Skip to main content

পরিবারের সংজ্ঞা দাও। আধুনিক সমাজে পরিবারের কার্যাবলি ও গুরুত্ব আলোচনা করো। পরিবারের ভবিষ্যৎ কি বিপন্ন?

পরিবারের সংজ্ঞা দাও। আধুনিক সমাজে পরিবারের কার্যাবলি ও গুরুত্ব আলোচনা করো। পরিবারের ভবিষ্যৎ কি বিপন্ন? (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার দর্শন ইউনিট ১)।

          আমরা জানি যে,পরিবার হলো সমাজের ক্ষুদ্রতম এবং মৌলিক একক। মানব সভ্যতার ইতিহাসে পরিবারই প্রথম প্রতিষ্ঠান যা মানুষের সামাজিকীকরণ এবং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। আর সেখানে-

​      সাধারণ অর্থে পরিবার হলো, বিবাহ, রক্তসম্পর্ক বা দত্তক গ্রহণের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এমন একটি ক্ষুদ্র সামাজিক গোষ্ঠীকে পরিবার বলে, যার সদস্যরা একই সাথে বসবাস করে এবং একে অপরের প্রতি নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করে।তবে সমাজ বিজ্ঞানী ম্যাকাইভার ও পেজ এর মতে-

  "পরিবার হলো এমন একটি গোষ্ঠী যা যৌন সম্পর্কের দ্বারা সুনির্দিষ্ট এবং যা সন্তান প্রসব ও লালনপালনের জন্য যথেষ্ট স্থায়ী।"

​       আবার সমাজবিজ্ঞানী অগবার্ন ও নিমকফ মনে করেন- "সন্তানসন্ততিসহ বা সন্তানসন্ততিহীন স্বামী-স্ত্রীর মোটামুটি স্থায়ী মেলামেশাকেই পরিবার বলে।"

আধুনিক সমাজে পরিবারের কার্যাবলি ও গুরুত্ব

           •সমাজবিজ্ঞানের ভাষায়, পরিবার হলো সমাজের আদিমতম এবং ক্ষুদ্রতম সামাজিক একক। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাকাইভার ও পেজ-এর মতে, পরিবার হলো এমন একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী যারা সন্তান প্রসব ও লালন-পালনের জন্য যথেষ্ট স্থায়ী এবং যৌন সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। আধুনিক শিল্পোন্নত ও উত্তর-আধুনিক সমাজে পরিবারের বাহ্যিক কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন এলেও এর মৌলিক কার্যাবলি ও অপরিহার্যতা বিন্দুমাত্র হ্রাস পায়নি।

•পরিবারের কার্যাবলি (Functions of Family)

আধুনিক সমাজে পরিবারের কার্যাবলিকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়- (ক) মৌলিক বা আবশ্যিক কাজ এবং (খ) অর্পিত বা গৌণ কাজ।

ক) মৌলিক কার্যাবলি

    • জৈবিক কাজ (Biological Function):সমাজস্বীকৃত উপায়ে যৌন সম্পর্কের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রজননের মাধ্যমে মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষা করা পরিবারের প্রধান কাজ।

   •সন্তান লালন-পালন (Procreation and Rearing): কেবল জন্ম দিলেই হয় না, একটি শিশুকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ করে তোলার দায়িত্ব পরিবারই পালন করে।

    •আবেগীয় কাজ (Emotional Function): আধুনিক যন্ত্রসভ্যতায় মানুষ যখন চরম একাকীত্ব ও হতাশায় ভোগে, তখন পরিবারই তাকে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, মমতা ও মানসিক নিরাপত্তা প্রদান করে। সমাজবিজ্ঞানী **অগবার্ন ও নিমকফ** একে পরিবারের অন্যতম প্রধান কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

খ) গৌণ বা রূপান্তরিত কার্যাবলি

       •সামাজিকীকরণ (Socialization):পরিবারকে বলা হয় 'সামাজিকীকরণের সূতিকাগার'। শিশু পরিবারের সদস্যদের অনুকরণ করে ভাষা, আচার-আচরণ ও সামাজিক আদর্শ শেখে।

     •অর্থনৈতিক কার্যাবলি (Economic Function): প্রাচীনকালে পরিবার উৎপাদনের কেন্দ্র হলেও আধুনিক পরিবার একটি 'ভোগের একক' (Unit of Consumption)। সদস্যদের আর্থিক নিরাপত্তা ও জীবনধারণের নূন্যতম চাহিদা পূরণ করা পরিবারের কাজ।

     •শিক্ষামূলক কাজ (Educational Function): প্রথাগত শিক্ষার দায়িত্ব বিদ্যালয়ের হলেও শিশুর চরিত্র গঠন, মূল্যবোধ এবং প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ পরিবারেই শুরু হয়।

আধুনিক সমাজে পরিবারের গুরুত্ব (Importance)

