Skip to main content

সুরেশ ও মহিম এই দুই বিপরীত চরিত্রের তুলনামূলক আলোচনা করে উপন্যাসের কাহিনী বিন্যাসে তাদের ভূমিকা নিরূপণ করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মেজর ৬০০ শব্দের মধ্যে তাদের কথোপকথনের পদ্ধতি সহ একটি গঠনমূলক ও তথ্য মূলক নোট প্রয়োজন।


পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (WBSU) ষষ্ঠ সেমিস্টারের পাঠ্যসূচি অনুযায়ী 'গৃহদাহ' উপন্যাসের দুই প্রধান পুরুষ চরিত্র— **সুরেশ ও মহিম**-এর তুলনামূলক আলোচনা এবং কাহিনী বিন্যাসে তাদের ভূমিকা নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।

## 'গৃহদাহ' উপন্যাসে সুরেশ ও মহিম: চরিত্রের তুলনা ও কাহিনীতে ভূমিকা

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'গৃহদাহ' উপন্যাসে সুরেশ ও মহিম চরিত্র দুটি যেন আগুনের দুটি ভিন্ন রূপ। একটি দাহিকা শক্তিতে সবকিছু ছারখার করে দেয়, অন্যটি স্থির প্রদীপের মতো আত্মসংযমে উজ্জ্বল। এই দুই বিপরীতধর্মী চরিত্রের দ্বন্দ্বই উপন্যাসের কাহিনীকে পরিণতির দিকে নিয়ে গেছে।

### ১. চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের তুলনা

**মহিম: স্থিতপ্রজ্ঞ ও আদর্শবাদী**

মহিম চরিত্রটি ধৈর্যের প্রতিমূর্তি। সে দরিদ্র কিন্তু আত্মমর্যাদাসম্পন্ন। তার প্রেম শান্ত, গভীর এবং অনুচ্চারিত। মহিম অতিরিক্ত সংযমী, যা অনেক সময় তাকে রক্ত-মাংসের মানুষের চেয়ে পাথরের মূর্তির মতো মনে করায়। সে নিয়তিবাদী এবং বিপদেও অবিচল।

**সুরেশ: আবেগপ্রবণ ও ভোগবাদী**

সুরেশ মহিমের সম্পূর্ণ বিপরীত। সে বিত্তবান, আবেগপ্রবণ এবং অস্থির। সুরেশের প্রেম আদিম কামনাসক্ত এবং অধিকারবোধে অন্ধ। সে যা চায়, তা যেকোনো মূল্যে পেতে চায়। তার চরিত্রে একদিকে যেমন পশুর মতো হিংস্রতা আছে, অন্যদিকে অকৃপণ দানশীলতাও আছে।

### ২. প্রেম ও মনস্তত্ত্বের পার্থক্য

মহিমের কাছে প্রেম হলো মুক্তি ও বিশ্বাস। সে অচলাকে ভালোবাসলেও তাকে কখনও শৃঙ্খলিত করতে চায়নি। এমনকি অচলার বিচ্যুতিতেও সে নিস্পৃহ। অন্যদিকে, সুরেশের কাছে প্রেম হলো অধিকার। অচলাকে পাওয়ার নেশায় সে নৈতিকতা ও বন্ধুত্বের মর্যাদাও বিসর্জন দিয়েছে।

### ৩. কথোপকথন ও প্রকাশভঙ্গি

তাদের কথা বলার ধরণ থেকেই তাদের চারিত্রিক বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়।

 * **মহিমের ভাষা:** অত্যন্ত পরিমিত এবং যুক্তিপূর্ণ। সে আবেগ লুকিয়ে রাখতে জানে। যেমন— অচলার বিয়ের ব্যাপারে বা সুরেশের আচরণের প্রেক্ষিতে সে শান্তভাবে বলে, *"অনর্থক তর্কের প্রয়োজন নেই।"*

 * **সুরেশের ভাষা:** তীব্র, নাটকীয় এবং আবেগে থরথর। সে নিজের অন্তরের জ্বালা চেপে রাখতে পারে না। সুরেশ মহিমকে সরাসরি আক্রমণ করে বলে— *"তুই মানুষ না পাথর, তোকে বোঝা আমার সাধ্যের বাইরে।"*

