পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (WBSU) ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মেজরের ছাত্রছাত্রীদের উপযোগী করে **অচলা ও মৃণাল** চরিত্রের বৈপরীত্য এবং উপন্যাসের কাহিনী বিন্যাসে মৃণালের ভূমিকা আরও বিস্তারিতভাবে ও পর্যাপ্ত উদ্ধৃতিসহ নিচে দেওয়া হলো।
## অচলা ও মৃণাল: চারিত্রিক বৈপরীত্য ও ট্রাজেডির গভীরতা
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'গৃহদাহ' উপন্যাসে অচলা যদি হয় ঝোড়ো হাওয়ায় দোদুল্যমান এক লতা, তবে মৃণাল হলো গভীর মূলবিশিষ্ট এক মহীরুহ। এই দুটি চরিত্রের বৈপরীত্য কেবল ব্যক্তিগত রুচির পার্থক্য নয়, বরং তা দুটি ভিন্ন জীবনদর্শন ও সমাজ-চেতনার সংঘাত। অচলার অস্থিরতা ও ট্রাজেডিকে পূর্ণরূপে ফুটিয়ে তুলতে মৃণাল চরিত্রটি একটি 'ক্যাটালিস্ট' বা অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
### ১. সংশয় বনাম বিশ্বাস
অচলার চরিত্রে সবচেয়ে বড় সংকট হলো তার সংশয়বাদী মন। ব্রাহ্ম সমাজের আধুনিক আলোকপ্রাপ্তা হয়েও সে কোনো ধ্রুব আদর্শকে আঁকড়ে ধরতে পারেনি। মহিমের প্রতি ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও সুরেশের উগ্র কামনার কাছে সে বারবার দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছে। তার এই সংশয় ফুটে ওঠে যখন সে বলে:
> *"মহিমকে সে ভালোবাসে, কিন্তু সুরেশকেও সে উপেক্ষা করিতে পারে না।"*
>
অন্যদিকে মৃণাল চরিত্রের মূল শক্তি হলো তার অবিচল বিশ্বাস। সে বৈধব্যের কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্যেও এক শান্ত, অবিচলিত সত্তা। তার জীবনদর্শন অত্যন্ত স্পষ্ট, যেখানে সংশয়ের কোনো স্থান নেই। মৃণাল জানে সে কাকে চায় এবং তার আদর্শ কী।
### ২. আধুনিকতা বনাম ঐতিহ্য
অচলা চরিত্রে আধুনিক শিক্ষা ও আভিজাত্য থাকলেও তার মধ্যে এক ধরণের অহংকার ও অস্থিরতা কাজ করে। সে সংস্কারমুক্ত হতে চেয়েও শেষ পর্যন্ত সংস্কারের জালেই জড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে, মৃণাল গ্রাম্য পরিবেশে বড় হওয়া এক সাধারণ নারী। কিন্তু তার চারিত্রিক দৃঢ়তা আধুনিক শিক্ষিতা অচলাকেও ম্লান করে দেয়। অচলা যখন মৃণালকে প্রথম দেখে, তখন তার মনে হয়েছিল—
> *"মৃণালের এই শান্ত অচপল মূর্তিটি যেন তপোবনের কোনো এক ঋষিকন্যার মতো।"*
>
মৃণালের এই ঐতিহ্যমণ্ডিত ধৈর্য অচলার জীবনের 'গৃহদাহ' বা মানসিক দহনকে আরও স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে।
### ৩. প্রেমের সংজ্ঞায় পার্থক্য
অচলার প্রেম হলো এক ধরণের জৈবিক ও মানসিক আকর্ষণ, যা অধিকারবোধে মত্ত। কিন্তু মৃণালের প্রেম হলো নিষ্কাম সেবা। মৃণাল মহিমকে ভালোবাসলেও তার মধ্যে পাওয়ার কোনো বাসনা ছিল না। সে প্রেমের চেয়ে 'কর্তব্য' ও 'সেবা'কে বড় করে দেখেছে। অচলা যখন সুরেশের হরণক্রিয়ায় কলঙ্কিত বোধ করে নিজেকে গুটিয়ে নেয়, মৃণাল তখন সমাজ ও সংস্কারের ঊর্ধ্বে উঠে মহিমের সেবা করে যায়। মৃণাল স্পষ্টভাবে বলেছে:
