Skip to main content

পথের দাবী' গল্পের মূলভাববস্তু ও বিশ্লেষণ।

 শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর 'পথের দাবী' গল্পের মূলভাববস্তু ও বিশ্লেষণ।পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ, দশম শ্রেণী দ্বিতীয় সেমিস্টার।

         শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস 'পথের দাবী'-র নির্বাচিত অংশটি মূলত উত্তাল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত।আর সেখানে রাজনৈতিক উপন্যাস 'পথের দাবী'-র পাঠ্য অংশটিতে পরাধীন ভারতের সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের এক রোমাঞ্চকর খণ্ডচিত্র ধরা পড়েছে।সেই খন্ডচিত্রে আমরা দেখি-

    • বিপ্লবীর ছদ্মবেশ ও অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা সব্যসাচী।গল্পের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো সব্যসাচীর ছদ্মবেশ। ব্রিটিশ পুলিশের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য এক দুর্ধর্ষ বিপ্লবী কীভাবে নিজেকে সাধারণ, রুগ্ন ও অদ্ভুতদর্শন একজন মানুষে পরিণত করতে পারেন, তা এখানে দেখানো হয়েছে।যেখানে  গিরিশ মহাপাত্রের সাজপোশাক ও আচরণ দেখে পুলিশের সন্দেহের অবকাশ থাকলেও শেষ পর্যন্ত তারা বিভ্রান্ত হয়। লেখকের কথায় -

"গিরিশ মহাপাত্রের বেশভূষার সেই অদ্ভুত বাহার স্মরণ করিয়া অপূর্ব কোনোমতেই হাসি চাপিয়া রাখিতে পারিল না।"

       •পুলিশের ব্যর্থতা ও বিপ্লবীর জয় ঘোষণা।নিপুণ গোয়েন্দাগিরি সত্ত্বেও ব্রিটিশ পুলিশ যে বিপ্লবীদের নাগাল পেত না, তা এই গল্পে স্পষ্ট। নিমাইবাবু ও জগদীশবাবু অনেক চেষ্টা করেও আসল সব্যসাচীকে চিনতে পারেননি। গিরিশ মহাপাত্রের আপাত রুগ্ন শরীর দেখে পুলিশ তাঁকে অবহেলা করেছিল।তবে নিমাইবাবু তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন-

"বাবুটির স্বাস্থ্য গেছে, কিন্তু শখ ষোলো আনাই বজায় আছে।"

   আসলে এই রুগ্ন শরীরের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ত্রাস সব্যসাচী। শুধু তাই নয়-

     দেশপ্রেম ও অপরাজেয় মানসিকতার অধিকারী, সব্যসাচী।সব্যসাচী বা 'ডাক্তার' কোনো সাধারণ অপরাধী নন; তিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রাখা এক বীর। তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং দেশের প্রতি টানই এই গল্পের মূল চালিকাশক্তি। তাঁর উপস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যেও (যেমন অপূর্ব) এক ধরনের দেশাত্মবোধ জাগ্রত হয়।আর সেখানে গল্পের এক পর্যায়ে সব্যসাচীর বীরত্ব ও আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অপূর্ব বলে—

"যাঁকে তুমি ধরবার জন্য দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছ, তিনি তো দেশেরই লোক। দেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি প্রাণ উৎসর্গ করেছেন।"

 মানবিকতা ও জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ অপূর্ব।অপূর্বর চরিত্রের মধ্য দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন যে, সাধারণ শিক্ষিত বাঙালি যুবকদের মনেও বিপ্লবীদের প্রতি এক গভীর মমতা ও সহানুভূতি ছিল। ইংরেজদের অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে অপূর্ব মনে মনে ক্ষুব্ধ ছিল।পুলিশের কঠোর শাসনের বিরুদ্ধে অপূর্ব নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে জানায়—

"তাঁকে আমি ভক্তি করি, শ্রদ্ধা করি-তাঁকে আমি আমার মাথার মণি করে রাখি।"

        পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, 'পথের দাবী' গল্পের মূল সুরটি হলো দেশপ্রেম।এখানে যেমন একদিকে ব্রিটিশ পুলিশের নির্মমতা ও ভারতীয়দের হেনস্তার ছবি আছে, অন্যদিকে তেমনই রয়েছে ভারতমাতার বীর সন্তানদের অকুতোভয় লড়াইয়ের কাহিনী।আর লেখক প্রমাণ করেছেন যে, বিপ্লবীদের ধরাশায়ী করা কেবল অস্ত্র দিয়ে সম্ভব নয়, কারণ তাঁদের মূল শক্তি হলো তাঁদের তীক্ষ্ণ মেধা ও দেশের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।



Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা অনার্স (DSE3/4) সাজেশন ২০২৫

       West Bengal State University                                       BA Honours, 6th Semester                                         SUGGESTION 2025                                                      BNGA,DSE05T( DSE3/4)  • বাংলা কথাসাহিত্যঃ মন্বন্তর, দাঙ্গা ও দেশভাগ• একক-১(২০২১) ক) দেশভাগের ইতিহাসের বাস্তব রূপ বাংলা সাহিত্যে  কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে কয়েকটি উপন্যাস অনুসরণে তার পরিচয় দাও। • ১৯৪৬ দাঙ্গা রাজনীতির ট্রাজেডি বাংলা ছোটগল্পের পরিসরে কিভাবে এসেছে, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি রচনা অবলম্বনে আলোচনা করো। (২০২২) পঞ্চাশের মন্বন্তরের বাস্তব বর্ণনা করে বাংলা উপন্যাসে তার কতটা প্রতিফলন ঘটেছে, সে বিষয়ে আলোকপাত করো। •দেশভাগের ক...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...