অনার্য সর্প সংস্কৃতির স্ফূরণ ঘটেছে মনসামঙ্গল কাব্য।মন্তব্যটির গ্রহণযোগ্যতার সমাজতাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক বিশ্লেষণ। প্রথম সেমিস্টার বাংলা মেজর।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মঙ্গলকাব্যগুলি আর্য ও অনার্য সংস্কৃতির মিলন ও সংঘাতের এক অনন্য দলিল। বিশেষ করে মনসামঙ্গল কাব্যে এই সংঘাত অত্যন্ত প্রকট। লৌকিক সর্পদেবী মনসাকে উচ্চবর্ণের আর্য সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার যে ব্যাকুলতা এই কাব্যে দেখা যায়, তা মূলত বাংলার আদিম অনার্য সর্প সংস্কৃতিরই এক শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ।আর সেখানেই আমারা দেখি-
•অনার্য পটভূমি ও সর্পপূজার আদিমতা উল্লেখ মনসামঙ্গল কাব্যে।বাংলার আদিম নিয়াড বা অস্ট্রিক গোষ্ঠীর মানুষেরা ছিল প্রকৃতির উপাসক। সর্পসঙ্কুল এই বদ্বীপ অঞ্চলে সর্পভীতি থেকেই সর্পপূজার জন্ম। ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায়ের মতে, আর্যরা আসার আগে থেকেই বাংলায় সর্পদেবীর আরাধনা প্রচলিত ছিল। মনসামঙ্গল কাব্যে মনসা কোনো বৈদিক দেবী নন; তিনি মূলত হাড়ি, ডোম, বাগদি ও জেলে সম্প্রদায়ের আরাধ্য।তাই আমরা কাব্যে দেবী মনসাকে বলতে শুনি-
"মোর পূজা প্রচারিবি মর্ত্যলোকে গিয়া। প্রথমহি ডোম ঘরে পূজা লৈব গিয়া।।"
আসলে এই উদ্ধৃতিটি প্রমাণ করে যে, মনসা মূলত অন্ত্যজ ও অনার্য শ্রেণীর দেবী হিসেবেই যাত্রা শুরু করেছিলেন।
•আর্য বনাম অনার্য সংঘাত (চাঁদ সদাগর প্রসঙ্গ) স্পষ্ট মনসামঙ্গল কাব্যে।মনসামঙ্গল কাব্যের প্রধান দ্বন্দ্ব আর্য সংস্কৃতির প্রতিনিধি চাঁদ সদাগর এবং অনার্য দেবী মনসার মধ্যে। চাঁদ সদাগর ছিলেন বৈদিক শিবের উপাসক। তিনি মনসাকে "কাণি" বা "চ্যাংমুড়ী" বলে অবজ্ঞা করেছেন। এই অবজ্ঞা ব্যক্তিগত নয়, বরং এটি আর্য আভিজাত্যের অনার্য সংস্কৃতির প্রতি ঘৃণা। চাঁদ সদাগরকে বলতে শোনা যায় -
"হাতে কুঠার লৈয়া কাটিব সেউতী বনিয়া। মর্ত্যলোকে না দিব পূজা ওরে কাণি রণিয়া।।"*
আসলে এখানে চাঁদ সদাগরের এই দৃঢ় অবস্থান আসলে উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ্য ধর্মের সেই সময়ের আধিপত্যবাদেরই প্রতিফলন।
• লিঙ্গ ও ক্ষমতার লড়াই এর চিত্র মনসামঙ্গল কাব্যে স্পষ্টত লক্ষণীয়।অনার্য সংস্কৃতিতে অনেক ক্ষেত্রে মাতৃপ্রধান সমাজের প্রভাব ছিল। মনসা একজন নারী হয়েও পুরুষতান্ত্রিক আর্য সমাজের প্রতিনিধি চাঁদ সদাগরের দর্প চূর্ণ করেন। এটি অনার্য শক্তির ক্ষমতায়নের একটি দিক। চাঁদ সদাগরের সপ্তডিঙা ডুবিয়ে দেওয়া, তাঁর ছয় পুত্রকে হত্যা করা-এই চরম নিষ্ঠুরতা আসলে আদিম প্রকৃতির অপ্রতিরোধ্য শক্তির পরিচয় দেয়, যা তাত্ত্বিক আর্য দর্শনের ঊর্ধ্বে। শুধু তাই নয়-
• লোকায়ত বিশ্বাস ও যাদুবিদ্যার কাব্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।মনসামঙ্গল কাব্যে বর্ণিত ওঝা, ধন্বন্তরী এবং বিষহরির ধারণাগুলি সম্পূর্ণ লোকায়ত। মৃত লখিন্দরকে পুনরুজ্জীবিত করার কাহিনীতে বেহুলার যে যাত্রা, তাতে আর্য যজ্ঞের চেয়ে লৌকিক ব্রত ও যাদুবিদ্যার গুরুত্ব বেশি। বেহুলার ভেলা বেয়ে স্বর্গে যাওয়ার ঘটনাটি মূলত বাংলার প্রাচীন লোককথা ও লোকবিশ্বাসের অংশ, যা আর্য পুরাণে দুর্লভ। এর পাশাপাশি আমরা আরও দেখতে পাই যে-