      আধুনিক জটিল আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে পরিবারের গুরুত্ব নিম্নলিখিত দিক থেকে বিচার করা যায়। আর সেই গুরুত্ব গুলি হলো-

      •মানসিক স্বাস্থ্যের রক্ষাকবচঃআধুনিক যুগে তীব্র প্রতিযোগিতার চাপে মানুষের মধ্যে মানসিক অবসাদ বাড়ছে। পরিবার এখানে 'নিরাপদ আশ্রয়' (Cradle of Security) হিসেবে কাজ করে, যা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান করতে পারে না।

      •মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির ধারকঃ সমাজ পরিবর্তনের সাথে সাথে অনেক কিছু বদলে গেলেও পারিবারিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বংশপরম্পরায় পরিবারই বহন করে নিয়ে চলে।

     •ব্যক্তিত্বের বিকাশ (Development of Personality) প্রতিটি মানুষের চারিত্রিক ভিত্তি ও স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠার পিছনে পরিবারের পরিবেশ ও সাহচর্য সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে।

      •সামাজিক নিয়ন্ত্রণ (Social Control): সমাজবিরোধী কাজ থেকে সদস্যদের বিরত রাখতে এবং আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পরিবার পরোক্ষভাবে শক্তিশালী আইনি ও নৈতিক চাপ সৃষ্টি করে।

পরিবারের ভবিষ্যৎ কি বিপন্ন? (Crisis of the Family)

       বর্তমানে একক পরিবারের বৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান বিবাহবিচ্ছেদ এবং 'লিভ-ইন' সম্পর্কের প্রসারের ফলে সমাজবিজ্ঞানীদের মধ্যে একটি বিতর্ক দানা বেঁধেছে।আর সেখানে আমরা দেখি-

•বিপন্ন হওয়ার পক্ষের যুক্তি

      •আধুনিক ব্যক্তিবাদ (Individualism) পারিবারিক সংহতিকে শিথিল করছে।

      •আগে পরিবার যে ভূমিকা পালন করত (যেমন- অসুস্থের সেবা বা শিশুশিক্ষা), তা এখন হাসপাতাল, ক্রেশ বা নার্সিং হোম দ্বারা প্রতিস্থাপিত হচ্ছে।

বিপন্ন না হওয়ার পক্ষের যুক্তি 

    •অধিকাংশ সমাজবিজ্ঞানী মনে করেন, পরিবার ধ্বংস হচ্ছে না বরং এটি একটি বিবর্তনের (Evolution)মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

    • মানুষ প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হলেও তার সহজাত ভালোবাসা ও সহমর্মিতার তৃষ্ণা মেটানোর জন্য পরিবারের কোনো বিকল্প নেই।

    • যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার হলেও আত্মীয়তার বন্ধন বা নেটওয়ার্ক আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যমে আজও অটুট।

        পরিশেষে বলা যায় যে, আধুনিক পরিবার তার প্রাচীন রূপ হারিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এর গুরুত্ব আজও অনস্বীকার্য। প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিবার নিজেকে নতুন পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিয়েছে। তাই বলা যায়, পরিবারের ভবিষ্যৎ বিপন্ন নয়, বরং এটি সমকালীন চাহিদার ভিত্তিতে পুনর্গঠিত হচ্ছে।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা,সাজেশন টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KABITA SUNDARBON YouTube channel SAMARESH sir.



Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা মাইনর প্রথম সেমিস্টার ইউনিট ৩।            আমরা জানি যে,অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক 'যুগসন্ধিকাল'। এই সময়ে মধ্যযুগীয় দেব-নির্ভরতা কাটিয়ে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে প্রথম নাগরিক ও মানবীয় চেতনার উন্মেষ ঘটে। এই ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফসল হলো 'টপ্পা গান'। মূলত পাঞ্জাবের উটচালকদের লোকগীতি থেকে উৎপন্ন এই ধারাটিকে বাংলা মার্গসংগীত বা উচ্চাঙ্গসংগীতের আঙিনায় জনপ্রিয় করে তোলেন রামনিধি গুপ্ত, যিনি বাঙালির কাছে আদর করে 'নিধুবাবু' নামে পরিচিত ছিলেন।     ১. টপ্পা গানের উৎপত্তি ও স্বরূপঃ  'টপ্পা' শব্দটির মূল উৎস হিন্দি 'তপনা' বা 'টপকা' শব্দ থেকে, যার অর্থ 'লাফ দেওয়া' বা 'সংক্ষিপ্ত'। রাধামোহন সেন তাঁর 'সঙ্গীততরঙ্গ' গ্রন্থে লিখেছেন- "পাঞ্জাব হইতে হইল টপ্পার জনম / দুই চরণের মধ্যে তাহার নিয়ম।"       আসলে জনশ্রুতি অনুযায়...