'মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস হিসেবে গৃহদাহ-এর সার্থকতা' আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মেজর।DS-13
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'গৃহদাহ' (১৯২০) একটি মাইলফলক। সাধারণত শরৎচন্দ্রকে সমাজসচেতন এবং ভাবালুতা-প্রধান লেখক হিসেবে গণ্য করা হলেও, 'গৃহদাহ' উপন্যাসে তিনি মানুষের অন্তরমহলের এমন এক জটিল ও নিগূঢ় রহস্যের উন্মোচন করেছেন, যা একে একটি সার্থক মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসে উন্নীত করেছে।আর সেখানে আমরা দেখি-
•একটি মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে বাইরের ঘটনার চেয়ে চরিত্রের অভ্যন্তরীণ ঘাত-প্রতিঘাত ও মানসিক বিশ্লেষণ বেশি গুরুত্ব পায় অর্থাৎ বহির্ঘটনার চেয়ে অন্তর্ঘাতকে প্রাধান্য। 'গৃহদাহ'-এ মহিম-অচলা-সুরেশের ত্রিভুজ প্রেমের যে কাহিনী বর্ণিত হয়েছে, তার মূল চালিকাশক্তি হলো চরিত্রগুলোর অবচেতন মনের জটিলতা। বিশেষ করে অচলার মনের দোলাচল এবং সুরেশের উগ্র কামনার মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ উপন্যাসটিকে গভীরতা দিয়েছে।যেখানে-
•অচলা চরিত্রটি এই উপন্যাসের মনস্তাত্ত্বিক কেন্দ্রবিন্দু অর্থাৎ অচলার দ্বিধাগ্রস্ত মনস্তত্ত্ব তুলে ধরা হয়েছে। সে ব্রাহ্ম সমাজের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও তার রক্তের গভীরে কাজ করেছে হিন্দুত্বের প্রাচীন সংস্কার। মহিমের স্থিরতা ও সুরেশের অস্থিরতা-এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে অচলার চিত্ত সর্বদা দোদুল্যমান। শরৎচন্দ্র তার এই অন্তর্দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তুলতে লিখেছেন-
"মহিমকে সে ভালোবাসে, কিন্তু সুরেশকেও সে উপেক্ষা করিতে পারে না।"
এই যে একই সময়ে দুই পুরুষের প্রতি আকর্ষণ ও বিকর্ষণ, এটি কোনো চারিত্রিক দোষ নয়, বরং এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক সংকট।আবার এরই পাশাপাশি-
সুরেশ চরিত্রটির মাধ্যমে লেখক অবদমিত কামনা ও অধিকারবোধের মনস্তত্ত্ব দেখিয়েছেন। সুরেশ জানে অচলা মহিমের বাগদত্তা বা স্ত্রী, তবুও তার অবচেতন মন অচলাকে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল। তার এই উন্মাদনা আসলে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতি বা 'Obsession'। সুরেশ নিজেই তার এই মানসিক যন্ত্রণার কথা ব্যক্ত করেছে:
"তোকে ঘৃণা করি মহিম, কিন্তু তোকে ছেড়ে থাকতেও পারি না।"
বন্ধুর প্রতি ঈর্ষা এবং প্রেমিকার প্রতি লোলুপতার এই সংঘাত সুরেশকে এক ট্রাজিক চরিত্রে পরিণত করেছে।
•মহিমের অতিরিক্ত আত্মসংযম ও নিস্পৃহতাও মনস্তাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মহিম পাথর-প্রতিম স্থিরতা দিয়ে অচলাকে জয় করতে চেয়েছিল, কিন্তু একজন নারীর রক্ত-মাংসের আবেগ যে অনেক সময় সামান্য একটু অধিকারবোধ বা শাসন চায়, মহিম তা বুঝতে পারেনি। মহিমের এই নীরবতা অচলার মনের অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
•উপন্যাসের নামকরণ 'গৃহদাহ' অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে 'গৃহ' কেবল ইটের দালান নয়, বরং তা মানুষের মনের শান্তি ও আশ্রয়ের প্রতীক। অচলার মনে প্রতিনিয়ত যে দ্বন্দ্ব চলেছে, তাই আসলে তার অন্তরের গৃহকে দগ্ধ করেছে। শরৎচন্দ্র দেখিয়েছেন যে, বাইরের কোনো আগুন নয়, বরং মনের সূক্ষ্ম বাসনা ও সংস্কারের সংঘাতই মানুষের সাজানো জীবন ছারখার করে দিতে পারে। অচলার উপলব্ধি-
"আমি অপরাধী হইতে পারি, কিন্তু আমি মিথ্যাচারিণী নই।"
মৃণাল চরিত্রটি এখানে একটি স্থিরবিন্দু বা 'Reference Point' হিসেবে কাজ করে। অচলার অস্থির মনের পাশে মৃণালের সুস্থির ও শান্ত মনস্তত্ত্ব উপন্যাসের মনস্তাত্ত্বিক দিকটিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। মৃণালের সহজ বিশ্বাস ও অচলার জটিল সংশয়-এই দুইয়ের তুলনামূলক আলোচনা উপন্যাসের মূল ভাববস্তুকে সার্থক করেছে।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, 'গৃহদাহ' উপন্যাসে শরৎচন্দ্র প্রথাগত নীতিবাদের চেয়ে মানবিক প্রবৃত্তিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। চরিত্রের অবচেতন মনের কামনা, বাসনা, ঈর্ষা এবং সংস্কারের এমন নিপুণ ব্যবচ্ছেদ বাংলা সাহিত্যে বিরল। কেবল কাহিনী বর্ণনায় নয়, বরং মানুষের মনের গহন অন্ধকারের রহস্য উন্মোচনে 'গৃহদাহ' একটি সার্থক ও কালোত্তীর্ণ মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা, সাজেশন, টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং Shesher Kabita Sundorbon YouTube channel SAMARESH sir ❤️
Comments
Post a Comment