> *"সংসারের সকল দুঃখই কি কেবল নিজের জন্য? পরের জন্য কাঁদার মধ্যেও যে বড় সুখ আছে দিদি!"*
>
এই জীবনবোধ অচলার আত্মকেন্দ্রিক প্রেমের সম্পূর্ণ বিপরীত।
### ৪. কাহিনী বিন্যাসে মৃণালের সার্থকতা
উপন্যাসের কাহিনী যখনই জটিল দিকে মোড় নিয়েছে, মৃণাল তখনই সেখানে এক সুস্থির সমাধান হিসেবে উপস্থিত হয়েছে।
* **মহিমের আশ্রয়:** মহিম যখন অসুস্থ বা যখন সে অচলার বিশ্বাসঘাতকতায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, তখন মৃণালই তাকে মানসিক শক্তি ও সেবা দিয়ে আগলে রাখে।
* **অচলার দর্পণ:** মৃণাল হলো অচলার সামনে এক স্বচ্ছ আয়না। মৃণালকে দেখলেই অচলা নিজের ক্ষুদ্রতা ও হীনম্মন্যতা অনুভব করে। মৃণাল যখন অচলাকে বলে— *"দিদি, যার মন পরিষ্কার তার আবার ভয় কিসের?"*—তখন অচলার অন্তরের কলঙ্কিত রূপটি পাঠকদের কাছে আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
### ৫. ট্রাজেডির পরিণতিতে বৈপরীত্য
উপন্যাসের শেষে আমরা দেখি অচলা রিক্ত, নিঃস্ব এবং সমাজচ্যুত। তার 'গৃহ' পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কিন্তু মৃণাল সব হারিয়েও হারায়নি। তার চরিত্রে এক ধরণের আধ্যাত্মিক জয় লক্ষ্য করা যায়। শরৎচন্দ্র দেখাতে চেয়েছেন যে, কেবল আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়াই বড় কথা নয়, মনের দৃঢ়তা ও চারিত্রিক সততা না থাকলে জীবন কীভাবে ট্রাজেডিতে পর্যবসিত হয়।
### উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, মৃণাল চরিত্রটি না থাকলে অচলার চরিত্রের ট্রাজেডি কেবল একটি পরকীয়া বা হরণক্রিয়ার গল্পে সীমাবদ্ধ থাকত। মৃণালের উপস্থিতিই অচলার দহনকে 'গৃহদাহ'-এর মর্যাদায় উন্নীত করেছে। মৃণাল হলো সেই আদর্শ, যার বিপরীতে দাঁড়ালে অচলার ব্যর্থতাগুলো আরও গভীর ও বেদনাদায়ক মনে হয়। শরৎচন্দ্র এই বৈপরীত্যের মাধ্যমেই দেখিয়েছেন—
> *"নারী হৃদয়ের রহস্য কেবল শিক্ষায় নয়, তার চরিত্রে ও সংস্কারে নিহিত।"*
>
**পরীক্ষার জন্য বিশেষ নির্দেশিকা:**
১. উত্তরটি লেখার সময় **অচলা ও মৃণাল** শব্দ দুটি হাইলাইট করবেন।
২. উদ্ধৃতিগুলো অন্য রঙের কালিতে (কালো বা নীল) লিখলে ভালো নম্বর পাওয়া যাবে।
৩. পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে মৃণাল চরিত্রটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই 'বিমলা' নয়, **মৃণাল** নামেই উত্তরটি সম্পূর্ণ করবেন।
আপনার পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য আরও কোনো প্রশ্ন বা সাজেশন প্রয়োজন হলে নির্দ্বিধায় জিজ্ঞাসা করুন।
Comments
Post a Comment