বাংলা গদ্যের বিকাশে শ্রীরামপুর মিশনের অবদান আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার, বাংলা মেজর)।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,বাংলা গদ্যের বিকাশে শ্রীরামপুর মিশনের অবদান ছিল অপরিসীম। ১৮০০ সালে উইলিয়াম কেরি, উইলিয়াম ওয়ার্ড এবং মার্শম্যান এই তিনজনের উদ্যোগে শ্রীরামপুরে ব্যাপটিস্ট মিশন স্থাপিত হয়। আর এই মিশন বাংলা ভাষার প্রসারে, বিশেষ করে বাংলা গদ্যের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।আর সেই প্রেক্ষিতে বাংলা গদ্যের বিকাশে শ্রীরামপুর মিশনের ভূমিকায় আমরা দেখতে পাই যে -
আমরা জানি যে,শ্রীরামপুর মিশন মূলত ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু এই মিশন সেই কার্যক্রমের মধ্যে আবদ্ধ না থেকে তাদের কার্যক্রম বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। আর সেই প্রভাবে বাংলা গদ্যের বিকাশে তাদের প্রধান অবদান আমরা নিম্নসূত্রাকারে আলোচনা করলাম-
১)মুদ্রণ যন্ত্রের ব্যবহারঃ শ্রীরামপুর মিশনই প্রথম এই বাংলার বুকে বাংলা মুদ্রণ যন্ত্র স্থাপন করে। তবে এর আগে বাংলা গদ্যের তেমন কোনো বই ছিল না।কারণ হিসেবে আমরা দেখি তৎকালীন সময়ে হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি অনেক ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ ছিল। যার ফলে শ্রীরামপুর মিশন মুদ্রণ যন্ত্র ব্যবহার করে বাইবেল ও অন্যান্য ধর্মীয় গ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশ করে। আর বিভিন্ন গ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ হওয়ার পর সাধারণ মানুষের কাছে বাংলা গদ্য সহজলভ্য হয়ে ওঠে। বাংলা মুদ্রণ শিল্পের ইতিহাসে এই পদক্ষেপ একটি যুগান্তকারী ঘটনা বা পদক্ষেপ। অতঃপর সেই পদক্ষেপের পর-
২)বাইবেল অনুবাদঃ উইলিয়াম কেরি সর্বপ্রথম বাইবেল গ্রন্থটি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন। যে অনুবাদটি ছিল বাংলা গদ্যের প্রথম দিকের একটি বড় কঠিন কাজ। তবে বাইবেলের প্রথম অনুবাদের ভাষা কিছুটা কঠিন ও সংস্কৃত প্রভাবিত ছিল। সেখানে ভাষা কঠিন ও সংস্কৃত হলেও বাংলা গদ্যকে একটি সুদৃঢ় কাঠামোর রূপ দিতে সাহায্য করে। তাই আমরা বলতে পারি যে,বাইবেলের মতো একটি বৃহৎ গ্রন্থের অনুবাদ বাংলা গদ্যের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। অতঃপর আমরা দেখি যে-
৩) বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তক রচনাঃ শ্রীরামপুর মিশন প্রথমদিকে বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তক পরপর রচনা ও প্রকাশ করে। তবে এই বইগুলো প্রধানত শিক্ষার্থীদের জন্য লেখা হয়েছিল এবং এর ভাষা ছিল সহজ,সরল ও সাবলীল। যার ফলে বাংলা ব্যাকরণ, ইতিহাস, ভূগোল ইত্যাদি বিষয়ে লেখা এই বইগুলো বাংলা গদ্যকে শিক্ষামূলক কাজে ব্যবহারের পথ খুলে দেয়। শুধু তাই নয়, এই পুস্তক গুলি বাংলা গদ্যের প্রয়োগ ক্ষেত্রকে প্রসারিত করে। অতঃপর শ্রীরামপুর মিশন নজর দেয়-
৪)সাময়িক পত্রিকা প্রকাশঃ শ্রীরামপুর মিশন থেকে দিগদর্শন (১৮১৮) এবং সমাচার দর্পণ (১৮১৮) নামে দুটি উল্লেখযোগ্য সাময়িক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এগুলি ছিল বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম পত্রিকা। এই পত্রিকাগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন খবর, জ্ঞানমূলক প্রবন্ধ এবং সাহিত্য বিষয়ক লেখা প্রকাশিত হতো। এর ফলে বাংলা গদ্য নিয়মিত ব্যবহারের সুযোগ পায় এবং এটি জনসাধারণের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই পত্রিকাগুলি বাংলা গদ্যকে জনসাধারণের দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশ করে তোলে।আর এগুলিই প্রকাশই ছিল শ্রীরামপুর মিশনের উল্লেখযোগ্য অবদান।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,শ্রীরামপুর মিশনের কর্মকাণ্ডের ফলে বাংলা গদ্য শুধুমাত্র ধর্মীয় বা সাহিত্যিক গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে শুরু করে। তাদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত মুদ্রণ প্রেস এবং প্রকাশিত বই ও পত্রিকাগুলো বাংলা গদ্যকে একটি সুনির্দিষ্ট রূপ দেয় এবং এর প্রসারে সহায়ক হয়। যদিও তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ধর্ম প্রচার, তাদের কর্মকাণ্ড বাংলা গদ্যের আধুনিক রূপায়নে একটি মজবুত ভিত্তি স্থাপন করে। বলা যায়, শ্রীরামপুর মিশন আধুনিক বাংলা গদ্যের জন্মলগ্ন থেকেই তার বিকাশে এক অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছে।
Comments
Post a Comment