Skip to main content

জীবনী সাহিত্য কাকে বলে ? জীবনের সাহিত্য এবং আত্মজীবনের মধ্যে পার্থক্য গুলি লেখো। একটি সার্থক জীবনী সাহিত্যের পরিচয় দিয়ে আলোচনা করে দেখাও যে,সেটি কেন সার্থক একটি জীবনের সাহিত্য।

জীবনী সাহিত্য কাকে বলে ? জীবনের সাহিত্য এবং আত্মজীবনের মধ্যে পার্থক্য গুলি লেখো। একটি সার্থক জীবনী সাহিত্যের পরিচয় দিয়ে আলোচনা করে দেখাও যে,সেটি কেন সার্থক একটি জীবনের সাহিত্য। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, চতুর্থ সেমিস্টার ডি এস ৫ ইউনিট ২।

      • জীবনী সাহিত্যঃজীবনী সাহিত্য হলো সাহিত্যের এমন একটি শাখা যেখানে কোনো লেখকের কলমে অন্য কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তির জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি, তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, মহত্ত্ব এবং সমাজমানসে তাঁর প্রভাব বর্ণিত হয়। ইংরেজিতে একে বলা হয় 'Biography'। জীবনীকার এখানে একজন নিরাসক্ত দর্শক বা ঐতিহাসিকের ভূমিকা পালন করেন, যিনি তথ্য ও রসের সমন্বয়ে একজন মানুষের জীবনচিত্রকে পাঠকের সামনে জীবন্ত করে তোলেন।

​        •জীবনী ও আত্মজীবনীর মধ্যে পার্থক্য•

     ১) জীবনী সাহিত্যে রচয়িতা লেখক অন্য কোনো বিখ্যাত বা বিশিষ্ট ব্যক্তির জীবন নিয়ে গ্রন্থটি রচনা করেন। যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'বিদ্যাসাগর চরিত' কিন্তু- 

      আত্মজীবনী গ্রন্থে লেখক নিজের জীবন কাহিনী নিজেই অত্যন্ত ব্যক্তিগতভাবে লিপিবদ্ধ করেন যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'জীবনস্মৃতি'।

      ২) জীবনী সাহিত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়-এখানে লেখক একজন নিরাসক্ত দর্শক বা 'বাইরের মানুষ'। দৃষ্টিভঙ্গি হয় নৈর্ব্যক্তিক বা বস্তুনিষ্ঠ।কিন্তু -

       আত্মজীবনের সাহিত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়-এখানে লেখক নিজেই নায়ক। দৃষ্টিভঙ্গি হয় অনেক বেশি ব্যক্তিগত, আত্মমগ্ন এবং আবেগপ্রবণ।

        ৩) জীবনী সাহিত্যে তথ্যের উৎস জীবনী রচনার জন্য চিঠিপত্র, দলিল, ইতিহাস বা সমকালীন মানুষের সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়।কিন্তু-

      আত্মজীবনী সাহিত্যের প্রধান উৎস হলো লেখকের নিজস্ব স্মৃতি (Memory) এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা।

      ৪) জীবনী সাহিত্যে ব্যাপ্তি ও সমাপ্তি সাধারণত ব্যক্তির জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ কাহিনী থাকে।মৃত্যু পরবর্তী প্রভাবও বর্ণিত হয়। 

      আত্মজীবনীতে মৃত্যু পর্যন্ত বর্ণনা থাকা সম্ভব নয়। সাধারণত লেখক তাঁর জীবনের একটি বিশেষ পর্যায় পর্যন্ত লিখে থাকেন।

       ৫) জীবনী সাহিত্যে সত্যের প্রকৃতি জীবনীকার ঐতিহাসিক সত্য ও তথ্যের নির্ভুলতার দিকে বেশি নজর দেন। ভুল তথ্য জীবনীকে খাটো করে। 

    আত্মজীবনী সাহিত্যে তথ্যগত সত্যের চেয়ে লেখকের মনের সত্য বা অনুভূতির সত্য বেশি গুরুত্ব পায়। কিছুটা পক্ষপাতিত্ব থাকতে পারে।

      ৬) জীবনী সাহিত্যে জীবনের সাহিত্যের উদ্দেশ্য অন্য ব্যক্তির মহত্ত্ব বা সমাজ সংস্কারের কাহিনী মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এর মূল লক্ষ্য।কিন্তু -

      আত্মজীবনী সাহিত্যে নিজের জীবনকে পুনরায় দেখা, স্বীকারোক্তি বা আত্ম-উপলব্ধি পাঠকের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াই এর উদ্দেশ্য।


•একটি সার্থক জীবনী সাহিত্য: ‘বিদ্যাসাগর-চরিত’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)•

        আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি,বাংলা জীবনী সাহিত্যের ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বিদ্যাসাগর-চরিত’ একটি কালজয়ী ও সার্থক সৃষ্টি। এটি কেবল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবনীর একটি শুকনো তথ্যতালিকা নয়, বরং তাঁর চরিত্রের অন্তর্নিহিত তেজ ও মনুষ্যত্বের এক রসঘন সাহিত্যিক দলিল। এখন আমরা আলোচনা করে দেখাবো যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'বিদ্যাসাগর চরিত' কেন একটি সার্থক জীবনের সাহিত্য? আর সেই আলোচনায় আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি-

