Skip to main content

ট্রাজেডি নাটক কাকে বলে? ট্রাজেডি নাটকের বৈশিষ্ট্য লেখো।একটি সার্থক ট্রাজেডি নাটক আলোচনা করো

ট্রাজেডি নাটক কাকে বলে? ট্রাজেডি নাটকের বৈশিষ্ট্য লেখো।একটি সার্থক ট্রাজেডি নাটক আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর)।

             আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,ট্র্যাজেডি শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ 'ট্র্যাগোস' (ছাগল) এবং 'ওইডে' (গান) থেকে। আর সেখানে আমরা দেখি- প্রাচীন গ্রিসে ধর্মীয় উৎসবে ছাগল বলি দিয়ে গান গাওয়া হতো, যা থেকে এই নাটকের উদ্ভব। বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল তাঁর 'পোয়েটিকস' গ্রন্থে ট্র্যাজেডির একটি আদর্শ সংজ্ঞা দিয়েছেন। তাঁর মতে-                                                                    "ট্র্যাজেডি হলো এমন এক ধরনের অনুকরণ (Mimesis), যা দর্শকদের মনে করুণা (Pity) এবং ভয় (Fear) সৃষ্টি করে এবং এর মাধ্যমে তাদের মানসিক শুদ্ধি (Catharsis) ঘটায়।"আর এই প্রেক্ষিতে আমরা ট্রাজেডির বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখতে পাই-

        ১. নায়কের পতনঃট্র্যাজেডির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে একজন মহান বা উচ্চবংশীয় নায়ক। সে সাধারণত সৎ, সাহসী এবং মহৎ গুণাবলির অধিকারী হয়। কিন্তু তার মধ্যে একটি ট্র্যাজিক ত্রুটি (Hamartia) থাকে, যা তার পতনের কারণ হয়। এই ত্রুটি হতে পারে অহংকার, ভুল বিচার বা অন্য কোনো মানবিক দুর্বলতা।

​       ২. করুণা ও ভয়ঃট্র্যাজেডি দেখে দর্শক নায়কের প্রতি করুণা অনুভব করে এবং তার করুণ পরিণতি দেখে নিজেদের জীবনের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভয় পায়। এই দুই অনুভূতির মধ্য দিয়ে দর্শক এক ধরনের মানসিক শুদ্ধি বা ক্যাথারসিস লাভ করে।

​      ৩. নিয়তির নিষ্ঠুরতাঃ ট্র্যাজেডিতে প্রায়শই দেখা যায় যে, নিয়তি বা ভাগ্য মানুষের ইচ্ছার চেয়েও শক্তিশালী। নায়ক শত চেষ্টা করেও তার দুঃখজনক পরিণতি এড়াতে পারে না। এই নিয়তির হাতে মানুষের অসহায়ত্ব ট্র্যাজেডির একটি মূল উপজীব্য।

​     ৪. দ্বন্দ্বঃ ট্র্যাজেডিতে নানা ধরনের দ্বন্দ্ব দেখা যায়—মানুষ বনাম নিয়তি, মানুষ বনাম সমাজ, বা মানুষের নিজের ভেতরের দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বগুলোই কাহিনীর গতিকে সামনের দিকে চালিত করে।

            • একটি সার্থক ট্র্যাজেডি নাটক- বিসর্জন •

               •আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'বিসর্জন' নাটকটি একটি গভীর ও জটিল সাহিত্যকর্ম, এবং এটিকে পুরোপুরি ট্র্যাজেডি বলা যায় কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। তবে বিতর্ক যাই থাকুক না কেন,ট্র্যাজেডির কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য এই নাটকে সুস্পষ্টভাবে বিদ্যমান। আর সেখানে আমরা দেখি-

        প্রথমতঃ আমরা জানি যে, ট্রাজেডি নাটকের বিষয়কে গুরুগম্ভীর হতে হয়। সেই হিসেবে বিসর্জন নাটকের কাহিনীকে অনুসরণ করলে দেখা যাবে যে ,এই নাটকের বিষয়গুলো বেশ গুরুগম্ভীর। যেখানে মানব ধর্মের বিরোধকে অবলম্বন করে নাটকটির রচিত হয়েছে। আসলে এই নাটকে আছে প্রেমের অহিংস পূজার সঙ্গে হিংস্র পূজার বিরোধ। আছে প্রেম আর প্রতাপের দ্বন্দ্ব, যা নাটকের বিষয়কে অধিক গুরুগম্ভীর করে তুলেছে। তাই আমরা নাটকে দেখতে পাই, জয়সিংহ তার প্রাণ বিসর্জন দিয়ে রঘুপতির মনে চেতনার সঞ্চার করে।

        দ্বিতীয়তঃ ট্রাজেডি নাটকের বৃত্ত হয় যদি আদি, মধ্য অন্ত্যযুক্ত শোক উদ্বেল জীবন ভাষ্য। মানবজীবনের গভীর সমস্যা সেখানে শোকের উদ্দেশে আকুলিত হয়ে উঠেছে। নাটকের শুরুতে সমস্যাকে দেখানো হয়েছে এবং নাটকের শেষে সেই সমস্যা উত্তরণের পথ দেখানো হয়েছে।

      তৃতীয়তঃ নাটকের প্রায় সব ক'টি প্রধান চরিত্রই অন্তর্দ্বন্দ্বে ক্ষত বিক্ষত হয়েছে। জয়সিংহের আত্মহত্যা এবং সেই আত্মহত্যার ফলে রঘুপতির উন্মাদ ভাব যথার্থভাবেই নাটকে 'পিটি' এবং 'ফিয়ার' ভাবে সাজিয়ে তুলেছে। পিটি এবং ফিয়ার ভাব সাজিয়ে তোলা ট্রাজেডি নাটকের শ্রেষ্ঠ ধর্ম।

     চতুর্থতঃ ট্রাজেডি নাটকের যে চরিত্র বৈশিষ্ট্য এবং ভাষার ওজস্বীতা থাকে, বিসর্জন নাটকের সেইসব গুণাবলী আছে।গোবিন্দ মাণিক্য রাজা,রঘুপতি রাজপুরোহিত,গুণাবলী রাণী, জয়সিংহ যুবরাজ। এছাড়াও নাটকের ভাষাও অলংকার সমৃদ্ধ ওজস্বী গুণ সমন্বিত। সুতরাং বিসর্জন যে সার্থক ট্রাজেডি নাটক ,এ বিষয়ে আমাদের মনের মধ্যে কোন সন্দেহের দানা নেই।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেজ এবং আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 










Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...