ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়কে বাংলা গদ্যের জনক বলা হয় কেন আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় তৃতীয় সেমিস্টার বাংলা মেজর)
আলোচনা শুরুতেই আমরা বলতে পারি যে,ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়কে বাংলা গদ্যের জনক বলা হয়। কারণ তিনি বাংলা সাহিত্যে গদ্যকে একটি সুসংহত ও শক্তিশালী রূপ দিয়েছিলেন।বলা যায় তাঁর আমলের পূর্বে বাংলা গদ্যের এরূপ অবস্থা ছিল না।আগে বাংলা গদ্য ছিল অপরিপক্ক এবং বেশিরভাগই দলিল, চিঠিপত্র, বা পুঁথির ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বিদ্যাসাগর এই দুর্বলতাকে কাটিয়ে উঠে গদ্যকে সাহিত্যের উপযুক্ত করে তোলেন। আর সেখানে আমরা দেখি যে-
•বিদ্যাসাগরের গদ্যে যতিচিহ্নের ব্যবহারঃ তিনি প্রথম ব্যক্তি যিনি বাংলা গদ্যে সঠিকভাবে দাঁড়ি (।), কমা (,), সেমিকোলন (;) ইত্যাদি যতিচিহ্ন ব্যবহার করে বাক্যের অর্থ স্পষ্ট করেন। এর ফলে গদ্য পাঠ করা সহজ হয় এবং বাক্যগুলো সুশৃঙ্খল দেখায়।
•বিদ্যাসাগরের গদ্যের ভাষা সরল ও সাবলীলঃ বিদ্যাসাগর সংস্কৃত ভাষা থেকে প্রচুর শব্দ ব্যবহার করলেও, তার লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল সাবলীলতা। তিনি বাক্যগুলোকে জটিলতার বদলে সরল ও সহজে বোঝা যায় এমনভাবে সাজিয়েছেন। তার গদ্যে একটি স্বাভাবিক ছন্দ ও গতি ছিল।
•বিদ্যাসাগরের গদ্যের বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্যঃ তিনি কেবল সাহিত্য রচনা করেননি, বরং বিভিন্ন বিষয়ে লিখেছেন—যেমন শিক্ষা, সমাজসংস্কার, বিজ্ঞান ইত্যাদি। তার লেখাগুলো সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করেছিল।
•শিক্ষামূলক রচনায় বিদ্যাসাগরঃ বিদ্যাসাগরের লেখাগুলি, বিশেষ করে 'বর্ণপরিচয়', 'কথামালা', 'বোধোদয়' ইত্যাদি, বাংলা ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে বিপ্লব এনেছিল। এই বইগুলো শিশুদের জন্য সহজ ও আকর্ষণীয় করে লেখা হয়েছিল, যা বাংলা শিক্ষার ভিত্তি স্থাপন করে।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,বিদ্যাসাগরের এই অবদানগুলির ফলে বাংলা গদ্য তার নিজস্ব পরিচিতি লাভ করে এবং পরবর্তীকালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর মতো লেখকরা এই গদ্যশৈলীকে আরও সমৃদ্ধ করতে পেরেছিলেন। এ কারণেই তাকে 'গদ্যের প্রথম শিল্পী' এবং 'বাংলা গদ্যের জনক' বলা হয়।
Comments
Post a Comment