বিজন ভট্টাচার্যের নবান্ন নাটকটি দুর্গতি ও প্রতিরোধের নাটক- আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর DS11,Unit-4)
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,বিজন ভট্টাচার্যের 'নবান্ন' নাটকটি বাংলা নাট্য সাহিত্যের ইতিহাসে এক জীবন্ত দলিল।আর সেই নবান্ন নাটকের প্রধান উপজীব্য বিষয় হল- ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরের ভয়াবহ দুর্গতি এবং সেই দুর্গতিকে অতিক্রম করে মানুষের প্রতিরোধ ও নতুন জীবন গড়ার সংকল্প।আর সেই সংকল্পের নিরিখে বলা হয়-'নবান্ন' নাটকটি দুর্গতি ও প্রতিরোধের নাটক।' যেখানে-
১. 'নবান্ন' নাটকটি দুর্গতির নাটকঃ আমরা জানি'নবান্ন' নাটকটি তৎকালীন বাংলার অসংখ্য মানুষের চরম দুঃখ, কষ্ট এবং বিনাশের এক মর্মস্পর্শী দলিল। যেখানে নাটকের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ জুড়ে রয়েছে মন্বন্তরের ভয়াবহ ছবি। আর সেই ছবিতে উঠে এসেছে-
• গ্রামীণ দুর্গতি। সেখানে আমরা দেখি, ধানের ফসল তোলার পরেও কৃষকের ঘরে ধান নেই। জোতদার ও মহাজনের শোষণ এবং মুনাফাখোরদের মজুতদারির ফলে সামান্য খাদ্যও সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যায়। তাই নাটকে আমরা দেখি প্রধান সমাদ্দার ও তার পরিবারের তীব্র খাদ্যের অভাব এবং তার ফলে মৃত্যু। আর এই ঘটনার মধ্যে কুঞ্জের স্ত্রী রাধিকাকে বলতে শুনি-
"ভাত দাও। আমার বাবা মরছে, ভাত দাও। আমার ছেলে মরছে, ভাত দাও।"
খাদ্যের অভাবে পরিবারের সদস্যরা গ্রাম ছেড়ে শহরে পাড়ি দিতে বাধ্য হয়। প্রধানের দুই পুত্র অনাহারে মারা যায়, কুঞ্জের শিশুসন্তানও মারা যায়। এই মৃত্যু ও বিচ্ছেদই সবচেয়ে বড় দুর্গতি। এছাড়াও নবান্ন নাটকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অঙ্কে শহরের ফুটপাত ও লঙ্গরখানার চিত্র আরও ভয়াবহ দুর্গতি তুলে ধরে। আর সেখানে-
• রাস্তায় অনাহারে মানুষের মৃত্যুর ঘটনা সাধারণ হয়ে দাঁড়ায়। নিরঞ্জনের শিশুসন্তানের মৃত্যু এবং পঞ্চাননীর অসহায়তা সেই দুর্ভাগ্যের প্রতীক।আর সেখানে পঞ্চাননীকে বলতে শুনি-
"এই তো আমার ছেলে, না খেয়ে ম'রে গেল! বাবু, দু'টি খেতে দাও!"
খাদ্যের অভাবে মানুষ চুরি, ভিক্ষা এমনকি দেহ বিক্রির মতো জঘন্য পথেও নামতে বাধ্য হয়, যা মানবিকতার চূড়ান্ত অবক্ষয়কে নির্দেশ করে।আর সেকারণেই দুর্গতি আরও বাড়ে, যখন শহরের ধনী শ্রেণী অভুক্তদের প্রতি চরম উদাসীনতা দেখায়। তাদের কাছে অনাহারী মানুষ কেবল 'উপদ্রব' মাত্র।
২. 'নবান্ন' নাটকটি প্রতিরোধের নাটক
আমরা দেখি যে,নাটকের শেষ ভাগে এসেও দুর্গতি থেমে থাকে না। তবে তা রূপ নেয় এক সম্মিলিত প্রতিরোধ ও সংকল্পের শক্তিতে। এখানেই নাটকটি ট্র্যাজেডির ঊর্ধ্বে উঠে এসে গণনাট্যের আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করে। তাই -
ব্যক্তিগত দুঃখ-কষ্টকে জয় করে মানুষ একত্রিত হতে শেখে। তারা বুঝতে পারে তাদের দুর্ভাগ্যের জন্য দায়ী কোনো দৈবশক্তি নয়, বরং সমাজের শোষণকারী শক্তি। যেখানে -
• লঙ্গরখানায় কুঞ্জ যখন ক্ষুধার্ত মানুষের দুর্দশা দেখে তখন তার মধ্যে প্রথম প্রতিরোধের আগুন জ্বলে ওঠে। সে এককভাবে নয়, বরং সমষ্টিগতভাবে সে লড়াই করার আহ্বান জানায়-
"আর পাঁচজনের যে অবস্থা হয়েছে, আমাদেরও সেই অবস্থা হবে। দশজনের মতো আমাদেরও ঐ রাস্তায় নেমে দাঁড়াতে হবে।"
নাটকের চতুর্থ অঙ্কে চরিত্ররা শহরে ভিড়ের জীবন ছেড়ে আবার গ্রামে ফিরে যায়। এই ফিরে আসা কেবল স্থান পরিবর্তন নয়, এটি হলো আত্মমর্যাদা ও আত্মনির্ভরশীলতা ফিরে পাওয়ার প্রতীক। যেখানে প্রধান সমাদ্দার, কুঞ্জ ও রাধিকার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পতিত জমিতে আবার ধান ফলানোর উদ্যোগ নেয়। অতঃপর তারা শপথ করে বলতে থাকে-
"আমরা আর মরবো না। এবার মরতে হয় তো লড়তে লড়তে মরবো।"
অবশেষে নাটকে আমরা দেখি যে,'নবান্ন' উৎসব। যেখানে নাটক শেষ হয় সম্মিলিত 'নবান্ন' উৎসবের মধ্য দিয়ে। এই উৎসব কেবল ফসল তোলার আনন্দ নয়, এটি হলো জীবনের জয়, শোষকের বিরুদ্ধে শ্রমিকের জয় এবং নতুন সমাজ গড়ার দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। তাই আমরা প্রধানের কণ্ঠে শুনতে পাই সেই নতুন প্রত্যয়ের আহ্বান-
"পেয়েছি! আমি ফিরে পেয়েছি! তোমাদেরকে, আমার ধানকে, এই মাটি!..."
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,বিজন ভট্টাচার্যের 'নবান্ন' তাই কেবল দুর্ভিক্ষের নিছক বর্ণনা নয়। এটি একদিকে যেমন মন্বন্তরের দুর্গতির ভয়াবহতা উন্মোচন করেছে। ঠিক তেমনি অন্যদিকে সেই দুর্গতিকে পুঁজি করে নতুন জীবনের পথে এগিয়ে যাওয়ার সম্মিলিত প্রতিরোধের শক্তিকে তুলে ধরেছে। এই নাটকীয় টানাপোড়েনর মধ্যে দিয়েই নাটকটির মধ্যে দুর্গতির পাশাপাশি প্রতিরোধের বিষয়টি নিশ্চিতভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা, সাজেশন, ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের "SHESHER KOBITA SUNDARBAN" Youtube channel 🙏
Comments
Post a Comment