পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (WBSU) ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মেজরের পাঠ্যসূচি অনুযায়ী 'গৃহদাহ' উপন্যাসের অন্যতম প্রধান দিক— **অচলার মানসিক দোলাচল এবং সমাজ ও ব্যক্তির সংঘাত** নিয়ে একটি বিস্তারিত নোট নিচে দেওয়া হলো।
## অচলার মানসিক দোলাচল এবং সমাজ ও ব্যক্তির সংঘাত: 'গৃহদাহ'
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'গৃহদাহ' (১৯২০) বাংলা সাহিত্যের এমন একটি উপন্যাস যেখানে সমাজের ধরাবাঁধা নিয়ম এবং ব্যক্তির স্বাধীন প্রবৃত্তি ও কামনার সংঘাত এক তীব্র ট্রাজিক রূপ পেয়েছে। এই উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অচলা— যার চরিত্রটি একই সাথে সমাজ-সংসস্কার এবং ব্যক্তি-হৃদয়ের অস্থির দোলাচলের এক জীবন্ত দর্পণ।
### ১. মানসিক দোলাচলের উৎস
অচলার মানসিক দোলাচল বা অন্তর্দ্বন্দ্বের মূলে রয়েছে দুই বিপরীতধর্মী পুরুষ চরিত্র— মহিম ও সুরেশ। মহিম তার জীবনে স্থিতিশীলতা ও শ্রদ্ধার প্রতীক, আর সুরেশ তার জীবনে উত্তাল আবেগ ও আদিম আকর্ষণের নাম। অচলা মহিমকে ভালোবেসেও সুরেশের অন্ধ আসক্তিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করতে পারেনি। তার এই মানসিক অস্থিরতা শরৎচন্দ্র নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন:
> *"মহিমকে সে ভালোবাসে, কিন্তু সুরেশকেও সে উপেক্ষা করিতে পারে না।"* এই দোটানাই অচলার চরিত্রের মূল মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি। সে যখন মহিমের শান্ত সান্নিধ্যে থাকে, তখন তার অবচেতন মন সুরেশের তীব্র কামনার জন্য তৃষ্ণার্ত হয়; আবার সুরেশের কাছে গিয়ে সে তার হারানো মর্যাদা ও মহিমের পবিত্র স্মৃতি আঁকড়ে ধরতে চায়।
>
### ২. সংস্কার বনাম আধুনিকতার সংঘাত
অচলা ব্রাহ্ম সমাজের উদার ও আধুনিক শিক্ষায় বড় হওয়া এক নারী। কিন্তু সমাজ ও বংশগত সংস্কার তার অবচেতনে কত গভীরে প্রোথিত ছিল, তা বোঝা যায় যখন সে সুরেশের দ্বারা অপহৃতা হয়েও তার প্রতি এক ধরণের আত্মসমর্পণ অনুভব করে। তার আধুনিক মন তাকে স্বাধীন হতে বলে, কিন্তু তার চিরন্তন নারী-সংসস্কার তাকে অপরাধবোধে দগ্ধ করে। তার এই আর্তনাদ উপন্যাসের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে:
> *"আমি অপরাধী হইতে পারি, কিন্তু আমি মিথ্যাচারিণী নই।"*
>
