সুবোধ ঘোষের বিখ্যাত ছোটগল্প 'বহুরূপী' মধ্যবিত্ত সমাজের বাস্তবতার আড়ালে এক শিল্পীর সততা ও নৈতিকতার গল্প।আর সেই গল্পে আমরা দেখি-
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হরিদা একজন অতি সাধারণ দরিদ্র মানুষ। অভাবের জীবন হলেও তিনি কোনো ধরাবাঁধা কাজে আবদ্ধ হতে চাননি। তিনি একজন জাত শিল্পী। বিভিন্ন সময় নানারকম অদ্ভুত সাজগোজ বা বহুরূপী সেজে পথে বের হওয়া এবং তা থেকে পাওয়া সামান্য বকশিশই ছিল তাঁর আয়ের উৎস।আসলে-
গল্পের মোড় ঘোরে যখন হরিদা এক জাঁদরেল সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশ ধারণ করে অবিনাশবাবুর বাড়িতে যান। তাঁর নিখুঁত অভিনয়ের মুগ্ধ হয়ে অবিনাশবাবু তাঁকে ১০০ টাকা (সেকালে যা অনেক বড় অঙ্ক) দিতে চান। কিন্তু হরিদা তা গ্রহণ করেন না। কারণ একজন খাঁটি সন্ন্যাসীর সাজে থেকে টাকা নেওয়াকে তিনি তাঁর শিল্পের অপমান বলে মনে করেছেন। পেটের ক্ষিধের চেয়েও তাঁর কাছে শিল্পের মর্যাদা অনেক বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১. হরিদার জীবনের পেশা কী ছিল?
• হরিদার পেশা ছিল 'বহুরূপী' সাজা। বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন সাজে লোকজনকে আনন্দ দিয়ে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন।
২. সন্ন্যাসী জগদীশবাবুর বাড়িতে কতদিন ছিলেন?
• সন্ন্যাসী জগদীশবাবুর বাড়িতে সাত দিন ছিলেন।
৩. হরিদা পুলিশ সেজে কোথায় দাঁড়িয়েছিলেন?
• হরিদা পুলিশ সেজে দয়ালবাবুর লিচু বাগানে দাঁড়িয়েছিলেন।
৪. 'বিরাগীর' ঝোলার ভেতর কী বই ছিল?
• বিরাগীর ঝোলার ভেতর শুধু একটি বই ছিল— গীতা।
৫. জগদীশবাবু সন্ন্যাসীকে বিদায় দেওয়ার সময় কত টাকা দিতে চেয়েছিলেন?
•জগদীশবাবু সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলো পাওয়ার আশায় কাঠের খড়মে সোনার বোল লাগিয়ে দিয়েছিলেন এবং বিদায়বেলায় ১০০ টাকার একটি নোট দিতে চেয়েছিলেন।
৬. "অদৃষ্ট কখনো হরিদার এই ভুল ক্ষমা করবে না"— ভুলটি কী ছিল?
•ভুলটি ছিল জগদীশবাবুর দেওয়া নগদ ১০০ টাকা গ্রহণ না করা। দারিদ্র্য দূর করার সুযোগ পেয়েও হরিদা শিল্পের খাতিরে তা ত্যাগ করেন।
৭. 'বহুরূপী' গল্পে হারিদার ঘরে ক'জন বন্ধুর আড্ডা বসত?
•চারজন বন্ধুর আড্ডা বসত।
৮. বাইজি সেজে হরিদা কত টাকা পেয়েছিলেন?
