আবার আসিব ফিরে কবিতায় কবির ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা যেভাবে কাব্যরূপ লাভ করেছে-আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর)।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,জীবনানন্দ দাশের 'আবার আসিব ফিরে' কবিতাটি মূলত কবির এক গভীর প্রত্যাবর্তনের আকুতি, যা বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদানের মধ্য দিয়ে কাব্যরূপ লাভ করেছে। এখানে কবি শুধু মানুষ হিসেবে ফিরে আসার কথা বলেননি, বরং বাংলার প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে বিভিন্ন রূপে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন।আর সেই প্রকাশে আমরা দেখতে পাই-
প্রাকৃতিক রূপে একাত্মতাঃকবিতার মূল বিষয় হলো প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানের মধ্য দিয়ে ফিরে আসা। কবি ঘোষণা করেন যে তিনি ধানসিঁড়ি নদীর তীরে ফিরে আসবেন, হতে পারেন শঙ্খচিল বা শালিখ। এই রূপকে তিনি বেছে নিয়েছেন কারণ এই পাখিগুলো বাংলার প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি হয়তো ভোরের কাক হয়ে কাঁঠালপাতার গন্ধ অনুভব করবেন, বা হয়তো হাঁস হয়ে সারাদিন জলের গন্ধমাখা দেশে ভেসে বেড়াবেন। এই রূপান্তরের মধ্য দিয়ে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে তার আত্মা বাংলার প্রকৃতিতে মিশে আছে এবং তার ফিরে আসা কোনো মানুষের মতো নয়, বরং প্রকৃতিরই একটি অংশ হিসেবে।আর সেখানে আছে-
গ্রামবাংলার চিরায়ত চিত্রঃকবিতায় কবি যে চিত্রগুলো এঁকেছেন, সেগুলো গ্রামবাংলার খুবই পরিচিত ও চিরন্তন দৃশ্য। যেমন - ধানসিঁড়ি নদীর তীর, লক্ষ্মীপেঁচা, ডিঙি নৌকো, কিশোর, রূপসার ঘোলা জল, নরম ধান, প্রভৃতি। এই চিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে কবি তার ফিরে আসার আকুতিকে আরও বাস্তব ও জীবন্ত করে তুলেছেন। তিনি শুধু ফিরে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেননি, বরং কোথায় এবং কী রূপে ফিরে আসবেন, তার একটি স্পষ্ট চিত্র এঁকেছেন। এই চিত্রগুলো পাঠকের মনে এক গভীর আবেদন সৃষ্টি করে।যে আবেদনে আমরা পাই কবির-
মৃত্যুভয়হীন চিরন্তনতাঃকবিতাটিতে মৃত্যুর কোনো ভয় নেই, বরং রয়েছে এক ধরনের চিরন্তনতার আশ্বাস। কবি যেন বলতে চান যে, শরীর শেষ হয়ে গেলেও তার আত্মা এই বাংলার মাটিতে, এই প্রকৃতির মধ্যে চিরকাল থেকে যাবে। তার ফিরে আসাটা মৃত্যু পরবর্তী জীবনের এক কাব্যিক প্রকাশ। তিনি মৃত্যুকে জীবনের শেষ বলে মনে করেন না, বরং মনে করেন যে মৃত্যু তার আত্মাকে কেবল একটি রূপ থেকে অন্য রূপে স্থানান্তর করবে, যার মধ্য দিয়ে তিনি আবার এই বাংলায় ফিরে আসবেন। এই ধারণাটিই কবিতাটিকে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছে।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,'আবার আসিব ফিরে' কবিতায় কবির ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা কোনো সাধারণ মানবীয় ইচ্ছা নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে গভীর একাত্মতা, গ্রামবাংলার চিরায়ত চিত্র এবং মৃত্যুভয়হীন চিরন্তনতার মাধ্যমে এক কাব্যিক রূপ লাভ করেছে। এটি শুধু একটি কবিতা নয়, বরং কবির এক গভীর প্রেম এবং বাংলার প্রকৃতির প্রতি তার অচ্ছেদ্য বন্ধনের কাব্যিক দলিল হিসেবে বিবেচিত।
Comments
Post a Comment