Skip to main content

 অচলার প্রতি মহিমের উদাসীনতা বা নির্লিপ্ততা কি কাহিনীকে পরিণতির দিকে নিয়ে গেছে? সংক্ষেপে আলোচনা করো। উদ্ধৃতি সহ বিস্তারিতভাবে নোটি প্রয়োজন

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'গৃহদাহ' উপন্যাসে অচলার জীবনের ট্রাজেডির জন্য সুরেশের উগ্র কামনার চেয়েও অনেক সময় **মহিমের উদাসীনতা বা নির্লিপ্ততাকে** বেশি দায়ী করা হয়। মহিমের এই নিস্পৃহতা কীভাবে কাহিনীকে এক অনিবার্য পরিণতির দিকে নিয়ে গেছে, তা নিচে আলোচনা করা হলো।

## মহিমের নির্লিপ্ততা ও গৃহদাহের পরিণতি

'গৃহদাহ' উপন্যাসে মহিম এক অদ্ভুত চরিত্রের মানুষ। সে স্থিতধী, আদর্শবাদী এবং আত্মসংযমী। কিন্তু একজন রক্ত-মাংসের নারীর কাছে এই অতি-সংযম অনেক সময় 'উদাসীনতা' বা 'অবহেলা'র নামান্তর হয়ে দাঁড়ায়। অচলার মতো আবেগপ্রবণ নারী হৃদয়ের কাছে মহিমের এই নীরবতাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

### ১. মানসিক দূরত্বের সৃষ্টি

মহিম অচলাকে ভালোবাসলেও তার বহিঃপ্রকাশ ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ। সে অচলাকে কোনোদিন শাসন করেনি বা অধিকার দিয়ে আগলে ধরেনি। অচলার অবচেতন মন অনেক সময় মহিমের কাছ থেকে একটু জোর বা শাসন চেয়েছিল, যা সে পায়নি। মহিমের এই নির্লিপ্ততা অচলার মনে এক ধরণের শূন্যতা তৈরি করে, যা পূরণ করতে সুরেশের উগ্র আবেগ সুযোগ পায়।

### ২. সুরেশকে প্রশ্রয় ও মহিমের নির্বিকারত্ব

সুরেশ যখন বারবার তাদের জীবনে হস্তক্ষেপ করেছে, তখন মহিম তার স্বভাবজাত গাম্ভীর্য দিয়ে তা উপেক্ষা করেছে। মহিম যদি শুরুতেই সুরেশের গতিরোধ করত বা অচলাকে নিয়ে দৃঢ় অবস্থান নিত, তবে কাহিনী হয়তো ভিন্ন হতে পারত। মহিমের এই নিস্পৃহতাকে অচলা অনেক সময় 'অসম্মান' হিসেবে গণ্য করেছে। শরৎচন্দ্র মহিমের এই মানসিকতা বোঝাতে লিখেছেন:

> *"মহিমকে চেনা কঠিন। তাহার পাথরের মতো স্থির গাম্ভীর্যের তলায় কী রহিয়াছে, তাহা অচলার বুদ্ধির অতীত।"*

### ৩. ট্রাজেডির অনুঘটক হিসেবে মহিম

উপন্যাসের চরম মুহূর্তে যখন সুরেশ অসুস্থ মহিমকে ফেলে অচলাকে হরণ করে নিয়ে যায়, তখনও মহিম কোনো জোরালো প্রতিবাদ বা প্রতিহিংসা দেখায়নি। মহিমের এই 'ক্ষমা' বা 'নির্লিপ্ততা' অচলার অপরাধবোধকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সে চেয়েছে মহিম তাকে শাসন করুক, কিন্তু মহিম তাকে মুক্তি দিয়ে এক চিরস্থায়ী দহন বা 'গৃহদাহ'-এর মুখে ঠেলে দিয়েছে।

### ৪. চূড়ান্ত পরিণতি ও রিক্ততা

উপন্যাসের শেষে মহিম যখন অচলাকে ক্ষমা করে কিন্তু পুনরায় আপন করে নিতে অস্বীকার করে, তখনই অচলার জীবনের ট্রাজেডি পূর্ণতা পায়। মহিমের সেই বিখ্যাত উক্তি:

> *"ক্ষমা আমি করিয়াছি অচলা, কিন্তু গ্রহণ করিবার শক্তি আমার নাই।"*

এই একটি বাক্যেই প্রমাণিত হয় যে, মহিমের আদর্শবাদ বা নির্লিপ্ততা অচলার নারীসত্তাকে শেষ পর্যন্ত একাকী ও নিরাশ্রয় করে দিয়েছে। সুরেশের কামনার আগুনে ঘর পুড়েছিল ঠিকই, কিন্তু মহিমের হিমশীতল উদাসীনতায় অচলার হৃদয়ের শেষ আশ্রয়টুকুও ধ্বংস হয়ে যায়।

### ৫. উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, মহিমের নির্লিপ্ততা এই উপন্যাসের কাহিনীকে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক পরিণতির দিকে নিয়ে গেছে। মহিম যদি পাথরের মতো স্থির না হয়ে রক্ত-মাংসের মানুষের মতো সক্রিয় হতো, তবে অচলার দোলাচল হয়তো স্তিমিত হতে পারত। মহিমের এই 'ক্ষমাসুন্দর নিস্পৃহতা'ই অচলার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি।

**শিক্ষার্থীর জন্য টিপস:**

 * মহিমকে এখানে **'পাথর-প্রতিম'** বা **'নিস্পৃহ'** হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

 * উত্তরের শেষে দেখাবেন যে, সুরেশের আক্রমণ ছিল বাইরে থেকে, কিন্তু মহিমের নির্লিপ্ততা ছিল ভেতর থেকে— যা কাহিনীকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।

আশা করি এই সংক্ষিপ্ত অথচ তথ্যপূর্ণ নোটটি আপনার উপকারে আসবে। অন্য কোনো আলোচনার প্রয়োজন হলে বলবেন।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা অনার্স (DSE3/4) সাজেশন ২০২৫

       West Bengal State University                                       BA Honours, 6th Semester                                         SUGGESTION 2025                                                      BNGA,DSE05T( DSE3/4)  • বাংলা কথাসাহিত্যঃ মন্বন্তর, দাঙ্গা ও দেশভাগ• একক-১(২০২১) ক) দেশভাগের ইতিহাসের বাস্তব রূপ বাংলা সাহিত্যে  কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে কয়েকটি উপন্যাস অনুসরণে তার পরিচয় দাও। • ১৯৪৬ দাঙ্গা রাজনীতির ট্রাজেডি বাংলা ছোটগল্পের পরিসরে কিভাবে এসেছে, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি রচনা অবলম্বনে আলোচনা করো। (২০২২) পঞ্চাশের মন্বন্তরের বাস্তব বর্ণনা করে বাংলা উপন্যাসে তার কতটা প্রতিফলন ঘটেছে, সে বিষয়ে আলোকপাত করো। •দেশভাগের ক...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...