অসংগতি (Maladjustment) কী?অসংগতি দূরীকরণে পরিবারের ভূমিকা এবং অসংগতি দূরীকরণে শিক্ষকের ভূমিকা আলোচনা করো।
অসংগতি (Maladjustment) কী?অসংগতি দূরীকরণে পরিবারের ভূমিকা এবং অসংগতি দূরীকরণে শিক্ষকের ভূমিকা আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ষষ্ঠ সেমিস্টার এডুকেশন মাইনর।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, যখন কোনো ব্যক্তি তার অভ্যন্তরীণ চাহিদা (Needs) এবং বাইরের পরিবেশের প্রতিকূলতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে না, তখন যে মানসিক অস্থিরতা তৈরি হয় তাকেই অসংগতি বলে।তবে - অসংগতি কোনো জন্মগত রোগ নয়, বরং এটি একটি অর্জিত আচরণ। যখন কোনো শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় ধরে তার লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয় বা পরিবেশ থেকে ক্রমাগত বাধা পায়, তখন সে অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে।
•অসংগতি দূরীকরণে পরিবারের ভূমিকা•
পরিবার হলো শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের ভিত্তি। অসংগতি প্রতিকারে পরিবারের দায়িত্বগুলো হলো-
•অগণতান্ত্রিক শাসনঃবাড়িতে খুব বেশি কড়া শাসন বা একদম শাসনহীনতা-দুটোই ক্ষতিকর। বাবা-মায়ের উচিত সন্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা করে নিয়মকানুন ঠিক করা।
•পারিবারিক সংহতিঃ বাবা-মায়ের মধ্যে সদ্ভাব ও সুখের পরিবেশ শিশুর মনে নিরাপত্তা তৈরি করে। পরিবারের ভাঙন বা অশান্তি অসংগতির প্রধান কারণ।
•স্বীকৃতি ও প্রশংসাঃ শিশুর ছোট ছোট সাফল্যকেও স্বীকৃতি দিন। তাকে অবহেলা করলে সে হীনম্মন্যতায় (Inferiority Complex) ভুগতে পারে।
•ব্যক্তিগত পরিসরঃ বয়ঃসন্ধিকালের ছেলেমেয়েদের নিজস্ব চিন্তাভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং তাদের গোপনীয়তাকে সম্মান জানানো উচিত।
•সঠিক প্রত্যাশাঃ সন্তানের ক্ষমতার বাইরে গিয়ে তার ওপর আকাশচুম্বী প্রত্যাশা চাপিয়ে দেবেন না। এটি তাকে প্রবল মানসিক চাপের মুখে ফেলে দেয়।
• অসংগতি দূরীকরণে শিক্ষকের ভূমিকা•
শিক্ষক হলেন শ্রেণিকক্ষের নিয়ন্ত্রক এবং শিক্ষার্থীর মানসিক চিকিৎসক। তাঁর ভূমিকা নিচে আলোচনা করা হলো-
•অসংগতির কারণ শনাক্তকরণঃ শিক্ষক প্রথমেই লক্ষ্য করবেন কোন শিক্ষার্থী কেন অস্বাভাবিক আচরণ করছে। এর পেছনে কি শারীরিক সমস্যা, পারিবারিক অভাব নাকি বন্ধুত্বের টানাপোড়েন আছে, তা ধৈর্য ধরে বুঝতে হবে।
•শিক্ষণ পদ্ধতির পরিবর্তনঃ একঘেয়ে পড়া অনেক সময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসংগতি তৈরি করে। তাই আধুনিক অডিও-ভিজ্যুয়াল মাধ্যম বা খেলার ছলে শিক্ষাদান করলে শিক্ষার্থীরা পাঠে আনন্দ পাবে।
•দলগত কার্যাবলিঃ অসংগতিপূর্ণ শিক্ষার্থীরা সাধারণত একা থাকতে পছন্দ করে। শিক্ষক তাদের বিভিন্ন দলগত প্রজেক্ট বা খেলাধুলায় অংশ নিতে বাধ্য না করে উৎসাহিত করবেন, যাতে তাদের সামাজিক জড়তা কাটে।
•আচরণ সংশোধনঃ শিক্ষার্থী ভুল করলে সবার সামনে তাকে অপমান না করে আড়ালে ডেকে বুঝিয়ে বলা। ইতিবাচক আচরণের জন্য তাকে পুরস্কৃত করা।
•পরামর্শদান ও নির্দেশনাঃ প্রয়োজনে শিক্ষক বিশেষ কাউন্সিলিং-এর ব্যবস্থা করবেন। শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্য তার ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরবেন।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,অসংগতি দূর করা একটি যৌথ প্রচেষ্টা। পরিবার যদি সচেতন হয় এবং শিক্ষক যদি সংবেদনশীল হন, তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে। একজন শিক্ষকের কাছে বড় সাফল্য হলো একজন পিছিয়ে পড়া বা অসংগতিপূর্ণ শিক্ষার্থীকে সমাজের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনা।
Comments
Post a Comment