Skip to main content

মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করে একটি সার্থক মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের আলোচনা করো।

মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করে একটি সার্থক মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের আলোচনা করো(পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর)।

        আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস হলো সাহিত্যের একটি বিশেষ ধারা, যে ধারায় গল্পের মূল উপজীব্য হয়ে ওঠে চরিত্রের মনোজগৎ ও তার ভেতরকার দ্বন্দ্ব।তবে সাধারণ উপন্যাসের মতো এতে প্লট, চরিত্র, স্থান, কাল ইত্যাদি থাকলেও, মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসে কাহিনীর চেয়ে চরিত্রের ভেতরের ভাবনা, অনুভূতি, স্মৃতি, স্বপ্ন, এবং মানসিক সংঘাতের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। আর  এই প্রেক্ষিতে মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো-

        •অন্তর্মুখী বিশ্লেষণঃ মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসে লেখকের মূল লক্ষ্য থাকে চরিত্রের মনের গভীরে প্রবেশ করা। বাইরের ঘটনার বর্ণনা কম থাকে, বরং চরিত্রটি কীভাবে কোনো ঘটনাকে অনুভব করছে, তার প্রতিক্রিয়া কী, তার মনোজগতে কী পরিবর্তন আসছে – এসবের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা হয়।

      চেতনা প্রবাহঃ অনেক মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসে চেতনা প্রবাহ রীতি ব্যবহার করা হয়।যার মাধ্যমে চরিত্রের মনের মধ্যে আসা এলোমেলো চিন্তা, অনুভূতি এবং স্মৃতিকে অবিকৃতভাবে তুলে ধরা হয়।যার ফলে পাঠক সরাসরি চরিত্রের মনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

        মানসিক দ্বন্দ্বঃ এই উপন্যাসের প্রধান দ্বন্দ্ব বাইরে নয়, বরং চরিত্রের নিজের ভেতরের। চরিত্রের ইচ্ছা, ভয়, ঘৃণা, ভালোবাসা, অপরাধবোধ, বিবেক – এই বিষয়গুলো একে অপরের সঙ্গে সংঘাত তৈরি করে।

        প্রতীক ও রূপকের ব্যবহারঃ চরিত্রের মানসিক অবস্থা বোঝানোর জন্য লেখক প্রায়ই বিভিন্ন প্রতীক ও রূপকের আশ্রয় নেন। যেমন, কোনো ভাঙা আয়না বা অন্ধকার ঘরের বর্ণনা চরিত্রের মানসিক বিচ্ছিন্নতা বা হতাশার প্রতীক হতে পারে।

      বহুস্তরীয় চরিত্রঃ মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের চরিত্রগুলো সাধারণত একরৈখিক হয় না। তাদের মধ্যে ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, ভালোবাসা-ঘৃণা ইত্যাদি নানা পরস্পরবিরোধী দিক থাকতে পারে, যা তাদের আরও বাস্তব এবং জটিল করে তোলে।

   একটি সার্থক মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস-'পথের পাঁচালী'

            উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা একটি সার্থক মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের উদাহরণ হিসেবে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস 'পথের পাঁচালী'-র নাম উল্লেখ করতে পারি।তবে এটি একটি গ্রামীণ জীবনের আখ্যান, যার মূল শক্তি নিহিত আছে চরিত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক গভীরতায়। এই উপন্যাসে কেবল অপুদের গ্রামের জীবনযাত্রার বর্ণনা নেই, বরং তার চেয়েও বেশি আছে তার ভেতরের অনুভূতি, স্বপ্ন, আর তার শৈশবের মানসিক বিকাশের এক অসাধারণ চিত্র।আর সেখানে আছে-

          অপুর মনোজগতের বিশ্লেষণঃ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র অপু। তার চোখে বাইরের জগতের ছবি ধরা পড়ে, কিন্তু তার মনের ভেতরের প্রতিক্রিয়াগুলোই প্রধান হয়ে ওঠে। অপুর মনে যে অনুসন্ধিৎসা, নতুনকে জানার আগ্রহ, গ্রাম ছেড়ে অজানার পথে পা বাড়ানোর আকাঙ্ক্ষা – এসবই মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ফল।

      মানসিক দ্বন্দ্বঃ সর্বজয়ার মানসিক দ্বন্দ্ব এই উপন্যাসের অন্যতম আকর্ষণ। অভাবের সঙ্গে তার নিরন্তর লড়াই, সংসারের দায়িত্বের চাপ এবং একইসঙ্গে নিজের সন্তানদের প্রতি তার গভীর স্নেহ – এই সবের মধ্যে সর্বজয়ার মনের টানাপোড়েন সার্থকভাবে ফুটে উঠেছে।

       প্রতীকী ব্যবহারঃএই উপন্যাসে মনস্তত্ত্বের প্রতীকী ব্যবহারও লক্ষণীয়। যেমন - রেললাইন অপুর কাছে শুধু একটি পথ নয়, বরং তা অসীম সম্ভাবনার এবং অজানা ভবিষ্যতের প্রতীক। তবে এই উপন্যাসে বাইরের ঘটনা আছে ।আর সেই ঘটনাগুলি হলো -                                                            দুর্গার মৃত্যু, অপুদের বাড়ি ছেড়ে যাওয়া ইত্যাদি থাকলেও, সেগুলোর চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এই ঘটনাগুলোর কারণে চরিত্রগুলোর মনের ওপর কী প্রভাব পড়ছে তার ওপর।আর তার প্রভাবে 'পথের পাঁচালী'  বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক শ্রেষ্ঠ মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...