পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসে কুবের ও কপিলা—এই দুই চরিত্রের জটিল মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্কটি বিশ্লেষণ করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মেজর।
আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পদ্মানদীর মাঝি' উপন্যাসে কুবের ও কপিলার সম্পর্ক কেবল দেহজ আকর্ষণ নয়, বরং এটি সমাজতত্ত্ব এবং ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বের এক চমৎকার মিশ্রণ। পদ্মার ঢেউয়ের মতো চঞ্চল আর রহস্যময় এই সম্পর্ক। আর এই নিরিখে তাদের সম্পর্কের মধ্যে আমরা দেখতে পাই-
পদ্মা নদী মাঝি উপন্যাসে কুবের এবং কপিলা চরিত্রের মধ্যে আছে অবদমিত বাসনা ও ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব। আসলেকুবেরের জীবনে তার স্ত্রী মালা হলো স্থিরতা ও কর্তব্যের প্রতীক। কিন্তু মালা পঙ্গু হওয়ার কারণে কুবেরের দাম্পত্য জীবনে এক ধরণের অপূর্ণতা কাজ করত। এই অবদমিত বাসনার প্রতিফলন ঘটে শ্যালিকা কপিলার প্রতি আকর্ষণে। কপিলা সেই প্রাণশক্তির প্রতীক, যা কুবেরের ধূসর জীবনে বৈচিত্র্য আনে। কুবের যখন কপিলার দিকে তাকায়, তখন সে কেবল এক নারীকে দেখে না, বরং সে নিজের না পাওয়া আকাঙ্ক্ষাগুলোকে খুঁজে পায়। আর এখানে উপন্যাসিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কে বলতে হয়-
কপিলা হাসে। কুবেরের দিকে চাহিয়া কপিলা হাসে। কুবেরের মনে হয় কপিলার মতো মায়াবিনী পৃথিবীতে আর নাই।"
উপন্যাসে আমরা দেখতে পাই,কপিলার চপলতা ও আকর্ষণের নয়া কৌশল।যেখানে কপিলা কুবেরকে ভালোবাসে কি না, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো সে কুবেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে ভালোবাসে। সে জানে কীভাবে কুবেরের মনে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে হয়। মানিক দেখিয়েছেন, কপিলা সচেতনভাবে কুবেরকে প্রলুব্ধ করে-
"কপিলা ছলনা জানে। সে কখনও কাছে আসে, কখনও দূরে সরিয়া যায়। তাহার এই লুকোচুরি কুবেরের মনে দাহ সৃষ্টি করে।"
আসলে এখানে কপিলার 'হঁলদে গাঁ' যাওয়ার প্রস্তাব বা তামাক সাজিয়ে দেওয়ার মুহূর্তগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সে কুবেরের মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাকে ব্যবহার করে এক ধরণের আধিপত্য বিস্তার করে। অতঃপর আমরা দেখি-
কুবেরের মনে জন্ম নেয় অপরাধবোধ ও অন্তর্ঘাত। কুবের আগাগোড়া একজন সাধারণ ও সরল মানুষ। সে মালাকে শ্রদ্ধা করে, কিন্তু কপিলার প্রতি তার টান সে অস্বীকার করতে পারে না। এই দুই মেরুর মাঝখানে কুবেরের মনে এক ধরণের অপরাধবোধ কাজ করে। মালার প্রতি ভালোবাসা আর কপিলার প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষার দ্বন্দ্বে কুবেরের মনস্তত্ত্ব ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। কুবেরের দ্বিধাগ্রস্ত মনের পরিচয় পাওয়া যায় এখানে—
"মালার দিকে চাহিয়া কুবেরের মায়া হয়, আর কপিলার দিকে চাহিয়া তাহার রক্তে নাচন লাগে।"
দারিদ্র্য ও নৈতিকতার সংঘাতের চিত্র বেশ বৈচিত্র্যময় আলোচ্য উপন্যাসে। আর সেখানে আমরা দেখি,কুবের ও কপিলার সম্পর্কের মনস্তত্ত্বে দারিদ্র্য এক বিশাল ভূমিকা পালন করে। যারা প্রতিদিন প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বাঁচে, তাদের কাছে নাগরিক মধ্যবিত্ত নৈতিকতা (Morality) অনেক সময় অর্থহীন হয়ে পড়ে। কুবের যখন অভাবের তাড়নায় হোসেন মিঞার জালে জড়িয়ে পড়ে, তখন সে মানসিকভাবে একা হয়ে যায়। এই একাকীত্ব তাকে কপিলার আরও কাছে ঠেলে দেয়। কপিলা তখন কেবল প্রেমিকা নয়, বরং তার চরম সংকটের সহযাত্রী হয়ে ওঠে। আর সেখানে-
কপিলার মনস্তত্ত্বে এক ধরণের তীব্র অধিকারবোধ কাজ করে। সে মালার প্রতি সহানুভূতিশীল হলেও, কুবেরের ওপর নিজের প্রভাবটুকু ছাড়তে নারাজ। যখন কুবের তাকে ছেড়ে চলে যেতে চায় বা উপেক্ষা করে, তখন সে অভিমান ও ব্যঙ্গ দিয়ে কুবেরকে বিদ্ধ করে। তাদের সম্পর্কের মধ্যে এক ধরণের 'লাভ-হেট' রিলেশনশিপ বা আকর্ষণ-বিকর্ষণের খেলা চলে, যা সাধারণ পরকীয়ার চেয়ে অনেক বেশি গভীর।
উপন্যাসের শেষে কুবের যখন কপিলার সাথে ঘর ছাড়ে, তখন সেই সিদ্ধান্তের পেছনে কেবল প্রেম ছিল না, ছিল পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতা। কুবেরের মনে ভয় ছিল, কিন্তু কপিলার মনে ছিল জেদ। কপিলা জানত, কুবের একা হোসেন মিঞার দ্বীপে টিকে থাকতে পারবে না। তার সংলাপে সেই দৃঢ়তা ফুটে ওঠে। আর সেই দ্রুতার সাথে কপিলা জানায়-
"আমারে নিবা মাঝি?"
এই প্রশ্নের উত্তর যখন কুবের 'হ' (হ্যাঁ) বলে দেয়, তখন তাদের সম্পর্কের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা এক পরম সত্যে উপনীত হয়-যেখানে সমাজ, সংসার এবং নৈতিকতার চেয়ে 'অস্তিত্ব রক্ষা' বড় হয়ে দাঁড়ায়।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,কুবের ও কপিলার সম্পর্কটি কোনো সরল রেখায় চলেনি। এটি প্রেম, ঈর্ষা, দায়িত্ব এবং আদিম প্রবৃত্তির এক জটিল বুনন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন যে, প্রতিকূল পরিবেশে মানুষের মনস্তত্ত্ব কীভাবে তার সংস্কারকে ছাপিয়ে জৈবিক ও মানসিক আশ্রয়ের সন্ধানে ব্যাকুল হয়ে ওঠে। এই পলায়ন আসলে সমাজ থেকে বিচ্যুতি নয়, বরং এক নতুন জীবনের সন্ধানে দুই নর-নারীর চিরন্তন অভিযাত্রা।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KABITA SUNDORBON YouTube channel SAMARESH sir
Comments
Post a Comment