•বাইজি সেজে হরিদা মোট আট টাকা দশ আনা পেয়েছিলেন।
১. "হরিদার জীবনে সত্যিই একটা নাটকীয় বৈচিত্র্য আছে"— হরিদার জীবনের এই নাটকীয় বৈচিত্র্যের পরিচয় দাও।
উত্তরঃ সুবোধ ঘোষের **'বহুরূপী'** গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হরিদা ছিলেন অত্যন্ত গরিব, কিন্তু তাঁর জীবন ছিল বৈচিত্র্যময়। তাঁর জীবনের এই "নাটকীয় বৈচিত্র্য" মূলত ধরা পড়েছে তাঁর বহুরূপী সাজের মাধ্যমে। নিচে এর পরিচয় দেওয়া হলো:
### ১. একঘেয়েমির বদলে বৈচিত্র্য বেছে নেওয়া
হরিদা অভাবের সংসারে চাইলে কোনো অফিসের কাজ বা দোকানের কাজ করতে পারতেন। কিন্তু ধরাবাঁধা ছকে জীবন কাটানো তাঁর স্বভাব-বিরুদ্ধ ছিল। ঘড়ির কাঁটার নিয়মে জীবন অতিবাহিত করার চেয়ে অভাবী হলেও স্বাধীন থাকা এবং নিজের শিল্পকে প্রকাশ করাই ছিল তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য। এই বৈচিত্র্যই তাঁর জীবনের চরম সত্য।
### ২. বহুরূপী সাজের বিচিত্র রূপ
হরিদা মাঝে মাঝেই অদ্ভুত সব সাজে সেজে রাস্তায় বের হতেন এবং মানুষকে চমকে দিতেন। তাঁর কয়েকটি নাটকীয় সাজ হলো:
* **পাগল সাজ:** একদিন সকালবেলা হরিদা থুতু ঝরানো মুখ, উসকোখুসকো চুল আর গলায় টিনের কৌটোর মালা জড়িয়ে উন্মাদ সেজেছিলেন। লোকজনকে লক্ষ্য করে তিনি ইট ছুড়েছিলেন, যা ছিল অত্যন্ত নিখুঁত অভিনয়।
* **বাইজি সাজ:** একদিন সন্ধ্যায় তিনি পেশাদার বাইজি সেজেছিলেন। তাঁর পরনে ছিল তসবির রেশমি শাড়ি, কপালে টিপ, আর পায়ে ঘুঙুরের শব্দ। তাঁর এই রূপ এতই আকর্ষণীয় ছিল যে কেউ ধরতেই পারেনি তিনি আসলে হরিদা। সেদিন তিনি ৮ টাকা ১০ আনা বকশিশ পেয়েছিলেন।
* **পুলিশ সাজ:** দয়ালবাবুর লিচু বাগানে তিনি জাল পুলিশ সেজে চারজন ছাত্রকে ধরেছিলেন এবং মাস্টারমশাইয়ের কাছ থেকে আট আনা ঘুষও আদায় করেছিলেন।
### ৩. বিরাগী সাজ ও চরম নাটকীয়তা
হরিদার জীবনের শ্রেষ্ঠ নাটকীয় বৈচিত্র্য দেখা যায় **বিরাগী** বা সন্ন্যাসী সাজে। জগদীশবাবুর বাড়িতে তিনি যখন ধবধবে সাদা উত্তরীয় এবং গলায় ঝোলা নিয়ে হাজির হন, তখন তাঁর শান্ত ও গম্ভীর রূপ দেখে পরিচিত বন্ধুরা পর্যন্ত তাঁকে চিনতে পারেনি। তিনি এতটাই আধ্যাত্মিক অভিনয় করেছিলেন যে জাঁদরেল জগদীশবাবু তাঁর ভক্ত হয়ে পড়েন।
### ৪. শিল্পের প্রতি সততা
হরিদার জীবনের নাটকীয়তা কেবল সাজগোজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা ছিল তাঁর আদর্শের মধ্যেও। সন্ন্যাসী সেজে তিনি চাইলে জগদীশবাবুর দেওয়া নগদ **১০০ টাকা** গ্রহণ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তাঁর মতে, একজন খাঁটি বিরাগী হয়ে টাকা ছোঁয়া মানে নিজের শিল্পের সঙ্গে বেইমানি করা। এই নৈতিক অবস্থানই তাঁর সাধারণ জীবনকে এক অসাধারণ নাটকীয় উচ্চতা দান করেছে।
