Skip to main content

স্ত্রীর পত্র গল্পে(4th.Sem BNGA) মৃণালের কণ্ঠে যে প্রতিবাদের সুর ধ্বনিত হয়েছে তা আলোচনা করো।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'স্ত্রীর পত্র' গল্পে মৃণালের কণ্ঠে যে প্রতিবাদের সুর ধ্বনিত হয়েছে, তা আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, চতুর্থ সেমিস্টার, বাংলা মেজর)।

            •আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'স্ত্রীর পত্র' গল্পটি মূলত মৃণালের আত্মপ্রকাশ এবং তার প্রতিবাদী সত্তার উন্মোচন ঘটেছে। আর সেখানে আমরা দেখি, পিত্রালয়ে লেখা একটি পত্রের ছত্রে ছত্রে মৃণালের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, যন্ত্রণা এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতি এক তীব্র প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছে।তাই-

           মৃণালের প্রতিবাদ শুধুমাত্র ব্যক্তিগত মুক্তি নয়, বরং বলা যেতে পারে যে,সামগ্রিকভাবে নারীর অধিকার ও আত্মমর্যাদার প্রতিষ্ঠার দাবি। মৃণালের সেই অধিকার প্রতিষ্ঠায় গল্পের শুরুতেই আমরা দেখি যে-

               প্রথমেই আমরা জানতে পারি যে,মৃণালের প্রতিবাদ তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অভাবকে কেন্দ্র করে। তাই মৃণাল জানায়-                                                                      "আমার স্থান ছিল ভাঁড়ার ঘরের এক কোণে।" অর্থাৎ, স্ত্রীরূপে তার পরিচয় বা অস্তিত্ব ছিল শুধুমাত্র গৃহস্থালীর চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তার নিজস্ব বুদ্ধি, মেধা বা অনুভূতি কোনো কিছুকেই মূল্য দেওয়া হয়নি।এই বন্ধন থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষাই তার প্রতিবাদের প্রথম ধাপ। অতঃপর-

        •দ্বিতীয় ধাপে আমরা দেখি যে,মৃণালের প্রতিবাদ পুত্র সন্তানের প্রতি শ্বশুরবাড়ির অন্ধ মোহ এবং কন্যাসন্তান অবজ্ঞার বিরুদ্ধে। যখন তার ছোট ভাই বিন্দুর প্রতি অন্যায় এবং অত্যাচার করা হয়, তখন মৃণাল তার শ্বশুরবাড়ির এই অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।আসলে-

             • বিন্দুর মতো একটি অসহায় মেয়ের প্রতি সমাজের নিদারুণ উদাসীনতা এবং নিষ্ঠুরতা তাকে ব্যথিত করে তোলে। বিন্দুর আত্মহত্যা মৃণালের ভেতরের সুপ্ত প্রতিবাদের আগুনকে আরও তীব্র করে তোলে। সে উপলব্ধি করে, নারীর জীবনের মূল্য সমাজে কত তুচ্ছ। আর সেই তুচ্ছতার কারণে-

         •তৃতীয় ধাপে সেই পত্রে মৃণাল প্রচলিত ধর্মীয় ও সামাজিক গোঁড়ামির বিরুদ্ধে সরব। সে জানায়-

          "আমি তোমাদের ধর্ম মানি না।"

       ৎযে ধর্ম নারীকে কেবল গৃহবন্দী করে রাখে, তার সত্তাকে অস্বীকার করে, সেই ধর্মকে সে অস্বীকার করে। এই উক্তি তার মুক্তচিন্তার পরিচয় এবং ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাসের প্রতি তার ধিক্কার প্রকাশ করে।তার এই ধিক্কারে-

        •চতুর্থ ধাপে আমরা দেখি যে, মৃণালের প্রতিবাদ নিজের আত্মমর্যাদা এবং স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠার জন্য। দীর্ঘ বাইশ বছর ধরে সে ছিল-                                                                "একটু হাসলে দোষ, একটু কাঁদলে দোষ, একটু নিজের মতে চললে দোষ"। এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেয়ে সে নতুন করে নিজেকে চিনতে চায়। সে লেখে-                                                                        "আমি বাঁচতে চাই।"                                    এই বাঁচতে চাওয়ার অর্থ শুধুমাত্র শারীরিক অস্তিত্ব নয়, বরং আত্মিক স্বাধীনতা এবং আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা।

          •পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, 'স্ত্রীর পত্র' গল্পে মৃণালের কন্ঠে ধ্বনিত প্রতিবাদ শুধুমাত্র তার ব্যক্তিগত হতাশার প্রকাশ নয়। এটি ১৯ শতকের শেষ এবং ২০ শতকের প্রথম দিকের ভারতীয় সমাজে নারীর অবস্থান, তার উপর চাপানো সামাজিক বিধিনিষেধ এবং আত্মমর্যাদার জন্য তার সংগ্রামের এক উজ্জ্বল দলিল। তাই-

            মৃণাল পিত্রালয়ে ফিরে গিয়ে কেবল শারীরিক মুক্তি লাভ করেনি, বরং মানসিক এবং আত্মিক মুক্তিও অর্জন করেছে, যা তাকে এক স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে। তার এই চিঠি তাই যুগ যুগ ধরে নারীদের প্রতিবাদের এক প্রতীক হয়ে রয়েছে।

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...