•সাংস্কৃতিক সমন্বয় ও স্বীকৃতির আস্বাস।তাই কাব্যের শেষে দেখা যায়, চাঁদ সদাগর বাম হাতে মনসাকে পূজা দিচ্ছেন। এই 'বাম হস্তের পূজা' একটি গভীর ইঙ্গিতবাহী ঘটনা। এর মাধ্যমে সমাজতাত্ত্বিকেরা বোঝাতে চেয়েছেন যে, আর্য সমাজ অনার্য সংস্কৃতিকে সম্পূর্ণ আপন করে নিতে না পারলেও তাকে অস্বীকার করার ক্ষমতা হারিয়েছিল।আর এই প্রসঙ্গে কবি বিজয়গুপ্তের কাব্যে শুনতে পাই-
"বাম হাতে চাঁদ রাজা পুষ্প দিল ফেলে। হাসিয়া লৈল বিষহরী অঞ্চলের কোলে।।"
আর এটি দুই সংস্কৃতির মধ্যে একপ্রকার "Compromise" বা ঐতিহাসিক সন্ধি বলা যেতেই পারে। শুধু তাই নয়-
• নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ স্পষ্ট মনসামঙ্গল কাব্যে।মনসার বাহন 'হংস' বা তাঁর 'পদ্মে অবস্থান' পরবর্তীকালে আর্যীকরণের ফলে যুক্ত হলেও, তাঁর মূল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি (যেমন-জেদ, ক্রোধ, প্রতিশোধস্পৃহা) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্প-সংস্কৃতির সাথে মেলে। বিশেষ করে জাঙ্গুলী তারা বা মনসার যে রূপকল্প, তা বৌদ্ধ ও আদিম তান্ত্রিক ধারার সংমিশ্রণ।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, মনসামঙ্গল কাব্য কেবল ধর্মীয় প্রচারের মাধ্যম নয়। এটি বাংলার আদিম ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির মূল ধারায় প্রবেশের সংগ্রাম। অনার্য সর্প সংস্কৃতিই এই কাব্যের প্রাণশক্তি। কবিরা আর্য পুরাণের মোড়কে এই অনার্য লৌকিক বিশ্বাসকেই নতুন রূপ দিয়েছেন। সুতরাং, মন্তব্যটি কেবল গ্রহণযোগ্য নয়, বরং মনসামঙ্গল কাব্যের সঠিক মূল্যায়নের জন্য অপরিহার্য।
**পরীক্ষার জন্য টিপস:**
* উত্তরে **ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য** বা **নীহাররঞ্জন রায়**-এর মতো পণ্ডিতদের নাম উল্লেখ করলে নম্বর বাড়ে।
* **চাঁদ সদাগরের উক্তি** এবং **বাম হাতে পূজার** বিষয়টি পয়েন্ট আকারে লিখলে শিক্ষকরা খুশি হন।
* শব্দসীমা ধরে রাখতে পয়েন্টগুলো স্পষ্ট করে লিখুন।
পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয়ের (WBSU) প্রথম সেমিস্টার বাংলা মেজারের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী 'মনসামঙ্গল' কাব্যে অনার্য সর্প সংস্কৃতির প্রভাব সংক্রান্ত একটি পূর্ণাঙ্গ নোট নিচে দেওয়া হলো।
## অনার্য সর্প সংস্কৃতির স্ফূরণ ও মনসামঙ্গল কাব্য
**ভূমিকা:**
মধ্যযুগের বাংলা মঙ্গলকাব্য ধারার অন্যতম প্রাচীন ও জনপ্রিয় শাখা হলো মনসামঙ্গল। এই কাব্যের মূল উপজীব্য হলো দেবী মনসার পূজা প্রচার এবং লৌকিক সর্প বিশ্বাসের বিজয়গাথা। সমাজতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক বিচারে মনসামঙ্গল কাব্য কেবল একটি ধর্মীয় আখ্যান নয়, বরং এটি বাংলার আর্য-অনার্য সংস্কৃতির দীর্ঘকালীন সংঘাত ও পরিণামে সমন্বয়ের এক মহাকাব্যিক দলিল।
**অনার্য পটভূমি ও সর্প সংস্কৃতি:**
আর্যরা বাংলায় আসার বহু আগে থেকেই এখানকার আদিম অধিবাসী যেমন— কোল, ভিল, সাঁওতাল, শবর ও ডোমদের মধ্যে সর্পপূজার প্রচলন ছিল। কৃষিপ্রধান ও নদীমাতৃক বাংলায় সর্পভীতি ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। এই আদিম ভয় থেকেই অনার্য সমাজে সর্পদেবীর কল্পনা শুরু হয়। বিশিষ্ট গবেষক ড. আশুতোষ ভট্টাচার্যের মতে—
