প্রতিহিংসায় জর্জরিত হয়ে মানুষ কতটা হিংস্র ও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে শজারুর কাঁটা উপন্যাসের কাহিনী অনুসরণে তা আলোচনা করো।
প্রতিহিংসায় জর্জরিত হয়ে মানুষ কতটা হিংস্র ও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে 'শজারুর কাঁটা' উপন্যাসের কাহিনী অনুসরণে তা আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, চতুর্থ সেমিস্টার, বাংলা মাইনর)
•আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত গোয়েন্দা উপন্যাস ‘শজারুর কাঁটা’।আর এই উপন্যাসটি কেবল একটি রহস্য-রোমাঞ্চ গল্প নয়, এটি প্রতিশোধের বিষে জর্জরিত মানব চরিত্রের এক ভয়াবহ রূপও তুলে ধরেছে। যেখানে উপন্যাসের মূল চরিত্র, বিখ্যাত গোয়েন্দা ব্যোমকেশ বক্সী। যিনি একটি আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ খুনের মামলার তদন্ত করতে গিয়ে এমন এক ভয়ংকর সত্যের মুখোমুখি হন যে,যেখানে মানুষ তার স্বাভাবিক সত্তা হারিয়ে শজারুর মতো হিংস্র ও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।আর সেখানে আমরা দেখি-
উপন্যাসের মূল রহস্যটি দুটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়- যার একটি হল খুন এবং অপরটি হল প্রতিশোধ। তবে ঘটনাচক্রে দেখা যায় যে,আপাত নিরীহ ও সাধারণ মানুষ, যাদের জীবন সাধারণ বলে মনে হয়, তারাও গভীর বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসার আগুনে পুড়ে কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে।আসলে এখানে মানুষ তার স্বাভাবিক সহানুভূতি, ভালোবাসা এবং বিবেকবোধকে বিসর্জন দিয়ে এক ভয়ানক প্রতিশোধের খেলায় মেতে ওঠে। তাই-
উপন্যাসের মূল চরিত্রটির নাম জানা যায় অনেকটা পরে। তবে সেই চরিত্রটি আপাতদৃষ্টিতে শান্ত ও শিক্ষিত মানুষ। কিন্তু তার জীবনের একটি ভয়ানক ঘটনা তাকে প্রতিশোধের পথে ঠেলে দেয়। তার স্ত্রীর সঙ্গে যে অন্যায় হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে তিনি কোনো আইনি প্রতিকার পাননি। সমাজ ও আইন যখন তাকে কোনো ন্যায় দিতে পারেনি, তখন তিনি নিজেই আইন তুলে নেন হাতে।আর এই অসহায়তা থেকে জন্ম নেয় এক তীব্র ঘৃণা। যে ঘৃণা তাকে একের পর এক খুনের পরিকল্পনা করতে বাধ্য করে। তবে-
শজারুর কাঁটা উপন্যাসে আমরা দেখতে পাই যে, অপরাধী এতটাই সুচতুর যে সে প্রতিশোধের জন্য বেছে নেয় একটি প্রতীকী পদ্ধতি। সে তার শিকারদের, শয়তানদের এমনভাবে খুন করে, যা শজারুর কাঁটার মতো কষ্টদায়ক এবং ধীরগতিসম্পন্ন। এই পদ্ধতি কেবল খুন নয়, এটি তার গভীর ঘৃণা ও মানসিক বিকৃতিরই প্রতিফলন বলা যায়। আসলে এটি কেবল শজারুর কাঁটার মতো বাহ্যিক আঘাত নয়, বরং এক গভীর মানসিক ক্ষত, যা তার শিকারদের ধীরে ধীরে শেষ করে দেয়।আর সেখানে-
ঔপন্যাসিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় এই উপন্যাসে দেখিয়েছেন যে, প্রতিশোধের নেশা মানুষকে তার মানবিক গুণাবলী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। শুধু তাই নয়,একজন সাধারণ মানুষ কীভাবে ধাপে ধাপে একজন ভয়ংকর খুনী হয়ে ওঠতে পারে, সেই মানসিক বিবর্তনটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। তবে উপন্যাসের শেষে যখন ব্যোমকেশ অপরাধীর পরিচয় প্রকাশ করেন, তখন দেখা যায় যে, তার অপরাধের মূল কারণ ব্যক্তিগত যন্ত্রণা এবং ন্যায়বিচার না পাওয়ার তীব্র ক্ষোভ। তবে এই ক্ষোভই তাকে এই সমাজ একজন নৃশংস খুনী হিসেবে রূপান্তরিত করে।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,‘শজারুর কাঁটা’ শুধুমাত্র একটি গোয়েন্দা গল্প নয়, আসলে এটি একটি প্রতিশোধের এক করুণ চিত্র। আর এটি প্রমাণ করে যে, যখন সমাজ ও আইনের ওপর মানুষের বিশ্বাস ভেঙে যায়, তখন মানুষ নিজের হাতে বিচার তুলে নিতে দ্বিধা করে না।এই প্রতিশোধের খেলায় মানুষ এক ভয়ংকর শজারুর মতো হয়ে ওঠে। আর তখন শজারুর প্রতিটা কাঁটা আঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকে। তাই আমরা বলতে পারি যে, শজারুর কাঁটা উপন্যাসের মাধ্যমে লেখক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় মানব চরিত্রের এক অন্ধকার দিকটি উন্মোচন করেছেন।আর সেখানে প্রেম ও সহানুভূতিকে গ্রাস করে বিদ্বেষ ও ঘৃণার মতো জঘন্যতম হিংস্রতা। যেখানে মানুষ বড় অসহায়!
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেজ এবং আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏
Comments
Post a Comment