রূপক সাংকেতিক নাটক কাকে বলে? রূপক সাংকেতিক নাটকের বৈশিষ্ট লেখো। একটি সার্থক রূপক সাংকেতিক নাটক আলোচনা করো।
রূপক সাংকেতিক নাটক কাকে বলে? রূপক সাংকেতিক নাটকের বৈশিষ্ট লেখো। একটি সার্থক রূপক সাংকেতিক নাটক আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজরDS5,Unit-1
•রূপক নাটকঃ যখন কোনো নাটকে অপ্রাসঙ্গিক বা বাহ্যিক কাহিনীর অন্তরালে একটি গভীর আধ্যাত্মিক বা নৈতিক সত্য প্রকাশিত হয়, তখন তাকে রূপক নাটক বলে। এখানে চরিত্রের নাম বা ঘটনা প্রতীকী হয় (যেমন- 'বিবেক', 'লোভ' ইত্যাদি)।
•সাংকেতিক নাটকঃ যে নাটকে স্থূল ঘটনার পরিবর্তে কোনো সূক্ষ্ম ভাব বা অতীন্দ্রিয় সত্যকে সংকেতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়, তাকে সাংকেতিক নাটক বলে। এখানে সত্য সরাসরি প্রকাশিত না হয়ে ব্যঞ্জনার মাধ্যমে ইঙ্গিতময় হয়ে ওঠে।
বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই দুই ধারার সমন্বয় ঘটিয়ে 'রূপক-সাংকেতিক' নাট্যরীতির প্রবর্তন করেন।আর এই প্রেক্ষিতে আমরা এই জাতীয় নাটকে যে বৈশিষ্টগুলি পাই তাহলো-
১. দ্বি-স্তরীয় অর্থঃএই ধরণের নাটকের দুটি অর্থ থাকে— একটি বাহ্যিক বা আভিধানিক অর্থ এবং অন্যটি অন্তর্নিহিত বা গূঢ় ব্যঞ্জনাধর্মী অর্থ।
২. চরিত্রের প্রতীকী রূপঃ নাটকের চরিত্রগুলো রক্ত-মাংসের সাধারণ মানুষ হওয়ার চেয়ে কোনো বিশেষ ভাব, ধারণা বা শক্তির প্রতীক হিসেবে বেশি কাজ করে।
৩. ইঙ্গিতময়তা ও ব্যঞ্জনাঃনাট্যকার এখানে সরাসরি কিছু না বলে সংলাপ, গান বা পরিবেশের সংকেতের মাধ্যমে মূল ভাবটিকে ফুটিয়ে তোলেন।
৪. অতীন্দ্রিয়তা ও আধ্যাত্মিকতাঃ এইশ্রেণীর নাটকে প্রায়শই বস্তুজগতের সীমানা ছাড়িয়ে অতীন্দ্রিয় রহস্য বা আধ্যাত্মিক সত্যের সন্ধান করা হয়।
৫. প্রকৃতি ও সংগীতের ভূমিকাঃ রূপক-সাংকেতিক নাটকে প্রকৃতি একটি জীবন্ত চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং গান বা সংগীত নাটকের আবহ ও ভাব প্রকাশে প্রধান ভূমিকা নেয়।
•একটি সার্থক রূপক সাংকেতিক নাটক- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'রাজা' নাটক।
•আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'রাজা' নাটক' টি একটি স্বার্থক রূপক-সাংকেতিক নাটক।যে নাটকটির মূল সার্থকতা নিহিত আছে এর ভাববস্তু, চরিত্র এবং নামকরণে প্রতীক বা সংকেতের সফল প্রয়োগের মাধ্যমে।আর সেই প্রেক্ষিতে আমরা প্রথমেই বলতে পারি রূপক সাংকেতিক নাটক কী? সেই আলোচনায় আমরা বলতে পারি-
•রূপক-সাংকেতিক নাটক হলো সেই নাটক, যেখানে আক্ষরিক কাহিনীর আড়ালে একটি গভীর আধ্যাত্মিক, দার্শনিক বা নৈতিক সত্যকে সংকেতের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়।আর সেই প্রেক্ষিতে 'রাজা' নাটকে প্রেম, ঈশ্বর, সৌন্দর্য ও মানুষের মুক্তি-এই সমস্ত গভীর বিষয়গুলিকে সংকেতের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।আর সেখানে 'রাজা' নাটকের প্রতিটি চরিত্র, স্থান ও ঘটনা এক-একটি গভীর ভাবনার প্রতীক। এই সকল বিষয়গুলি সফল ব্যবহার রাজা নাটকটি সার্থক সার্থক রূপক সাংকেতিক নাটকের সার্থকতা পেয়েছে।আর সেখানে-
• রাজা অরূপ ঈশ্বর বা পরম ব্রহ্ম।যিনি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নন, তবে তিনি কিন্তু সর্বব্যাপী। তিনি সমগ্র নাটক জুড়ে অদৃশ্যমান। তবে নাটকে তাঁর কণ্ঠস্বর আমরা শুনতে পাই। আসলে তাঁর এই অদৃশ্যতা প্রমাণ করে যে, ঈশ্বরকে চোখ দিয়ে দেখা যায় না, কেবলমাত্র অন্তরের উপলব্ধির দ্বারাই তাঁকে জানা যায়, অনুভব করতে হয়। আর এখানে আমরা নাটকে শুনতে পাই-
