গৌতম বুদ্ধের অষ্টাঙ্গিক মার্গ ব্যাখ্যা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার দর্শন মাইনর)।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,বৌদ্ধ দর্শনে গৌতম বুদ্ধের 'অষ্টাঙ্গিক মার্গ' হলো দুঃখ নিরোধের (নির্বাণ) পথ, যা চারটি আর্য সত্যের চতুর্থ সত্য। এটি মধ্যম পন্থা নামেও পরিচিত। শুধু তাই নয়,এটি চরম ভোগবিলাস এবং কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্যবর্তী একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনধারার নির্দেশ দেয়।আর বৌদ্ধ দর্শনে সেই আটটি মার্গ হলো-
•১)সম্যক দৃষ্টিঃ সম্যক দৃষ্টির অর্থ হলো-সঠিক জ্ঞান বা প্রজ্ঞা। আর সেখানে চারটি আর্য সত্য (দুঃখ, দুঃখের কারণ, দুঃখের নিরোধ, দুঃখ নিরোধের মার্গ) সম্পর্কে সুস্পষ্ট এবং সঠিক উপলব্ধি থাকা। জগৎ ও জীবন সম্পর্কে কুসংস্কারমুক্ত, বাস্তবসম্মত ও গভীর অন্তর্দৃষ্টি থাকা।
•২)সম্যক সঙ্কল্পঃসঠিক চিন্তা বা উদ্দেশ্য। এর অর্থ হলো মনকে লোভ, ঘৃণা এবং হিংসা থেকে মুক্ত রাখা। অহিংসা, প্রেম-মৈত্রী, করুণা এবং অপরের কল্যাণের প্রতি দৃঢ় সংকল্প পোষণ করা। ত্যাগ ও পরোপকারের মনোভাব থাকা।
•৫)সম্যক বাক্যঃসঠিক কথা। এর অর্থ হলো মিথ্যা কথা না বলা, কঠোর বা কর্কশ বাক্য পরিহার করা, পরনিন্দা না করা এবং অপ্রয়োজনীয় বা অর্থহীন কথা না বলা। এর পরিবর্তে সত্য, প্রীতিপূর্ণ, উপকারী এবং সময়োপযোগী কথা বলা।
•৫) সম্যক কর্মান্তঃ সঠিক কাজ। এর অর্থ হলো নৈতিক ও সৎ কর্ম সম্পাদন করা। হত্যা, চুরি, ব্যভিচার বা কোনো ধরনের অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থাকা। অপরের প্রতি সহানুভূতি ও সাহায্যকারী হওয়া।
•৫)সম্যক আজীবঃ সঠিক জীবিকা। এর অর্থ হলো এমন পেশা বা জীবিকা বেছে নেওয়া যা কোনো জীব বা অপরের ক্ষতি করে না। সৎ ও ন্যায়সঙ্গত উপায়ে জীবিকা নির্বাহ করা। মাদকদ্রব্য, অস্ত্র, বিষ বা জীবন্ত প্রাণী কেনাবেচার মতো ক্ষতিকারক ব্যবসা থেকে বিরত থাকা।
•৬)সম্যক ব্যায়ামঃসঠিক প্রচেষ্টা বা উদ্যম। এর অর্থ হলো সৎ চিন্তা ও কর্মকে অনুশীলন করা এবং খারাপ চিন্তা ও কর্মকে দমন করার জন্য অবিরাম প্রচেষ্টা চালানো। মনকে উন্নত করার জন্য নিরন্তর সচেষ্ট থাকা।
•৭)সম্যক স্মৃতিঃসঠিক স্মৃতি বা সচেতনতা। এর অর্থ হলো মনকে বর্তমান মুহূর্তে কেন্দ্রীভূত করে আত্ম-সচেতন থাকা। শরীরের গতিবিধি, অনুভূতি, চিন্তা এবং পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কে সতর্ক ও সচেতন থাকা। নিজের প্রতিটি কাজ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
•৮)সম্যক সমাধিঃসঠিক একাগ্রতা বা ধ্যান। এর অর্থ হলো ধ্যানের মাধ্যমে মনকে একাগ্র ও শান্ত করা। মনকে বিক্ষিপ্ততা থেকে মুক্ত করে এক বিষয়ে দীর্ঘক্ষণ স্থির রাখা, যা নির্বাণ লাভের জন্য অপরিহার্য। এটি গভীর মানসিক শান্তি ও প্রজ্ঞার দিকে পরিচালিত করে।
•পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,এই আটটি মার্গ পরস্পর নির্ভরশীল এবং একে অপরের পরিপূরক।আর এই পথগুলি অনুসরণ করার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি আত্ম-শুদ্ধি অর্জন করতে পারে এবং দুঃখের চক্র থেকে মুক্তি পেয়ে নির্বাণ লাভ করা সম্ভব।
Comments
Post a Comment