Skip to main content

মঙ্গল গ্রহের ঘনাদা উপন্যাসে মঙ্গল গ্রহে যে বর্ণনা ফুটে উঠেছে তা আলোচনা করো।

মঙ্গল গ্রহে ঘনাদা উপন্যাসে মঙ্গল গ্রহের যে বর্ণনা ফুটে উঠেছে তা আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, চতুর্থ সেমিস্টার, বাংলা মাইনর)।

            আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,প্রেমেন্দ্র মিত্রের 'ঘনাদা' সিরিজের অন্যতম বিখ্যাত গল্প 'মঙ্গলগ্রহে ঘনাদা'। আর এই গল্পে ঘনাদা তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে মঙ্গল গ্রহের এক অসাধারণ, বৈজ্ঞানিক ও কল্পনার মিশেলে এক অদ্ভুত বর্ণনা দিয়েছেন। সেখানে এই বর্ণনা কেবল গল্পের উত্তেজনা বাড়াতে সাহায্য করে না, বরং বলা যেতে পারে যে,তৎকালীন সময়ের বৈজ্ঞানিক ধারণাকেও সাধারণ পাঠকের কাছে সহজ করে তুলে ধরে। আর সেই বন্যায় আমরা দেখি-

      •উপগ্রহ ফোবোস এবং ডিমোসঃ ঘনাদা মঙ্গলের দুই উপগ্রহ ফোবোস ও ডিমোস সম্পর্কে বিশদ বর্ণনা দেন। তিনি বলেন যে, ফোবোস অত্যন্ত দ্রুত গতিতে মঙ্গলকে প্রদক্ষিণ করে, যা অনেকটা একটি মহাকাশযানের মতোই। অন্যদিকে, ডিমোসের প্রদক্ষিণ গতি তুলনামূলকভাবে ধীর, যা দেখে মনে হয় এটি যেন বিপরীত দিকে ঘুরছে। এই তথ্যগুলো তৎকালীন সময়ে প্রচলিত জ্যোতির্বিজ্ঞানের ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল এবং গল্পে বাস্তবতার ছোঁয়া যোগ করেছিল। অতঃপর আমরা দেখি- 

      •ভূপৃষ্ঠের অবস্থাঃঘনাদার বর্ণনায় মঙ্গল গ্রহের ভূপৃষ্ঠের অবস্থা ছিল অত্যন্ত রুক্ষ ও বসবাসের অযোগ্য। তিনি বলেন যে, মঙ্গলের উপরিভাগ একসময় জীবনের জন্য উপযুক্ত হলেও, সেখানকার প্রাণীরা নিজেদের মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। এর ফলে গ্রহের জল শুকিয়ে যায়, বাতাস দূষিত হয়ে যায় এবং সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি ও কসমিক রশ্মির কারণে ভূপৃষ্ঠে জীবনধারণ অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই বর্ণনা তৎকালীন বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার প্রেক্ষাপটে মানুষের পারমাণবিক যুদ্ধের পরিণতি সম্পর্কে লেখকের গভীর চিন্তা ভাবনা প্রকাশ করে।

      •পাতালবাসীদের জগৎঃ যেহেতু ভূপৃষ্ঠ বসবাসের অযোগ্য, তাই মঙ্গলের বুদ্ধিমান প্রাণীরা, যাদেরকে 'মাঙ্গলিক' বলা হয়েছে, তারা মাটির নিচে বা পাতাল রাজ্যে আশ্রয় নেয়। তারা ভূপৃষ্ঠের নিচে সুড়ঙ্গ কেটে এবং পাতাল শহর তৈরি করে সেখানে জীবনযাপন শুরু করে। ঘনাদা বলেন যে, একসময় লক্ষাধিক মাঙ্গলিক পাতাল রাজ্যে আশ্রয় নিলেও, তাদের সংখ্যা কমতে কমতে হাতে গোনা কয়েকটিতে এসে ঠেকেছে।

       •জীবন ও প্রাণের অস্তিত্বঃ গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মঙ্গলে প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে আলোচনা। ঘনাদা এমন একটি উল্কার কথা বলেন, যা পৃথিবীর বাইরের মহাশূন্য থেকে এসেছে এবং তাতে প্রাণের মূল উপাদান অ্যামিনো অ্যাসিডের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এর মাধ্যমে তিনি এই বৈজ্ঞানিক ধারণাকে তুলে ধরেন যে, পৃথিবীর বাইরেও প্রাণের অস্তিত্ব থাকা সম্ভব।

             পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,প্রেমেন্দ্র মিত্র এই গল্পের মাধ্যমে কেবল একটি কল্পবিজ্ঞানের গল্পই লেখেননি, বরং বিজ্ঞান, মানব সভ্যতা ও তার ধ্বংসের সম্ভাবনা নিয়ে এক গভীর আলোচনা করেছেন। ঘনাদার বর্ণনার মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন যে, বিজ্ঞানের অগ্রগতি যেমন নতুন দিগন্ত খুলে দেয়, তেমনি যদি তা সঠিকভাবে ব্যবহার করা না হয়, তাহলে তা ভয়াবহ ধ্বংসও ডেকে আনতে পারে। গল্পের এই দিকটিই একে শুধুমাত্র একটি অ্যাডভেঞ্চার গল্প থেকে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায় এবং পাঠকের মনে গভীর চিন্তার জন্ম দেয়।

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা অনার্স (DSE3/4) সাজেশন ২০২৫

       West Bengal State University                                       BA Honours, 6th Semester                                         SUGGESTION 2025                                                      BNGA,DSE05T( DSE3/4)  • বাংলা কথাসাহিত্যঃ মন্বন্তর, দাঙ্গা ও দেশভাগ• একক-১(২০২১) ক) দেশভাগের ইতিহাসের বাস্তব রূপ বাংলা সাহিত্যে  কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে কয়েকটি উপন্যাস অনুসরণে তার পরিচয় দাও। • ১৯৪৬ দাঙ্গা রাজনীতির ট্রাজেডি বাংলা ছোটগল্পের পরিসরে কিভাবে এসেছে, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি রচনা অবলম্বনে আলোচনা করো। (২০২২) পঞ্চাশের মন্বন্তরের বাস্তব বর্ণনা করে বাংলা উপন্যাসে তার কতটা প্রতিফলন ঘটেছে, সে বিষয়ে আলোকপাত করো। •দেশভাগের ক...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...