**উপসংহার:** হরিদার কাছে জীবন মানে কেবল খেয়ে-পরে বেঁচে থাকা নয়, বরং শিল্পের মাধ্যমে প্রতিদিন নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করা। দারিদ্র্যের মধ্যেও এই যে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন চরিত্র হয়ে ওঠা, এটাই তাঁর জীবনের সার্থক নাটকীয় বৈচিত্র্য।
২. "খুব চমৎকার পাগল সাজতে পেরেছে তো লোকটা"— পাগল সেজে হরিদা কী করেছিলেন? তাঁর সাজের বর্ণনা দাও।
উত্তরঃ সুবোধ ঘোষের **'বহুরূপী'** গল্পে হরিদার পাগল সাজার বর্ণনাটি অত্যন্ত জীবন্ত এবং বাস্তবসম্মত। গল্পে দেখা যায়, একদিন চকের বাসস্ট্যান্ডের কাছে হরিদা এক উন্মাদ পাগল সেজে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন।
### পাগলের সাজের বর্ণনা
হরিদার সেই সাজ ছিল নিখুঁত এবং ভয়াবহ। তাঁর সাজের বর্ণনা নিচে দেওয়া হলো:
* **চেহারা:** হরিদার মুখ দিয়ে লালা ঝরছিল এবং চোখ দুটো ছিল টকটকে লাল।
* **পোশাক ও সাজ:** তাঁর কোমরে একটা ছেঁড়া কম্বল জড়ানো ছিল এবং গলায় ছিল টিনের কৌটোর একটা মালা।
* **অন্যান্য:** তাঁর মাথায় ছিল উসকোখুসকো চুল আর সারা শরীরে লেগে ছিল ধুলোবালি।
### পাগল সেজে হরিদা যা করেছিলেন
পাগল সেজে হরিদা কেবল দাঁড়িয়ে ছিলেন না, তিনি তাঁর অভিনয়ের মাধ্যমে ত্রাস ও কৌতূহল সৃষ্টি করেছিলেন:
* **বাসযাত্রীদের আতঙ্ক:** তিনি বাসের যাত্রীদের দিকে তেরে যাচ্ছিলেন এবং মাঝে মাঝে বাসের গায়ে হেলান দিয়ে পড়ছিলেন।
* **অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি:** তিনি মুখ দিয়ে অদ্ভুত শব্দ করছিলেন এবং সমবেত দর্শকদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছিলেন।
* **ইট ছোঁড়া:** অভিনয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে তিনি একটি চটের থলি জড়িয়ে হাতে একটা ইট নিয়েছিলেন এবং মাঝে মাঝেই চিৎকার করে সেই ইট ছোঁড়ার ভয় দেখাচ্ছিলেন।
হরিদার এই পাগল সাজ এতটাই নিখুঁত ছিল যে, বাসের যাত্রীরা ভয় পেয়ে কেউ কেউ আতঙ্কে চিৎকার করে উঠেছিল, আবার কেউ তাঁকে দু-চারটে পয়সা ছুঁড়ে দিয়েছিল। এই ঘটনার মাধ্যমেই গল্পের কথক ও তাঁর বন্ধুরা বুঝতে পেরেছিলেন যে হরিদা একজন উঁচুদরের শিল্পী, যিনি অতি সামান্য সাজেও মানুষকে পুরোপুরি বিশ্বাস করাতে পারেন।
৩. "পরম সুখ কাকে বলে জানেন? সব সুখের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া"— বিরাগী ছদ্মবেশে হরিদার এই বক্তব্যের তাৎপর্য আলোচনা করো।
