Skip to main content

রূপক সাংকেতিক নাটক হিসেবে রাজা নাটকের স্বার্থকতা আলোচনা করো।

রূপক সাংকেতিক নাটক হিসেবে রাজা নাটকের স্বার্থকতা আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর ডিএস10, Unit III)।

         আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'রাজা' নাটক' টি একটি স্বার্থক রূপক-সাংকেতিক নাটক।যে নাটকটির মূল সার্থকতা নিহিত আছে এর ভাববস্তু, চরিত্র এবং নামকরণে প্রতীক বা সংকেতের সফল প্রয়োগের মাধ্যমে।আর সেই প্রেক্ষিতে আমরা প্রথমেই বলতে পারি রূপক সাংকেতিক নাটক কী? সেই আলোচনায় আমরা বলতে পারি-

          •রূপক-সাংকেতিক নাটক হলো সেই নাটক, যেখানে আক্ষরিক কাহিনীর আড়ালে একটি গভীর আধ্যাত্মিক, দার্শনিক বা নৈতিক সত্যকে সংকেতের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়।আর সেই প্রেক্ষিতে 'রাজা' নাটকে প্রেম, ঈশ্বর, সৌন্দর্য ও মানুষের মুক্তি-এই সমস্ত গভীর বিষয়গুলিকে সংকেতের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।আর সেখানে 'রাজা' নাটকের প্রতিটি চরিত্র, স্থান ও ঘটনা এক-একটি গভীর ভাবনার প্রতীক। এই সকল বিষয়গুলি সফল ব্যবহার রাজা নাটকটি সার্থক সার্থক রূপক সাংকেতিক নাটকের সার্থকতা পেয়েছে।আর সেখানে-

        • রাজা অরূপ ঈশ্বর বা পরম ব্রহ্ম।যিনি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নন, তবে তিনি কিন্তু সর্বব্যাপী। তিনি সমগ্র নাটক জুড়ে  অদৃশ্যমান। তবে নাটকে  তাঁর কণ্ঠস্বর আমরা শুনতে পাই। আসলে তাঁর এই অদৃশ্যতা প্রমাণ করে যে, ঈশ্বরকে চোখ দিয়ে দেখা যায় না, কেবলমাত্র অন্তরের উপলব্ধির দ্বারাই তাঁকে জানা যায়, অনুভব করতে হয়। আর এখানে আমরা নাটকে শুনতে পাই-

   "মূঢ় তারা মনে করে দেখতে পাচ্ছি—তারা জানে না যে জীবনের মধ্যেই আনন্দ, তাকে কখনো দেখেনা।"

      •সুদর্শনা। রাজা নাটকে সুদর্শনা চরিত্রটি মানবাত্মা বা জিজ্ঞাসু মন। যে মন নিয়ে সে প্রথমে রূপের মোহে আবিষ্ট হয় এবং শেষে সে উপলব্ধির পথে মুক্তি খোঁজে। আসলে সুদর্শনা বাহ্যিক সৌন্দর্যের পূজারিণী। তাই সে রূপবান সুবর্ণকে রাজা বলে ভুল করে এবং অন্ধকার ঘরে রাজার নৈকট্যকে ভয় পায়। অবশেষে ভুল ভেঙে দুঃখের পথ ধরে সে পরম উপলব্ধিতে পৌঁছায়। তাই আমরা তাকে বলতে শুনি- 

    "তুমি সুন্দর নও, প্রভু, সুন্দর নও—তুমি অনুপম।" 

আর এই উপলব্ধির মধ্য দিয়েই সুদর্শনার আত্মোপলব্ধি পূর্ণ হয়। পাশাপাশি-

        •অন্ধকার ঘর। রাজা নাটকে অন্ধকার হলো হৃদয়ের নিভৃত কুঠুরি বা আত্মা।যে কুঠুরিতে পরম ব্রহ্মের গোপন লীলা চলে। শুধু তাই নয়, আলো-ঝলমলে বাইরের জগতে নয়, কেবল অন্ধকার অন্তরেই রাজার প্রকৃত পরিচয় মেলে। এই ঘরটি প্রমাণ করে যে ঈশ্বরকে জানার জন্য বাহ্যিক আলো বা আড়ম্বরের প্রয়োজন নেই। তাই দাসী সুরঙ্গমা রানী সুদর্শনাকে বলে-