### ৩. সমাজ ও ব্যক্তির সংঘাত
'গৃহদাহ' উপন্যাসে সমাজ কেবল একটি অদৃশ্য শক্তি নয়, বরং তা মৃণাল বা রামবাবুর মতো চরিত্রের মাধ্যমে মূর্ত হয়ে ওঠে। অচলা যখন সুরেশের সঙ্গে ঘর ছাড়ে, তখন সে জানত যে সমাজ তাকে আর কোনোদিন গ্রহণ করবে না। ব্যক্তির সুখ ও কামনার সাথে সমাজের নৈতিকতার যে সংঘাত, তা অচলাকে সমাজচ্যুত ও রিক্ত করেছে। সুরেশের মৃত্যুর পর অচলার অবস্থা ছিল একাকী এবং সমাজবর্জিত। মহিম তাকে ক্ষমা করলেও সমাজ তাকে পুনরায় 'গৃহ' দেয়নি। এই সামাজিক অস্বীকৃতিই অচলার ব্যক্তিসত্তাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
### ৪. নিস্পৃহতা ও প্রবৃত্তি
অচলার ট্রাজেডির জন্য সমাজের পাশাপাশি মহিমের নিস্পৃহতাও দায়ী। সমাজ যেখানে কঠোর নিয়ম চাপিয়ে দেয়, মহিম সেখানে এক অদ্ভুত উদাসীনতা দেখায়। মহিম তাকে কোনোদিন অধিকার দিয়ে আগলে ধরেনি, যা অচলার মতো আবেগপ্রবণ নারীর জন্য ছিল এক ধরণের অবমাননা। অন্যদিকে সুরেশের উন্মত্ত প্রবৃত্তি সমাজকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে অচলাকে হরণ করেছে। এই ব্যক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক শুচিতার লড়াইয়ে অচলা শেষ পর্যন্ত পুড়ে ছাই হয়েছে।
### ৫. গৃহদাহ ও ট্রাজেডির পরিণতি
উপন্যাসের নাম 'গৃহদাহ' কেবল সুরেশের বাড়ি পুড়ে যাওয়া নয়, বরং অচলার অন্তরের শান্তি বা 'গৃহ' পুড়ে যাওয়া। সে না পারল আদর্শ ঘরণী হতে, না পারল প্রেমিক হিসেবে সুরেশের কাছে পূর্ণ তৃপ্তি পেতে। সমাজের চোখে সে কলঙ্কিনী, আর নিজের বিবেকের কাছে সে প্রতারক। তার জীবনের শেষ আর্তি— *"মহিমবাবু, আপনি কি আমাকে একবারও ক্ষমা করতে পারবেন না?"*—প্রমাণ করে যে ব্যক্তির সাময়িক বিচ্যুতি সমাজ ও জীবনের কাছে কতটা চড়া মূল্য দাবি করে।
### উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, অচলা কোনো পাপিষ্ঠা নারী নয়, বরং সে এক রক্ত-মাংসের মানুষ যার জীবনের ট্রাজেডি রচিত হয়েছে সমাজ ও ব্যক্তির চিরন্তন দ্বন্দ্বে। শরৎচন্দ্র এই উপন্যাসে দেখিয়েছেন যে, মানুষের মন সাদা-কালোয় ভাগ করা যায় না; সেখানে ধূসর এলাকা অনেক বেশি। অচলার মানসিক দোলাচল আসলে আমাদের প্রত্যেকের ভেতরের সেই দ্বন্দ্ব, যেখানে সমাজ ও প্রবৃত্তির লড়াই কখনও শেষ হয় না।
**পরীক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ নির্দেশ:**
* **উদ্ধৃতি:** পরীক্ষার খাতায় উদ্ধৃতিগুলো অবশ্যই সিঙ্গেল বা ডবল ইনভার্টেড কমার মধ্যে লিখবেন।
* **বিবর্তন:** উত্তরের মাঝে দেখাবেন কীভাবে অচলা আধুনিকতা থেকে সংশয়ের দিকে এবং শেষ পর্যন্ত রিক্ততার দিকে এগিয়ে গেছে।
* **মৃণাল প্রসঙ্গ:** সমাজ ও ব্যক্তির সংঘাত বোঝাতে মৃণাল চরিত্রটি যে সমাজের 'আদর্শ' রূপ, তা এক লাইনে উল্লেখ করতে পারেন।
এই নোটটি আপনার পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত হবে বলে আশা করি। অন্য কোনো আলোচনার প্রয়োজন হলে জানাতে পারেন।
Comments
Post a Comment