উত্তরঃ সুবোধ ঘোষের **'বহুরূপী'** গল্পে হরিদা যখন বিরাগী সেজে জগদীশবাবুর বাড়িতে গিয়েছিলেন, তখন তাঁর মুখে এই দার্শনিক উক্তিটি শোনা যায়। এই বক্তব্যের গভীর তাৎপর্য নিচে আলোচনা করা হলো:
### ১. নির্লিপ্তি ও বৈরাগ্যের প্রকাশ
সাধারণত মানুষ জাগতিক সুখ, ধন-সম্পদ এবং আরাম-আয়েশের পেছনে ছোটে। কিন্তু হরিদার মতে, এই সব কিছুর মধ্যেই একটা 'বন্ধন' বা মায়া লুকিয়ে আছে। প্রকৃত সুখ কোনো বস্তু বা অর্থের মধ্যে নেই; বরং সমস্ত পার্থিব আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে মনের শান্তি খুঁজে পাওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে 'পরম সুখ'। বিরাগী ছদ্মবেশে হরিদা এখানে ভারতীয় আধ্যাত্মিক দর্শনের সেই সত্যকেই তুলে ধরেছেন।
### ২. অভিনয়ের পূর্ণতা
হরিদা কেবল বিরাগীর পোশাক পরেননি, তিনি সেই চরিত্রের অন্তরে প্রবেশ করেছিলেন। একজন বিরাগী বা সন্ন্যাসী হলেন তিনি, যিনি সোনা আর মাটিকে সমান মনে করেন। জগদীশবাবু যখন তাঁকে ১০০ টাকা দিতে চাইলেন, তখন হরিদা তা অবলীলায় প্রত্যাখ্যান করেন। এই সংলাপটি কেবল মুখের কথা ছিল না, তাঁর আচরণের মাধ্যমেও তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে তিনি সত্যিই সব জাগতিক সুখের বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পেরেছেন (অন্তত সেই অভিনয়ের মুহূর্তটুকুর জন্য)।
### ৩. শিল্পের মর্যাদা রক্ষা
হরিদা ছিলেন একজন জাত শিল্পী। তিনি জানতেন, যদি তিনি বিরাগী সেজে টাকা গ্রহণ করেন, তবে তাঁর সাজটা আর 'বিরাগী' থাকে না, তা কেবল 'ভিক্ষুকে' পরিণত হয়। তাঁর শিল্পের আদর্শকে অটুট রাখার জন্যই তিনি ত্যাগের মহিমা প্রচার করেছেন। তাঁর কাছে নিজের শিল্পের মর্যাদা রক্ষা করাটাই ছিল বড় পাওয়া, যা কোনো অর্থের বিনিময়ে কেনা সম্ভব নয়।
### ৪. দারিদ্র্যের ওপর নৈতিক জয়
হরিদা ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত দরিদ্র। তাঁর উনুনে অনেক সময় ভাতের বদলে কেবল জল ফোটে। কিন্তু এই চরম অভাবের মধ্যেও তিনি যখন বলেন যে সব সুখের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়াই পরম সুখ, তখন তাঁর সেই দারিদ্র্য এক মহান চারিত্রিক উচ্চতায় পৌঁছে যায়। টাকার মোহ ত্যাগ করে তিনি প্রমাণ করেন যে মনের ঐশ্বর্য বাইরের দারিদ্র্যের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
**উপসংহার:**
পরিশেষে বলা যায়, হরিদার এই উক্তিটি গল্পের মূল সুরকে নিয়ন্ত্রণ করে। এটি একদিকে যেমন বিরাগী চরিত্রের গভীরতা বোঝায়, অন্যদিকে হরিদার মতো এক অতি সাধারণ মানুষের অসাধারণ শিল্পী-সত্তার পরিচয় দেয়। তাঁর কাছে 'পরম সুখ' হলো নিজের সততা এবং শিল্পের কাছে দায়বদ্ধ থাকা।
Comments
Post a Comment