    "আলোর ঘরে সকলেরই আনাগোনা-এই অন্ধকারে কেবল একলা তোমার সঙ্গে মিলন।"

        এখানে অন্ধকার ঘর হলো হৃদয়ের নিভৃত স্থান বা আত্মার গভীর উপলব্ধির জগৎ, যেখানে রাজা (ঈশ্বর/পরমাত্মা) তাঁর অরূপ রূপে বিরাজ করেন। আর আলোর ঘর হলো পার্থিব বা বাহ্যিক জগৎ, যেখানে সকলেরই প্রবেশাধিকার আছে।আসলে-

       সুরঙ্গমা বোঝাতে চেয়েছে, পার্থিব রূপ বা বাইরের জগতে ঈশ্বরকে সকলে দেখতে পেলেও, হৃদয়ের নিভৃতে তাঁকে কেবল একাকী প্রেমের মাধ্যমেই পাওয়া যায়।

         •ঠাকুরদা ও  সুরঙ্গমা। রাজা নাটকে ঠাকুরদা ও সুরঙ্গমা হলেন সখ্যভাবের ভক্ত এবং দাসীভাবের ভক্ত। এই দুটি চরিত্র প্রথম থেকেই রাজাকে তার অরূপ সত্তায় উপলব্ধি করতে পেরেছে। তারা প্রমাণ করে যে, দুঃখ বা ত্যাগ স্বীকারের মাধ্যমেই ঈশ্বরের সঙ্গে সহজ ও নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন সম্ভব।আর সেই ত্যাগের মহিমা নিয়ে সুরঙ্গমাকে বলতে শুনি-

    "আমার একটা বোধ জন্মে গেছে, আমার বোঝবার জন্য কিছুই দেখবার দরকার হয় না।"

        •বসন্ত উৎসব ও অন্যান্য রাজা। বসন্ত উৎসব ও অন্যান্য রাজা হলো এ নাটকে রূপের মোহ, বাহ্যিক আড়ম্বর এবং আসক্তিপূর্ণ পার্থিব জগৎ। যেখানে সুদর্শনা রাজার বাহ্যিক রূপ দেখতে চেয়ে যে ভ্রম করে, তারই ফল হলো বসন্ত উৎসব। সেখানে মিথ্যা রাজাদের ভিড়ে আসল রাজাকে চেনা যায় না, বরং যুদ্ধ ও সংঘাত শুরু হয়।যা পার্থিব জীবনের লোভ ও কামনার প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত। আর এই সকল প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি-

         নাটকটির নামকরণ 'রাজা' অবশ্যই সার্থক। এই 'রাজা' শুধু একটি রাজ্যের শাসক নন,তিনি একজন মানব হৃদয়ের রাজা, অর্থাৎ ঈশ্বর। সমগ্র নাটকটি আবর্তিত হয়েছে এই অদৃশ্য 'রাজা' এবং তাকে কেন্দ্র করে সুদর্শনার আত্ম-অনুসন্ধান। অতএব, ভাববস্তুগত দিক থেকে এই নামকরণ সম্পূর্ণ সার্থক ও প্রতীকী। তবে-

           নাট্যকার'রাজা' নাটকে দৃশ্যমান জগতের আড়ালে এক অদৃশ্য আধ্যাত্মিক সত্যকে তুলে ধরা হয়েছে। যেখানে প্রতিটি চরিত্র ও ঘটনার প্রতীকী ব্যবহার এই সত্যকে সুস্পষ্ট করেছে।যা নাটকটিকে একটি অত্যন্ত সার্থক রূপক-সাংকেতিক নাটকের মর্যাদা দিয়েছে।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...