Skip to main content

গৃহদাহ উপন্যাসে অচলার প্রতি মহিমের উদাসীনতা বা নির্লিপ্ততা কি কাহিনীকে পরিণতির দিকে নিয়ে গেছে? আলোচনা করো।

গৃহদাহ উপন্যাসে অচলার প্রতি মহিমের উদাসীনতা বা নির্লিপ্ততা কি কাহিনীকে পরিণতির দিকে নিয়ে গেছে? আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মেজর।

        আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'গৃহদাহ' উপন্যাসে অচলার জীবনের ট্রাজেডির জন্য সুরেশের উগ্র কামনার চেয়েও অনেক সময় মহিমের উদাসীনতা বা নির্লিপ্ততাকে বেশি দায়ী করা হয়। মহিমের এই নিস্পৃহতা কাহিনীকে এক অনিবার্য পরিণতির দিকে নিয়ে গেছে। ঠিক এই পরিস্থিতিতে আমরা উপন্যাসে দেখতে পাই যে-

       মহিমের নির্লিপ্ততাই গৃহদাহের পরিণতি।'গৃহদাহ' উপন্যাসে মহিম এক অদ্ভুত চরিত্রের মানুষ। সে স্থিতধী, আদর্শবাদী এবং আত্মসংযমী। কিন্তু একজন রক্ত-মাংসের নারীর কাছে এই অতি-সংযম অনেক সময় 'উদাসীনতা' বা 'অবহেলা'র নামান্তর হয়ে দাঁড়ায়। অচলার মতো আবেগপ্রবণ নারী হৃদয়ের কাছে মহিমের এই নীরবতাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর সেই কারণেই-

      অচলার মনে মহিমকে নিয়ে মানসিক দূরত্বের সৃষ্টি হয়।আসলে মহিম অচলাকে ভালোবাসলেও তার বহিঃপ্রকাশ ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ। সে অচলাকে কোনোদিন শাসন করেনি বা অধিকার দিয়ে আগলে ধরেনি। অচলার অবচেতন মন অনেক সময় মহিমের কাছ থেকে একটু জোর বা শাসন চেয়েছিল, যা সে পায়নি। মহিমের এই নির্লিপ্ততা অচলার মনে এক ধরণের শূন্যতা তৈরি করে, যা পূরণ করতে সুরেশের উগ্র আবেগ সুযোগ পায়।তবে-

     সুরেশকে প্রশ্রয় ও মহিমের নির্বিকারত্বই তাদের গৃহদায়ের মূল কারণ। সুরেশ যখন বারবার তাদের জীবনে হস্তক্ষেপ করেছে, তখন মহিম তার স্বভাবজাত গাম্ভীর্য দিয়ে তা উপেক্ষা করেছে। মহিম যদি শুরুতেই সুরেশের গতিরোধ করত বা অচলাকে নিয়ে দৃঢ় অবস্থান নিত, তবে কাহিনী হয়তো ভিন্ন হতে পারত। মহিমের এই নিস্পৃহতাকে অচলা অনেক সময় 'অসম্মান' হিসেবে গণ্য করেছে। শরৎচন্দ্র মহিমের এই মানসিকতা বোঝাতে লিখেছেন-

"মহিমকে চেনা কঠিন। তাহার পাথরের মতো স্থির গাম্ভীর্যের তলায় কী রহিয়াছে, তাহা অচলার বুদ্ধির অতীত।"

        ট্রাজেডির অনুঘটক হিসেবে মহিম প্রতীয়মান। আর সেখানে উপন্যাসের চরম মুহূর্তে যখন সুরেশ অসুস্থ মহিমকে ফেলে অচলাকে হরণ করে নিয়ে যায়, তখনও মহিম কোনো জোরালো প্রতিবাদ বা প্রতিহিংসা দেখায়নি। মহিমের এই 'ক্ষমা' বা 'নির্লিপ্ততা' অচলার অপরাধবোধকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সে চেয়েছে মহিম তাকে শাসন করুক, কিন্তু মহিম তাকে মুক্তি দিয়ে এক চিরস্থায়ী দহন বা 'গৃহদাহ'-এর মুখে ঠেলে দিয়েছে।যেখানে-

      চূড়ান্ত পরিণতিতে দেখি এক আকাশ রিক্ততা।উপন্যাসের শেষে মহিম যখন অচলাকে ক্ষমা করে কিন্তু পুনরায় আপন করে নিতে অস্বীকার করে, তখনই অচলার জীবনের ট্রাজেডি পূর্ণতা পায়। আর এখানে মহিম কে বলতে শোনা যায়- 

"ক্ষমা আমি করিয়াছি অচলা, কিন্তু গ্রহণ করিবার শক্তি আমার নাই।"

     এই একটি বাক্যেই প্রমাণিত হয় যে, মহিমের আদর্শবাদ বা নির্লিপ্ততা অচলার নারীসত্তাকে শেষ পর্যন্ত একাকী ও নিরাশ্রয় করে দিয়েছে। সুরেশের কামনার আগুনে ঘর পুড়েছিল ঠিকই, কিন্তু মহিমের হিমশীতল উদাসীনতায় অচলার হৃদয়ের শেষ আশ্রয়টুকুও ধ্বংস হয়ে যায়।

         পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, মহিমের নির্লিপ্ততা এই উপন্যাসের কাহিনীকে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক পরিণতির দিকে নিয়ে গেছে। মহিম যদি পাথরের মতো স্থির না হয়ে রক্ত-মাংসের মানুষের মতো সক্রিয় হতো, তবে অচলার দোলাচল হয়তো স্তিমিত হতে পারত। মহিমের এই 'ক্ষমাসুন্দর নিস্পৃহতা'ই অচলার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি।

 ঠিক এর অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন  টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KABITA SUNDORBON YouTube channel SAMARESH sir.

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...