"মূঢ় তারা মনে করে দেখতে পাচ্ছি—তারা জানে না যে জীবনের মধ্যেই আনন্দ, তাকে কখনো দেখেনা।"
•সুদর্শনা। রাজা নাটকে সুদর্শনা চরিত্রটি মানবাত্মা বা জিজ্ঞাসু মন। যে মন নিয়ে সে প্রথমে রূপের মোহে আবিষ্ট হয় এবং শেষে সে উপলব্ধির পথে মুক্তি খোঁজে। আসলে সুদর্শনা বাহ্যিক সৌন্দর্যের পূজারিণী। তাই সে রূপবান সুবর্ণকে রাজা বলে ভুল করে এবং অন্ধকার ঘরে রাজার নৈকট্যকে ভয় পায়। অবশেষে ভুল ভেঙে দুঃখের পথ ধরে সে পরম উপলব্ধিতে পৌঁছায়। তাই আমরা তাকে বলতে শুনি-
"তুমি সুন্দর নও, প্রভু, সুন্দর নও-তুমি অনুপম।"
আর এই উপলব্ধির মধ্য দিয়েই সুদর্শনার আত্মোপলব্ধি পূর্ণ হয়। পাশাপাশি-
•অন্ধকার ঘর। রাজা নাটকে অন্ধকার হলো হৃদয়ের নিভৃত কুঠুরি বা আত্মা।যে কুঠুরিতে পরম ব্রহ্মের গোপন লীলা চলে। শুধু তাই নয়, আলো-ঝলমলে বাইরের জগতে নয়, কেবল অন্ধকার অন্তরেই রাজার প্রকৃত পরিচয় মেলে। এই ঘরটি প্রমাণ করে যে ঈশ্বরকে জানার জন্য বাহ্যিক আলো বা আড়ম্বরের প্রয়োজন নেই। তাই দাসী সুরঙ্গমা রানী সুদর্শনাকে বলে-
"আলোর ঘরে সকলেরই আনাগোনা-এই অন্ধকারে কেবল একলা তোমার সঙ্গে মিলন।"
এখানে অন্ধকার ঘর হলো হৃদয়ের নিভৃত স্থান বা আত্মার গভীর উপলব্ধির জগৎ, যেখানে রাজা (ঈশ্বর/পরমাত্মা) তাঁর অরূপ রূপে বিরাজ করেন। আর আলোর ঘর হলো পার্থিব বা বাহ্যিক জগৎ, যেখানে সকলেরই প্রবেশাধিকার আছে।আসলে-
সুরঙ্গমা বোঝাতে চেয়েছে, পার্থিব রূপ বা বাইরের জগতে ঈশ্বরকে সকলে দেখতে পেলেও, হৃদয়ের নিভৃতে তাঁকে কেবল একাকী প্রেমের মাধ্যমেই পাওয়া যায়।
•ঠাকুরদা ও সুরঙ্গমা। রাজা নাটকে ঠাকুরদা ও সুরঙ্গমা হলেন সখ্যভাবের ভক্ত এবং দাসীভাবের ভক্ত। এই দুটি চরিত্র প্রথম থেকেই রাজাকে তার অরূপ সত্তায় উপলব্ধি করতে পেরেছে। তারা প্রমাণ করে যে, দুঃখ বা ত্যাগ স্বীকারের মাধ্যমেই ঈশ্বরের সঙ্গে সহজ ও নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন সম্ভব।আর সেই ত্যাগের মহিমা নিয়ে সুরঙ্গমাকে বলতে শুনি-
"আমার একটা বোধ জন্মে গেছে, আমার বোঝবার জন্য কিছুই দেখবার দরকার হয় না।"
•বসন্ত উৎসব ও অন্যান্য রাজা। বসন্ত উৎসব ও অন্যান্য রাজা হলো এ নাটকে রূপের মোহ, বাহ্যিক আড়ম্বর এবং আসক্তিপূর্ণ পার্থিব জগৎ। যেখানে সুদর্শনা রাজার বাহ্যিক রূপ দেখতে চেয়ে যে ভ্রম করে, তারই ফল হলো বসন্ত উৎসব। সেখানে মিথ্যা রাজাদের ভিড়ে আসল রাজাকে চেনা যায় না, বরং যুদ্ধ ও সংঘাত শুরু হয়।যা পার্থিব জীবনের লোভ ও কামনার প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত। আর এই সকল প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি-
নাটকটির নামকরণ 'রাজা' অবশ্যই সার্থক। এই 'রাজা' শুধু একটি রাজ্যের শাসক নন,তিনি একজন মানব হৃদয়ের রাজা, অর্থাৎ ঈশ্বর। সমগ্র নাটকটি আবর্তিত হয়েছে এই অদৃশ্য 'রাজা' এবং তাকে কেন্দ্র করে সুদর্শনার আত্ম-অনুসন্ধান। অতএব, ভাববস্তুগত দিক থেকে এই নামকরণ সম্পূর্ণ সার্থক ও প্রতীকী। তবে-
নাট্যকার'রাজা' নাটকে দৃশ্যমান জগতের আড়ালে এক অদৃশ্য আধ্যাত্মিক সত্যকে তুলে ধরা হয়েছে। যেখানে প্রতিটি চরিত্র ও ঘটনার প্রতীকী ব্যবহার এই সত্যকে সুস্পষ্ট করেছে।যা নাটকটিকে একটি অত্যন্ত সার্থক রূপক-সাংকেতিক নাটকের মর্যাদা দিয়েছে।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏
Comments
Post a Comment