Skip to main content

সুখবাদের হেঁয়ালি র উপর একটি তথ্যসমৃদ্ধ টীকা লেখো।

সুখবাদের হেঁয়ালি উপর একটি তথ্যসমৃদ্ধ টীকা লেখো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার দর্শন মাইনর)।

           আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,'সুখবাদের হেঁয়ালি' হলো নীতিবিদ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, যে ধারণায় সুখবাদ দর্শনের একটি আপাত-বিরোধিতাকে তুলে ধরে।আর সেখানে সুখবাদ হলো এমন একটি মতবাদ যেখানে সুখকে জীবনের পরম লক্ষ্য বা নৈতিক আদর্শ বলে মনে করা হয়। এই মতবাদের মূল কথা হলো, মানুষের সমস্ত কর্মের উদ্দেশ্য হলো সর্বোচ্চ সুখ অর্জন করা এবং দুঃখকে এড়িয়ে চলা। কিন্তু-

              সুখবাদের হেঁয়ালি বলে যে, সরাসরি বা একনিষ্ঠভাবে সুখের পেছনে ছুটলে প্রায়শই সুখ অধরা থেকে যায় বা উল্টো দুঃখের কারণ হয়। অর্থাৎ, এখানে বলা হয় যে,যখন আমরা শুধুমাত্র সুখ অর্জনের উপর অতিরিক্ত মনোযোগ দেই, তখন আমরা আসলে সুখ থেকে দূরে সরে যেতে পারি।আর এই প্রেক্ষিতে-

            সুখবাদের হেঁয়ালির ব্যাখ্যা

         সুখ অন্বেষণের ব্যর্থতাঃ সুখবাদীরা মনে করেন যে, মানুষ সহজাতভাবেই সুখ চায় এবং সেটাই তার একমাত্র কাম্য বস্তু। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, যখন কেউ সরাসরি এবং কেবল নিজের সুখ অর্জনের জন্য কাজ করে, তখন সে প্রায়শই ব্যর্থ হয়। যেমন, একজন মানুষ যদি কেবল নিজের আনন্দ-ফুর্তির জন্য জীবনযাপন করে, তখন তার জীবনে একঘেয়েমি, শূন্যতা বা অবসাদ আসতে পারে। কারণ, প্রকৃত সুখ প্রায়শই কোনো উচ্চতর উদ্দেশ্য বা অন্যের কল্যাণের ফলস্বরূপ আসে, যা সরাসরি কামনা করা হয় না।

        •অন্যান্য মাধ্যমে সুখ লাভঃসুখবাদের হেঁয়ালি এই সত্যটি তুলে ধরে যে, সুখ সাধারণত একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে আসে। যখন আমরা কোনো অর্থপূর্ণ কাজে নিজেদের নিবিষ্ট করি,তখন আমরা প্রায়শই সুখের অভিজ্ঞতা লাভ করি।এই কাজগুলি করার সময় আমাদের মূল উদ্দেশ্য সুখ নাও হতে পারে, কিন্তু কাজের ফলস্বরূপ সুখ আপনা আপনিই আসে। 

           •স্বার্থপরতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতাঃ অতিরিক্ত আত্মকেন্দ্রিক সুখ অন্বেষণ মানুষকে অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে তুলতে পারে। যদি একজন ব্যক্তি কেবল নিজের সুখ নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তবে সে সামাজিক সম্পর্ক, মানবিক মূল্যবোধ এবং সহানুভূতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উপেক্ষা করতে পারে। এই বিচ্ছিন্নতা শেষ পর্যন্ত একাকীত্ব ও দুঃখের কারণ হয়, যা সুখের বিপরীত হয়।তাই-

         মনোযোগের পরিবর্তনঃ সুখের পেছনে ছোটা মানে নিজের বর্তমান অভিজ্ঞতা এবং চারপাশের জগত থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া। যখন আমরা ক্রমাগত ভবিষ্যতের সুখ নিয়ে চিন্তিত থাকি, তখন আমরা বর্তমানের ছোট ছোট আনন্দগুলো উপভোগ করতে ব্যর্থ হই। এতে বর্তমান জীবনকে পূর্ণভাবে উপভোগ করা সম্ভব হয় না।

          হেনরি সিজউইক এই হেঁয়ালিটি নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, সুখকে পাওয়ার শ্রেষ্ঠ উপায় হলো তাকে ভুলে যাওয়া বা অন্য কোনো উচ্চতর উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করা। যখন আমরা আত্মনিয়োগ করি এমন কিছুতে যা আমাদের ব্যক্তিগত সুখের চেয়ে বড়, তখন সুখ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাদের জীবনে আসে।

             পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,সুখবাদের হেঁয়ালি এই শিক্ষাই দেয় যে, সুখ কেবল একটি লক্ষ্য নয়, বরং জীবনের এক গভীর অভিজ্ঞতার ফল। তাই সরাসরি তার পেছনে না ছুটে, জীবনের অর্থপূর্ণ দিকগুলোতে মনোযোগ দিলেই প্রকৃত সুখের সন্ধান পাওয়া সম্ভব।

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...