> *"মনসামঙ্গল কাব্যের মূলে রহিয়াছে এক সুপ্রাচীন অনার্য সর্প-সংস্কৃতি, যাহা কালক্রমে আর্য সংস্কৃতির সহিত মিশ্রিত হইয়া এক নূতন রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে।"*
>
**আর্য-অনার্য সংঘাত ও মনসা:**
মনসামঙ্গল কাব্যের প্রধান চরিত্র চাঁদ সদাগর হলেন আর্য সংস্কৃতির তথা শিবের একনিষ্ঠ উপাসক। অন্যদিকে মনসা হলেন অনার্য ও অন্ত্যজ শ্রেণীর প্রতিনিধি। কাব্যে দেখা যায়, ডোম, জেলে ও অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষরাই প্রথমে মনসার পূজা শুরু করে। চাঁদ সদাগর এই লৌকিক দেবীকে "কাণি", "চ্যাংমুড়ী" বলে অবজ্ঞা করেছেন। এই সংঘাত আসলে তথাকথিত উচ্চবর্ণের আর্য ধর্মের সাথে প্রান্তিক অনার্য লৌকিক ধর্মের লড়াই।
**কাব্যে অনার্য অনুষঙ্গ ও বিবর্তন:**
মনসা শব্দের বুৎপত্তিগত অর্থ যাই হোক না কেন, কাব্যে তাঁর রূপ বর্ণনায় এক রুক্ষ ও আদিম তেজ প্রকাশ পায়। তিনি বিষহরী, ঝাঙ্কটেশ্বরী বা জাঙ্গুলী নামে পরিচিত। তাঁর বেশভূষা এবং সাপের অলঙ্কার অনার্য সংস্কৃতিরই পরিচায়ক। বিজয়গুপ্তের 'পদ্মাপুরাণ'-এ মনসার ক্রোধ ও অনার্য সুলভ জেদ লক্ষ্য করা যায়:
> *"অষ্ট নাগ আজ্ঞা দিল বিষহরী মাতা। / দংশিল লখিন্দররে কালনাগ দিয়া তাতা।।"*
>
এখানে দেবী দয়া বা করুণার চেয়ে প্রতিহিংসাপরায়ণতাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, যা আদিম সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
**বেহুলা-লখিন্দর উপাখ্যান ও যাদুবিদ্যা:**
লখিন্দরের মৃত্যু এবং বেহুলার মানত করে মৃত স্বামীকে পুনরুজ্জীবিত করার কাহিনীতে আদিম যাদুবিদ্যা বা 'Shamanism'-এর প্রভাব স্পষ্ট। লোহার বাসর ঘর তৈরি, ওঝা ও ধন্বন্তরীর কাহিনী—এই সবই অনার্য লোকবিশ্বাসের প্রতিফলন। বেহুলার কলাগাছের ভেলায় ভেসে যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত দেবসভায় নৃত্যের মাধ্যমে স্বামীকে ফিরে পাওয়া আসলে লৌকিক ব্রত ও তুকতাকের জয়গান।
**সাংস্কৃতিক সমন্বয় ও গ্রহণযোগ্যতা:**
মনসামঙ্গল কাব্যের শেষে দেখা যায়, আর্য প্রতিনিধি চাঁদ সদাগর বাম হাতে দেবী মনসাকে পূজা দিচ্ছেন। এটি একটি প্রতীকী ঘটনা। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, আর্য সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত অনার্য সর্প সংস্কৃতিকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। তবে এই গ্রহণ ছিল শর্তাধীন—তাই বাম হাতে পূজা। এটি আর্য-অনার্য সংস্কৃতির এক অদ্ভুত সন্ধিচুক্তি।
**উপসংহার:**
পরিশেষে বলা যায়, মনসামঙ্গল কাব্যটি বাংলার মাটি ও মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতির ফসল। অনার্য সর্প সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে যে লৌকিক বিশ্বাসের জন্ম হয়েছিল, তাকেই একটি সাহিত্যিক ও পৌরাণিক কাঠামো দান করেছে এই কাব্য। তাই "অনার্য সর্প সংস্কৃতির স্ফূরণ ঘটেছে মনসামঙ্গল কাব্যে"—এই মন্তব্যটি ঐতিহাসিকভাবে অনস্বীকার্য এবং সর্বজনগ্রাহ্য। এই কাব্যটি বাঙালির আত্মপরিচয় ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক অনন্য দলিল।
Comments
Post a Comment