জগতের উপর মনের কারখানা বসিয়াছে এবং মনের উপরে বিশ্বমনের কারখানা। সেই উপরি তল হইতে সাহিত্যের উৎপত্তি।"—এই উক্তিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোন প্রবন্ধের? সেই প্রবন্ধের আলোকে উক্ত বিষয়টির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
"জগতের উপর মনের কারখানা বসিয়াছে এবং মনের উপরে বিশ্বমনের কারখানা। সেই উপরি তল হইতে সাহিত্যের উৎপত্তি।"—এই উক্তিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোন প্রবন্ধের? সেই প্রবন্ধের আলোকে উক্ত বিষয়টির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর)।
উপরোক্ত আলোচ্য উক্তিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'সৌন্দর্যবোধ' প্রবন্ধ থেকে এই উক্তিটি নেওয়া হয়েছে। সেই প্রবন্ধের আলোকে আমরা দেখি যে-
'সৌন্দর্যবোধ' প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দেখিয়েছেন যে, সাহিত্য বা শিল্পের সৃষ্টি কোনো তথ্য বা জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে হয় না। বরং বলা যেতে পারে যে,এটি আমাদের গভীর অনুভূতি ও উপলব্ধির প্রকাশ।আসলে তিনি এই বিষয়টি বোঝাতে 'কারখানা'র একটি রূপক ব্যবহার করেছেন।আর সেখানে-
উক্তিটির মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্যের মূল উৎস ও প্রকৃতির একটি গভীর দার্শনিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন।আসলে তিনি মনে করেন, সাহিত্য বা শিল্পের সৃষ্টি কেবল বস্তুগত জগত থেকে হয় না, বরং এর পেছনে রয়েছে এক জটিল মানসিক ও আত্মিক প্রক্রিয়া। যেখানে-
•জগতের উপর মনের কারখানাঃপ্রথমত, আমাদের ইন্দ্রিয়গুলো (যেমন চোখ, কান, ত্বক) বাহ্যিক জগত থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। এই তথ্যগুলো আমাদের মন গ্রহণ করে এবং সেগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করে। রবীন্দ্রনাথ এটিকে 'মনের কারখানা' বলেছেন। এই স্তরে, আমরা কেবল বাহ্যিক বিষয়গুলোকে আমাদের ব্যক্তিগত ধারণা ও উপলব্ধির ছাঁচে সাজিয়ে নিই। উদাহরণস্বরূপ, আমরা একটি নদী দেখি, তার জল, গতি, এবং পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কে সচেতন হই। এটি কেবল একটি সংবেদনশীল এবং বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়া। অতঃপর-
•মনের উপরে বিশ্বমনের কারখানাঃএর পরের স্তরটি আরও গভীর। আমাদের ব্যক্তিগত মনের উপরে একটি বৃহত্তর, সর্বজনীন বা সামগ্রিক চেতনা কাজ করে, যাকে রবীন্দ্রনাথ 'বিশ্বমন' বলেছেন। এই বিশ্বমন হলো সেই আধ্যাত্মিক বা চিরন্তন সত্তা, যা আমাদের ব্যক্তিগত অনুভূতির সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে। যখন আমাদের মন এই বিশ্বমনের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন সাধারণ বিষয়গুলো অসাধারণ অর্থ ধারণ করে। এই সংযোগের ফলেই একটি সাধারণ দৃশ্য বা ঘটনা আমাদের মনে গভীর আবেগ বা সৌন্দর্যের অনুভূতি জাগায়। অতঃপর-
•সেই উপরি তল হইতে সাহিত্যের উৎপত্তিঃ রবীন্দ্রনাথের মতে, সাহিত্যের জন্ম হয় এই গভীরতম স্তর থেকে—যেখানে আমাদের মন বিশ্বমনের সঙ্গে মিলিত হয়। সাহিত্য কেবল জগতের বস্তুগত বর্ণনা নয়, এটি সেই অনুভূতি ও উপলব্ধির প্রকাশ, যা আমাদের মন ও বিশ্বমনের মিলনে সৃষ্টি হয়। একজন লেখক যখন লেখেন, তখন তিনি কেবল তাঁর দেখা বা শোনা বিষয় নিয়ে লেখেন না, বরং সেই বিষয় থেকে তাঁর মনে যে গভীর আবেগ বা সত্যের অনুভূতি জেগেছে, তা প্রকাশ করেন। এই কারণেই সাহিত্য কেবল জ্ঞানের বিষয় নয়, এটি ভাবের বিষয়। এটি কোনো তথ্য নয়, বরং একটি অভিজ্ঞতা, যা পাঠককেও একই গভীর স্তরের অনুভূতিতে নিয়ে যেতে পারে।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,রবীন্দ্রনাথের মতে, সাহিত্য হলো সেই সৃষ্টি, যা আমাদের ব্যক্তিগত মনকে অতিক্রম করে বিশ্বমনের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং সেখান থেকে চিরন্তন সৌন্দর্য ও সত্যের অনুভূতিকে প্রকাশ করে।
Comments
Post a Comment