### ৪. কাহিনী বিন্যাসে তাদের ভূমিকা

উপন্যাসের কাহিনী এগিয়েছে এই দুই বন্ধুর বিপরীতমুখী সংঘাতের ওপর ভিত্তি করে।

 * **সংঘাতের সূচনা:** দরিদ্র মহিম ও ধনী সুরেশের বন্ধুত্বের মাঝখানে অচলার আগমনই কাহিনীতে জটিলতা সৃষ্টি করে। সুরেশ তার অর্থের প্রভাব এবং আবেগের তীব্রতা দিয়ে অচলার মনে দোলা দেয়।

 * **কাহিনীর মোড় পরিবর্তন:** সুরেশ যখন অসুস্থ মহিমকে সেবা করার অছিলায় অচলাকে সুকৌশলে হরণ করে দেওঘরে নিয়ে যায়, তখনই উপন্যাসের চূড়ান্ত ক্লাইম্যাক্স তৈরি হয়। এই চৌর্যবৃত্তি কাহিনীকে সামাজিক সমস্যা থেকে মনস্তাত্ত্বিক সংকটে উত্তীর্ণ করে।

 * **পরিণতি:** সুরেশের মৃত্যু এবং মহিমের নির্লিপ্ত ক্ষমা—এই দুইয়ের মাঝে পড়ে অচলার জীবন 'গৃহদাহ'-এর আগুনে ভস্মীভূত হয়। সুরেশের দানবীয় প্রেম কাহিনীকে গতিশীল করেছে, আর মহিমের দেবোপম ধৈর্য কাহিনীকে এক করুণ ও গাম্ভীর্যপূর্ণ সমাপ্তি দিয়েছে।

### ৫. তুলনামূলক ছক (একনজরে)


| বৈশিষ্ট্য | মহিম | সুরেশ |

| :--- | :--- | :--- |

| **প্রকৃতি** | অন্তর্মুখী ও সংযত | বহির্মুখী ও উগ্র |

| **আর্থিক অবস্থা** | দরিদ্র ও স্বাবলম্বী | ধনী ও বিলাসপ্রিয় |

| **প্রেমানুভূতি** | শান্ত ও গভীর | উত্তাল ও ধ্বংসাত্মক |

| **জীবনদর্শন** | আদর্শবাদ ও ক্ষমা | ভোগবাদ ও অধিকার |


### উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, মহিম ও সুরেশ কেউ এককভাবে সম্পূর্ণ নয়। মহিমের অতিরিক্ত শীতলতা যেমন অচলার নারীহৃদয়কে অতৃপ্ত রেখেছে, সুরেশের অতিরিক্ত দহন তেমনি তাকে ছাই করে দিয়েছে। কাহিনী বিন্যাসে মহিম যদি হয় 'ভিত্তি', তবে সুরেশ হলো সেই 'ঝড়' যা সেই ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এই দুই বিপরীত শক্তির লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয় হয়েছে শরৎচন্দ্রের নিপুণ জীবনবোধের।

**পরীক্ষার জন্য টিপস:**

 * উত্তরের গুরুত্ব বাড়াতে মহিম ও সুরেশের দ্বন্দ্বের সময়কার দু-একটি ছোট ছোট সংলাপ (যেমন উপরে দেওয়া হয়েছে) ব্যবহার করবেন।

 * সুরেশের মৃত্যুকে কেন তার 'প্রায়শ্চিত্ত' বলা হয়, তা এক লাইনে উল্লেখ করতে পারেন।

আপনার কি এই উপন্যাসের অন্য কোনো অংশ নিয়ে সাহায্য প্রয়োজন?

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা অনার্স (DSE3/4) সাজেশন ২০২৫

       West Bengal State University                                       BA Honours, 6th Semester                                         SUGGESTION 2025                                                      BNGA,DSE05T( DSE3/4)  • বাংলা কথাসাহিত্যঃ মন্বন্তর, দাঙ্গা ও দেশভাগ• একক-১(২০২১) ক) দেশভাগের ইতিহাসের বাস্তব রূপ বাংলা সাহিত্যে  কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে কয়েকটি উপন্যাস অনুসরণে তার পরিচয় দাও। • ১৯৪৬ দাঙ্গা রাজনীতির ট্রাজেডি বাংলা ছোটগল্পের পরিসরে কিভাবে এসেছে, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি রচনা অবলম্বনে আলোচনা করো। (২০২২) পঞ্চাশের মন্বন্তরের বাস্তব বর্ণনা করে বাংলা উপন্যাসে তার কতটা প্রতিফলন ঘটেছে, সে বিষয়ে আলোকপাত করো। •দেশভাগের ক...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...