Skip to main content

মাইকেল মধুসূদন দত্তের অভিষেক কবিতার মূলভাব আলোচনা করো।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের অভিষেক কবিতার মূলভাব আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ দশম শ্রেণি দ্বিতীয় সেমিস্টার।

        মাইকেল মধুসূদন দত্তের অমর কাব্যগ্রন্থ 'মেঘনাদবধ কাব্য'-এর প্রথম সর্গ থেকে সংকলিত 'অভিষেক'কবিতাটি বীররস এবং করুণ রসের এক অপূর্ব সমন্বয়। আর সেখানে আমরা দেখি-

       •প্রমোদ উদ্যান ও দুঃসংবাদ।লঙ্কার রাজপুত্র ইন্দ্রজিৎ (মেঘনাদ) যখন ধাত্রী মাতা প্রভাষার ছদ্মবেশধারী লক্ষ্মীদেবীর কাছ থেকে লঙ্কার ভয়াবহ অবস্থার কথা শোনেন, তখন থেকেই কবিতার মূল ঘটনার সূত্রপাত। তিনি জানতে পারেন যে, তাঁর প্রিয় ভাই বীরবাহু রামচন্দ্রের হাতে নিহত হয়েছেন এবং শোকাতুর পিতা রাবণ প্রতিশোধ নিতে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।যেখানে-

       •বীরের আত্মধিক্কার শুনতে পাই।বিলাস-ব্যসনে মত্ত ইন্দ্রজিৎ এই সংবাদ শুনে অত্যন্ত লজ্জিত ও ক্রুদ্ধ হন। তিনি নিজের অলঙ্কার এবং পুষ্পরাজি ত্যাগ করে বীরের সাজে সজ্জিত হন। তিনি মনে করেন, লঙ্কা যখন শত্রুব্যুহে ঘেরা, তখন তাঁর প্রমোদ উদ্যানে থাকা সাজে না। তাঁর ভাষায়:

"ধিক্ মোরে!—রাঘব দাসি লঙ্কাপুরী,

 বেষ্টন করেছে আসি; আমি এ প্রমোদে,

এ কি সাজে আমারে?"

      •ইন্দ্রজিতের যুদ্ধের প্রস্তুতি ছিল দেখার মতো। তাঁর রথের চাকা থেকে বিদ্যুৎ ঝিলিক দিচ্ছিল এবং ঘোড়াগুলো বাতাসে উড়ছিল। তাঁর এই বীরত্বপূর্ণ যাত্রাকে কবি তুলনা করেছেন কার্তিকেয় বা অর্জুনের বীরত্বের সাথে।

      • প্রমীলার প্রেম ও পতিভক্তিতে আমরা দেখি-যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হয়ে যাওয়ার পথে ইন্দ্রজিতের পথ আগলে দাঁড়ান তাঁর পত্নী প্রমীলা। এই অংশে বীর ইন্দ্রজিতের কোমল রূপটি ফুটে ওঠে। প্রমীলা বিরহকাতর হয়ে তাঁর হাত ধরলে ইন্দ্রজিৎ তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন যে, তিনি শীঘ্র রামচন্দ্রকে পরাজিত করে ফিরে আসবেন।

     •পিতা-পুত্রের সাক্ষাৎ ও অভিষেক পর্ব।ইন্দ্রজিৎ লঙ্কায় পৌঁছে পিতার কাছে গিয়ে প্রণতি জানান এবং রামচন্দ্রকে বিনাশ করার অনুমতি চান। মায়াবী রামের পুনর্জন্ম এবং অলৌকিক ক্ষমতার কথা ভেবে রাবণ চিন্তিত ছিলেন, তাই তিনি পুত্রকে হারাতে চাননি। কিন্তু ইন্দ্রজিতের অদম্য জেদ ও বীরত্ব দেখে রাবণ তাকে সেনাপতি পদে বরণ করে নেন। গঙ্গা ও অন্যান্য পবিত্র জল দিয়ে বিধি অনুসারে ইন্দ্রজিতের 'অভিষেক'সম্পন্ন হয়।

        দেশপ্রেম নিজের মাতৃভূমি লঙ্কার বিপদে ইন্দ্রজিতের ব্যক্তিগত সুখ ত্যাগ করার আকুলতা।পারিবারিক স্নেহ। ভাই বীরবাহুর মৃত্যুতে শোক এবং পিতার সম্মানের প্রতি দায়বদ্ধতা।বীরত্ব,কোনো অলৌকিক বাধা মানতে নারাজ ইন্দ্রজিতের দুর্দমনীয় তেজ।ঐতিহ্য বনাম আধুনিকতা, মধুসূদন এই কবিতায় রাবণ ও ইন্দ্রজিৎকে সাধারণ খলনায়ক হিসেবে না দেখিয়ে রক্ত-মাংসের আবেগপ্রবণ মানুষ এবং প্রকৃত বীর হিসেবে চিত্রিত করেছেন।আসলেএই ঘটনার মাধ্যমেই ইন্দ্রজিতের বীরত্বগাথা এবং ট্র্যাজেডির চূড়ান্ত মুহূর্তের সূচনা হয়, যা 'অভিষেক' নামটিকে সার্থক করে তোলে।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...