চঞ্চলা কবিতাটিতে গতি চেতনার অভিব্যক্তি কিভাবে কাব্যরূপ লাভ করেছে-আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,'চঞ্চলা' কবিতায় গতিচেতনার অভিব্যক্তি প্রতি ছাত্র-ছত্রে প্রকাশিত। আর সেখানে আমরা দেখতে পাই-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গতিচেতনা তাঁর সৃষ্টির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। 'চঞ্চলা' কবিতায় তিনি বিশ্বচরাচরের পরিবর্তনশীলতা ও চলমানতাকে কেবল বর্ণনা করেননি, বরং তাকে এক আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। নিচে এর বিস্তারিত দিকগুলো আলোচনা করা হলো-
গতিই প্রকৃতির ধর্ম।রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন যে, বিশ্বজগত স্থবির বা মৃত নয়। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানে এক অমোঘ ছন্দময় গতি আছে। 'চঞ্চলা' কবিতায় তিনি এই গতিকে একটি নারীরূপ বা জীবন্ত সত্তা হিসেবে কল্পনা করেছেন। ফুল ফোটা, বাতাসের বয়ে যাওয়া, নদীর প্রবাহ—সবই এক অদৃশ্য গতির অংশ। কবি চঞ্চলাকে এই গতির মূর্ত প্রতীক মনে করেন। আর সেখানে এ কবি কে বলতে শোনা যায়-
"তোমার গতির ছন্দে বিশ্ব কাঁপে থরোথরো,/যেথা তুমি যাও, সেই পথ হয় সুন্দর।"
গতি ও সৌন্দর্যের মিথস্ক্রিয়া এ কবিতার প্রাণ।সাধারণত স্থিরতাকেই আমরা সুন্দরের আধার মনে করি, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মতে, স্থবিরতা সৌন্দর্যকে মলিন করে দেয়। গতি যখন কোনো বস্তুকে স্পর্শ করে, তখনই সেখানে নবীনতা ও লাবণ্য সৃষ্টি হয়। চঞ্চলার চঞ্চলতা বা অস্থিরতা কোনো বিশৃঙ্খলা নয়, বরং তা সৃজনশীলতার আধার। যে পথে সে পদচারণা করে, সেখানেই নতুন নতুন রূপ ও রঙের প্রকাশ ঘটে। এই গতির মাধ্যমেই জগত প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন করে সাজায়। আর সেখানে আমাদের-
অসীমের সন্ধানে সসীম হতে মুক্তি।রবীন্দ্রনাথের গতিচেতনার মূল লক্ষ্য হলো 'অসীমের সন্ধান'। মানুষের জীবন ছোট, কিন্তু তার আকাঙ্ক্ষা অসীম। 'চঞ্চলা' কবিতার মাধ্যমে কবি দেখিয়েছেন যে, স্থবির হয়ে বসে থাকলে মানুষ তার সীমাবদ্ধতাকে জয় করতে পারে না।চঞ্চলার কোনো কূল-কিনারা নেই, কোনো নির্দিষ্ট সীমানা নেই। সে অসীমের পথ ধরে ছুটে চলে। কবি এই অসীমের তৃষ্ণাকেই নিজের জীবনের পাথেয় করেছেন। আর সেখানে এ কবির-
"নাই কোনো পিছুটান, নাই কোনো ভয়—
শুধু অজানার অভিসারে চলা, এ-ই তো পরিচয়।"
জড়তা বা স্থবিরতার বিরোধিতা।কবি এই কবিতায় জড়তাকে এক ধরণের 'মৃত্যু' বা 'কারাগার' বলে চিহ্নিত করেছেন। যারা গতির সাথে তাল মেলাতে পারে না, তারা জীবনকে উপভোগ করতে ব্যর্থ হয়।আসলে, কবি চঞ্চলার মাধ্যমে পাঠককে আহ্বান জানিয়েছেন বদ্ধ জলাশয়ের মতো এক জায়গায় আটকে না থেকে প্রবহমান নদীর মতো বেরিয়ে আসতে। গতির মধ্যেই জীবনের সার্থকতা-এই দার্শনিক সত্যটিই এখানে মুখ্য।শুধু তাই নয়, এ কবিতায় আছে-
ছন্দ ও আঙ্গিকের গতিময়তা।এই কবিতার গঠনশৈলীও কবির গতিচেতনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কবিতার পঙক্তিগুলোর বিন্যাস, শব্দের ঝংকার এবং ছন্দের দ্রুতলয়—সবই পাঠককে এক ধরণের গতির অনুভূতি দেয়। পড়ার সময় মনে হয়, যেন একটি দ্রুতগামী জলধারা আমাদের সামনে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,রবীন্দ্রনাথের গতিচেতনা তাঁর রোমান্টিক দর্শনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।যেখানে গতি এখানে 'সৃষ্টি', 'সৌন্দর্য' এবং 'মুক্তি'র নামান্তর।কালিদাসের মেঘদূতের সাথে তুলনা:** যদিও 'মেঘদূত' কবিতায় বিরহ ও দূরত্বের কথা ছিল, 'চঞ্চলা' কবিতায় সেই গতির সাথে আনন্দ ও মুক্তির যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছে।যেখানে জীবনের স্থবিরতাকে জয় করাই হলো 'চঞ্চলা'র মূল বার্তা।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং "Shesher Kabita Sundorbon" YouTube channel SAMARESH Sir
Comments
Post a Comment