবণ যখন রামের স্তব করেন, তখন তা শুদ্ধ ভক্তিধর্মের নিদর্শন হয়ে ওঠে। একইভাবে হনুমানও এখানে কেবল এক বানর সেনাপতি নন, বরং তিনি বাঙালির পরম পূজনীয় সেবক ও ভক্তের প্রতীক। তাই আমরা অনুমানের কণ্ঠ শুনতে পাই-

"জগতের নাথ তুমি জগতের পিতা।

কে বুঝে তোমার মায়া অনাদির কর্তা।।"

      আসলে কৃত্তিবাস বীর হনুমানকে যে কোমল ও ভক্তিপূর্ণ রূপ দিয়েছেন, তা বাংলার লোকমানসে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছে। আর সেই কারণেই আমরা পাই-

        লোকজীবন ও দৈনন্দিন অনুষঙ্গ রামায়ণ মহাকাব্যে।কৃত্তিবাস তাঁর কাব্যে এমন কিছু ঘটনার অবতারণা করেছেন যা মূল বাল্মীকি রামায়ণে নেই, কিন্তু বাংলার লোকসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। যেমন-দেবী দুর্গার অকালবোধন ও ১০৮টি নীলপদ্মের কাহিনী বাঙালির নিজস্ব উদ্ভাবন।আসলে এটি রামকথার সঙ্গে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজাকে সম্পৃক্ত করে দিয়েছে। তবে এর পাশাপাশি আমরা আরও দেখতে পাই যে-তরণীসেনের যুদ্ধ। বিভীষণপুত্র তরণীসেনের রামভক্তি এবং গায়ে 'রাম' নাম লিখে যুদ্ধে যাওয়া খাঁটি বাঙালি বৈষ্ণব চেতনার প্রকাশ।

### ৫. ভাষার সরলতা ও কাব্যগুণ

কৃত্তিবাসের ভাষা ছিল অত্যন্ত সরল, যা সহজেই নিরক্ষর বা স্বল্পশিক্ষিত মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। তিনি সংস্কৃতের গাম্ভীর্য বর্জন করে লৌকিক উপমা ও শব্দ ব্যবহার করেছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়:

> "যম বলে আমি যম মারিব কামার।

> কামার বলে আমি কেনে দিব জোয়াল ঘাড়।।"

এমন ঘরোয়া বাচনভঙ্গি কাব্যটিকে সাধারণের সম্পত্তিতে পরিণত করেছিল।

### উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, কৃত্তিবাস ওঝা কেবল বাল্মীকির অনুবাদক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সার্থক রূপকার। তাঁর রামায়ণে রামচন্দ্র কেবল বিষ্ণুর অবতার নন, তিনি বাঙালির আদর্শ জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, অনুগত পুত্র এবং বিরহী স্বামী। দিনেশচন্দ্র সেনের ভাষায়, কৃত্তিবাসী রামায়ণ হলো **"বাঙালির প্রাণের বই"**। মহাকাব্যের দেবায়িত মহিমা থেকে রামকথাকে নামিয়ে এনে বাঙালির দাওয়ায় বসানোর কৃতিত্বই কৃত্তিবাসকে বাংলার জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়েছে। আজও গ্রামীণ বাংলার সন্ধ্যাবেলায় রামায়ণের সুর বাংলার সংস্কৃতি ও লোকজীবনের স্পন্দন হিসেবে অনুভূত হয়।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল                •আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,বিহারীলাল চক্রবর্তী রচিত ' সারদা মঙ্গল' কাব্যকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক গীতিকাব্য হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে উনিশ শতকে যখন বাংলা সাহিত্য মহাকাব্য ও আখ্যায়িকা কাব্যের ধারা থেকে সরে নতুন দিকে মোড় নিচ্ছিল, ঠিক সেই সময়ে 'সারদা মঙ্গল' কাব্যটি গীতিকাব্যের আঙিনায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। আর সে কারণেই হয়তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই কাব্যকে ' ভোরের পাখি ' বলে অভিহিত করেছিলেন। যেখানে সারদা মঙ্গল গীতিকাব্যটি বাংলা সাহিত্যের এই নতুন ধারার শুভ সূচনা করেছিল। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা সারদা মঙ্গল কে গীতিকাব্য বলছি তার কারন-              • গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্যের নিরখে 'সারদা মঙ্গল' কাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির কাব্য। যে কাব্যটিতে কোনো নির্দিষ্ট গল্প বা কাহিনি নেই। তবে সেখানে আছে-কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী নিজে দেবী সারদার (জ্ঞান ও বিদ্যার দেবী) প্রতি তাঁর ভক্তি ও ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন। যে উক্তি ও ভালোবাসা ...

ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা অনার্স (DSE3/4) সাজেশন ২০২৫

       West Bengal State University                                       BA Honours, 6th Semester                                         SUGGESTION 2025                                                      BNGA,DSE05T( DSE3/4)  • বাংলা কথাসাহিত্যঃ মন্বন্তর, দাঙ্গা ও দেশভাগ• একক-১(২০২১) ক) দেশভাগের ইতিহাসের বাস্তব রূপ বাংলা সাহিত্যে  কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে কয়েকটি উপন্যাস অনুসরণে তার পরিচয় দাও। • ১৯৪৬ দাঙ্গা রাজনীতির ট্রাজেডি বাংলা ছোটগল্পের পরিসরে কিভাবে এসেছে, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি রচনা অবলম্বনে আলোচনা করো। (২০২২) পঞ্চাশের মন্বন্তরের বাস্তব বর্ণনা করে বাংলা উপন্যাসে তার কতটা প্রতিফলন ঘটেছে, সে বিষয়ে আলোকপাত করো। •দেশভাগের ক...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...