১) সভা-সমিতির যুগে 'বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা'-কে প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বলা হয় কেন? (মান - ৫) পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ দশম শ্রেণীর দ্বিতীয় সেমিস্টার।
আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে রাজা রামমোহন রায়ের অনুগামীরা (টাকির জমিদার কালীনাথ রায় চৌধুরী, প্রসন্নকুমার ঠাকুর প্রমুখ) কলকাতায় 'বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা' স্থাপন করেন। ড. যোগেশচন্দ্র বাগল এই সভাকে 'প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান' হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর কারণগুলি হলো-
•রাজনৈতিক আলোচনাঃ এটিই প্রথম সংগঠন যেখানে কেবল ধর্ম বা সমাজ নয়, বরং সরকারের বিভিন্ন নীতি ও প্রশাসনিক বিষয় নিয়ে নিয়মতান্ত্রিক আলোচনা শুরু হয়।
•করমুক্ত ভূমির উপর কর আরোপের প্রতিবাদঃ ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দের 'বাজেয়াপ্তি আইন' অনুযায়ী সরকার যখন নিষ্কর জমির ওপর কর আরোপ করে, তখন এই সভা তার তীব্র বিরোধিতা করে আন্দোলন গড়ে তোলে। এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদক্ষেপ।
•শাসনব্যবস্থার সমালোচনাঃ সভার সদস্যগণ ব্রিটিশ প্রশাসনের ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং ভারতীয়দের অভাব-অভিযোগ নিয়ে আলোচনা করতেন এবং তা জনসমক্ষে তুলে ধরার চেষ্টা করতেন।
•ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনঃনির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভারতীয়দের সংগঠিত করার প্রথম প্রয়াস ছিল এই সভা। সরকারের জনস্বার্থ বিরোধী কাজের প্রতিবাদ জানানোই ছিল এর মূল লক্ষ্য।
যদিও এই সভার ব্যাপ্তি খুব বেশি ছিল না, তবুও ভারতীয়দের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির কারিগর হিসেবে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম।
২) আনন্দমঠ উপন্যাসটি কীভাবে জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগিয়ে তুলেছিল? (মান - ৫)
আমরা জানি যে,বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'আনন্দমঠ' (১৮৮২) উপন্যাসটিকে 'ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বাইবেল' বলা হয়। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। আর সেখানে আমরা দেখতে পাই-
•দেশমাতৃকার কল্পনাঃ বঙ্কিমচন্দ্র এই উপন্যাসে দেশমাতৃকাকে জগদ্ধাত্রী, কালী ও দুর্গা—এই তিন রূপে কল্পনা করেছেন। তিনি দেশপ্রেমকে একটি পবিত্র ধর্মে পরিণত করেন, যা সাধারণ মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলে।
•'বন্দেমাতরম' মন্ত্রঃ উপন্যাসে অন্তর্ভুক্ত 'বন্দে মাতরম' গানটি ভারতীয় বিপ্লবীদের কাছে মহামন্ত্রে পরিণত হয়। এটি ভারতবাসীর মনে সাহস ও ঐক্যের সঞ্চার করে।
•সন্ন্যাসীদের আত্মত্যাগঃউপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র 'সন্তান দল' এবং তাদের দেশমাতৃকার চরণে সর্বস্ব ত্যাগের আদর্শ তৎকালীন যুবসমাজকে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
•পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্তিঃ আনন্দমঠের মূল কাহিনী ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে রচিত হলেও, এর প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত ছিল ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারতের মুক্তি।
অরবিন্দ ঘোষের মতে-বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন আধুনিক ভারতের জাতীয়তাবাদের ঋষি।আর সেই ঋষির আনন্দমঠ পাঠ করে বহু তরুণ দেশের জন্য হাসিমুখে প্রাণ দিতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।
৩)গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যঙ্গচিত্রের মূল বিষয়বস্তু কী ছিল? (মান - ৫)
ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার ইতিহাসে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ব্যঙ্গচিত্র বা কার্টুনের মাধ্যমে তৎকালীন সমাজের অন্ধকার দিকগুলি নিপুণভাবে তুলে ধরেছিলেন। তার ব্যঙ্গচিত্রের মূল বিষয়বস্তুগুলি হলো-
•ঔপনিবেশিক শাসনের সমালোচনাঃব্রিটিশ সরকারের একদেশদর্শী নীতি, দমনমূলক আইন এবং আমলাতন্ত্রের যথেচ্ছাচারকে তিনি তুলির আঁচড়ে তীব্র আক্রমণ করতেন।
•বাবু সংস্কৃতির বিদ্রূপঃ উনিশ শতকের উচ্চবিত্ত বাঙালি সমাজের এক শ্রেণির মানুষ যারা অন্ধভাবে পাশ্চাত্য আদব-কায়দা অনুসরণ করত (যাদের 'সাহেব-ঘেঁষা বাঙালি' বলা হতো), গগনেন্দ্রনাথ তাদের কঠোরভাবে বিদ্রূপ করেন।
•সামাজিক কুসংস্কার ও ভণ্ডামিঃহিন্দু সমাজের জাতিভেদ প্রথা, অস্পৃশ্যতা এবং তথাকথিত ধর্মগুরুদের ভণ্ডামি ছিল তার ব্যঙ্গচিত্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
•নারীর অবস্থান ও শিক্ষাঃতৎকালীন সমাজে নারীদের প্রতি বৈষম্য এবং নারী শিক্ষার নামে প্রহসনকেও তিনি তার চিত্রে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
•উল্লেখযোগ্য অ্যালবামঃতার এই ব্যঙ্গচিত্রগুলি মূলত 'বিরূপ বজ্র', 'অদ্ভুত লোক' এবং 'নহলোল্লাপ' নামক তিনটি চিত্রসংগ্রহে প্রকাশিত হয়েছিল।
সবশেষে আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি যে, গগনেন্দ্রনাথের ব্যঙ্গচিত্রগুলি ছিল প্রতিবাদের এক নতুন ভাষা। তিনি কেবল শিল্প সৃষ্টি করেননি, বরং ছবির মাধ্যমে সমাজ সংস্কার ও জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রচারের পথও প্রশস্ত করেছিলেন।
Comments
Post a Comment