বিজন ভট্টাচার্যের নবান্ন নাটকের নামকরণের স্বার্থকতা বিচার করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর)
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,বিজন ভট্টাচার্যের কালজয়ী নাটক 'নবান্ন'-এর নামকরণ অত্যন্ত সার্থক ও ব্যঞ্জনাময়। তবে এখানে নামকরণটির সার্থকতা বোঝার জন্য এর আক্ষরিক ও ব্যঞ্জনামূলক উভয় অর্থ আলোচনা করা প্রয়োজন। কারণ শিল্পের নামকরণও শিল্প কুশলতার বিচার্য বিষয়। আর নামকরণের মধ্যে দিয়ে শিল্পীর মানসিকতার পরিচয় অভিব্যক্ত হয়। আর সেই কারণে নাটকের শিরোনাম নির্মাণের ক্ষেত্রে নাট্যকারেরা নাটকের কেন্দ্রীয় বিষয়ে প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। তাই আমরা সমগ্র নাটকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা ও তার পরিপ্রেক্ষিতে হাহাকার, দুর্ভিক্ষ, মড়ক ইত্যাদি দেখতে পাই। আর সেখানে-
নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য নবান্ন নাটকের নামকরণ রচনার ক্ষেত্রে সতর্ক দৃষ্টি পরিচয় দিয়েছে।নবান্ন কথাটির অর্থ নতুন অন্ন।বাঙালি সমাজের নতুন চাল উঠলে তা নিয়ে নানা খাদ্য খাবার তৈরি হয় এবং এই উপলক্ষ্যে নবান্ন উৎসব পালিত হয়। আর এ নাটকে নাট্যকার একদিকে যেমন বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নবান্ন নাটকের পরিবেশ গড়েছেন, অপরদিকে এরই মধ্যে স্থান নিয়েছে গরিব চাষীদের ক্ষয়ক্ষতি, হাহাকার, অত্যাচার। আবার তাদের অবস্থার উন্নতির ফলে জীবন ফিরে পেয়ে নবান্ন উৎসবে মেতে ওটা এ সমস্ত দৃশ্যকে কেন্দ্র করে নাট্যকার নবান্ন নাটকের প্রেক্ষাপটের এক নতুন মাত্রা দিয়েছেন। তাই নবান্ন নাটকের নামকরণ সহজ, সরল রীতিতে যে করা হয়নি তা নাটকের বিষয়বস্তু দেখলেই আমারা বুঝতে পারি।তবে-
সময়ের প্রেক্ষাপটে নবান্ন নাটক বিচার করলে দেখা যায় বিদেশী শাসনের শোষণে, নানা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কারণে কিভাবে গ্রাম বাংলার সুখ শান্তি বিনষ্ট হয়।আবার অন্যভাবে দুর্ভিক্ষে ও মহামারীতে গ্রাম বাংলার প্রাণশক্তি বিনষ্ট হয়ে যায়। যার ফলে আনন্দ উৎসব গ্রাম বাংলা থেকে মুছে যায়।আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দাঙ্গা, বন্যার ফলে গ্রামের দৈন্যদশা উপস্থিত হয়। অর্থাৎ পঞ্চাশের মন্বন্তরে গ্রাম বাংলা শ্মশান ভূমিতে পরিণত হয়। দুর্ভিক্ষের শিকার হয়ে হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হয়। গ্রামের মানুষ খাদ্যাভাবে শহরে ভিখারিতে পরিণত হয়। তাই এখন গ্রামের মানুষের অবস্থা তখন বাঁচা মরার সমান। আর সেখানে-
নাট্যকার নবান্ন নাটকের দুর্ভিক্ষে পীড়িত মানুষের ছবি এঁকেই ক্ষান্ত হননি। তবে নাটকের নামকরণের প্রশ্নে নাট্যকার চতুর্থ অঙ্কে নাটকের কাহিনীর পরিবর্তন ঘটান। বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহের হাত থেকে মুক্ত চাষিরা পুনরায় গ্রামে ফিরে আসে। চাষীদের আকাঙ্ক্ষিত শোষণমুক্ত আদর্শায়িত জীবন পুনর্গঠনের সম্মিলিত ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে শপথ গ্রহণের চিত্র ফুটে তুলতে দ্বিধাবোধ করেনি। আসলে নাট্যকার ভালো করেই জানেন যে, মানুষের জীবনে দুঃখ,কষ্ট, মৃত্যু যেমন সত্য তেমনি সত্য, জীবনে ভালবসার পথে উত্তরণ। তাই
নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য নবান্ন নাটকের শেষে নবান্ন উৎসবের মিলন মেলা সৃষ্টি করে যেন জীবনের চিরন্তন সত্যকে রূপায়িত করেছেন। নবান্ন উৎসব এখানে প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই উৎসবের একদিকে যেমন মুসলমান সম্প্রদায় অর্থাৎ বরকত,রহিমের মত চরিত্রগুলি উপস্থিত ঠিক তেমনি দয়াল মন্ডল,কুঞ্জ,নিরঞ্জন এর মতো আরো অসংখ্য হিন্দু চরিত্রগুলিও উপস্থিত ছিল। এই উভয় সম্প্রদায়ের সম্মিলিত শক্তিই যে একদিন সমাজ ও জীবনকে পুষ্ট করবে তা নবান্ন নাটকের নামের মধ্যে লুকিয়ে আছে।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, নবান্ন নাটকের একদিকে যেমন ধনী আত্মকেন্দ্রিক ব্যক্তির উপস্থিতি, যারা স্বার্থ সর্বস্ব, বিবেক শূন্য মানুষের বাস্তব বিমুখ ভোগ বিলাসী মানসিক জীবনের উল্লাস, অপরদিকে তেমনি সহজ,সরল, পীড়িত, বাঁচার তাগিদে সর্বহারা মানুষের ক্ষুধার জন্য মর্মান্তিক হাহাকার।এই উভয়ের বর্ণনার মধ্যে দিয়ে নাট্যকার নাটকের পরিবেশ তৈরি করেছেন।নাট্যকার নবান্ন নাটকের মধ্যে দিয়ে শোষকের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে কিভাবে শোষিত সম্প্রদায়ের সঙ্ঘবদ্ধ সংগ্রামকে প্রকাশ করেছেন এবং এক নতুন পরিবেশের সৃষ্টি করতে চেয়েছেন । আর এই সকল গুণ সমন্বয়ে নবান্ন নাটকের নবান্ন নামকরণটি অবশ্যই স্বার্থকতায় পর্যবসিত হয়েছে।
Comments
Post a Comment