       আমরা জানি একটি সার্থক জীবনীর প্রধান শর্ত হলো-ব্যক্তির বাহ্যিক পরিচয় ছাপিয়ে তাঁর চারিত্রিক সত্যকে পাঠকের সামনে মূর্ত করে তোলা। রবীন্দ্রনাথের এই রচনাটিতে সেই গুণাবলি অত্যন্ত সার্থকভাবে ফুটে উঠেছে নিঃসন্দেহে। আর এই আলোচনার প্রেক্ষিতে-

      ১) রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগরকে কেবল একজন দয়ালু মানুষ বা সমাজ সংস্কারক হিসেবে দেখেননি, তিনি তাঁকে দেখেছেন এক ‘অজেয় পৌরুষ’-এর প্রতীক হিসেবে। তৎকালীন ভীরু ও স্থবির বাঙালি সমাজে বিদ্যাসাগরের অটল চারিত্রিক দৃঢ়তাকে রবীন্দ্রনাথ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন-

"ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রে যাহা প্রধান গৌরব, তাহা তাঁহার দয়া নহে, তাহা তাঁহার বিদ্যাও নহে-তাহা তাঁহার অক্ষয় মনুষ্যত্ব, তাঁহার অজেয় পৌরুষ।"

       ২) জীবনী সাহিত্য কেবল ইতিহাসের তথ্য নয়, সেখানে লেখকের শিল্পদৃষ্টির প্রকাশ ঘটে। রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগরের জীবনের বিভিন্ন সংগ্রামকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যেখানে তথ্য ও কল্পনা মিলেমিশে এক রসোত্তীর্ণ সাহিত্য হয়ে উঠেছে। তিনি বিদ্যাসাগরকে এক ‘একাকী মহাদ্রুম’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা সমকালীন সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে ছিল।

        ৩) সার্থক জীবনীকার চরিত্রের দোষ-গুণ বিচার করেন নিরপেক্ষভাবে। রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগরের চরিত্রের কঠোরতা এবং কোমলতার অদ্ভুত সমন্বয়কে অত্যন্ত নিপুণভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। বিদ্যাসাগর যখন বিধবা বিবাহ আন্দোলনের জন্য একাকী লড়াই করেন, তখন তাঁর সেই নিঃসঙ্গ যোদ্ধার রূপটি রবীন্দ্রনাথের কলমে জীবন্ত হয়ে উঠেছে-

"বিদ্যাসাগর এই জড়প্রকৃতিতে একটি ব্যতিক্রম ছিলেন। তিনি যে কেন তাঁহার চতুর্দিকস্থ বর্তমান অবস্থার সহিত সাদৃশ্য রক্ষা করিয়া চলেন নাই, তাহা কে বলিবে!"

        ৪) রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, জীবনী সাহিত্যের কাজ হলো মহৎ চরিত্রের মাধ্যমে জাতিকে অনুপ্রাণিত করা। তিনি দেখিয়েছেন, বিদ্যাসাগর কেবল বাঙালির নন, তিনি সমগ্র বিশ্বের আদর্শ হতে পারেন। বিদ্যাসাগরের তেজস্বিতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের উক্তিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ—

"আমাদের এই অবমানিত দেশে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মত এমন অখণ্ড এবং অক্লান্ত মনুষ্যত্বের আদর্শ আর নাই।"

      ৫)জীবনী সাহিত্যের ভাষা হওয়া উচিত গুরুগম্ভীর ও মার্জিত। রবীন্দ্রনাথের গদ্যের সাবলীলতা ও গাম্ভীর্য এই জীবনীটিকে ইতিহাসের কঙ্কাল থেকে রক্ষা করে সাহিত্যের রক্ত-মাংস দান করেছে। তাঁর বর্ণনাভঙ্গির কারণেই বিদ্যাসাগর আমাদের কাছে কেবল অতীতের এক ব্যক্তিত্ব নন, বরং এক চিরকালীন জীবন্ত আদর্শ হয়ে উঠেছেন।

        পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,‘বিদ্যাসাগর-চরিত’ গ্রন্থটিতে জীবনীকার ও জীবন-নায়ক-উভয়ের প্রতিভার এক দুর্লভ মিলন ঘটেছে। তথ্যকে অতিক্রম করে চরিত্রের আত্মাকে চিনে নেওয়ার যে কৌশল রবীন্দ্রনাথ এখানে দেখিয়েছেন, তা একে বাংলা সাহিত্যের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও সার্থক জীবনী সাহিত্যে পরিণত করেছে। বিদ্যাসাগরের প্রতি রবীন্দ্রনাথের এই শ্রদ্ধার্ঘ্য কেবল একটি জীবনীগ্রন্থ নয়, এটি বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ।

 ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং Shishir Kabita Sundarban YouTube channel SAMARESH sir 

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...