দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব বা ফলাফল আলোচনা করো
•′আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (1939-1945) ফলাফল ছিল ব্যাপক সুদূরপ্রসারী।আর যুদ্ধের ফলে গোটা বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে।শুধু তাই নয়,এই যুদ্ধ ছিল মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ সংঘাত।যে সংঘাতে আনুমানিক প্রায় ৭-৮ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।আর সেই যুদ্ধের-
•রাজনৈতিক ফলাফল•
১) জাতিসংঘের সৃষ্টিঃ বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে বিশ্বকে রক্ষা করতে এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়।আর এটি লীগ অফ নেশন এর ব্যর্থতাকে প্রতিস্থাপন করে।
২)স্নায়ুযুদ্ধ এবং দ্বিমেরু বিশ্বঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গোটাবিশ্ব দুটি প্রধান শক্তি জোটে বিভক্ত হয়।যার একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (USA) এবং তার পুঁজিবাদী মিত্ররা, অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন (USSR) এবং তার সমাজতান্ত্রিক মিত্ররা।এই শক্তিজোঠ সৃষ্টি হলে শুরু হয় স্নায়ুযুদ্ধ (Cold War)। যে যুদ্ধ প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে চলে।
৩)উপনিবেশবাদের অবসানঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোকে দুর্বল করে দেয়। এর ফলে এশিয়া ও আফ্রিকায় বিভিন্ন দেশ স্বাধীনতা লাভ করে এবং বিশ্বজুড়ে উপনিবেশবাদের অবসান ঘটে। ভারত, পাকিস্তান, এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো এর বড় উদাহরণ।
৪) জার্মানির বিভাজনঃজার্মানিকে দুটি অংশে বিভক্ত করা হয়—পশ্চিম জার্মানি (West Germany), যা গণতান্ত্রিক ছিল, এবং পূর্ব জার্মানি (East Germany), যা সোভিয়েত ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
•অর্থনৈতিক ফলাফল•
১) উরোপের অর্থনৈতিক ধ্বংসঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপের অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়ে তছনছ করে দিয়েছিল।যার ফলে শহর, শিল্প, এবং অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
২) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্থানঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন এবং যুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। অতঃপর এটি 'মার্শাল' পরিকল্পনার মাধ্যমে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সাহায্য করে।
৩)বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ গঠনঃ বিশ্ব অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) গঠিত হয়।
•সামাজিক ফলাফল•
১) গণহত্যার ভয়াবহতাঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হলোকাস্ট (The Holocaust)-এর মতো গণহত্যা মানবজাতির ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে পরিগণিত হয়।যার ফলে জাতিগত বিদ্বেষ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।
২)পারমাণবিক অস্ত্রঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলা ভবিষ্যতে পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।
৩)নারীর ভূমিকা পরিবর্তনঃ যুদ্ধের সময় পুরুষরা ফ্রন্টে থাকায় নারীরা কলকারখানা এবং অন্যান্য পেশায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা সমাজে নারীর অবস্থান পরিবর্তনে সহায়ক হয়।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, ধ্বংসের দিক থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল মারাত্মক রকমের।কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলা ছিল ব্যাপক ভয়াবহ। বলা যায় এই যুদ্ধে প্রায় ৪ কোটি মানুষ নিহত হয়। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের মৃত্যুহার ছিল অনেকটা কম।
Comments
Post a Comment