Skip to main content

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'ডাকঘর' নাটকের নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করো ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'ডাকঘর' নাটকের নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ দ্বাদশ শ্রেণী চতুর্থ সেমিস্টার)।

    আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,'ডাকঘর' একটি প্রতীকাশ্রয়ী বা রূপকধর্মী নাটক।আর নাটকটির নামকরণ আপাতদৃষ্টিতে একটি সাধারণ প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে হলেও সেখানে এর গভীর প্রতীকী ব্যঞ্জনা রয়েছে। আর এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমরা নাটকটিকে দুটি দিক থেকে এর সার্থকতা বিচার করতে পারি-

১)আক্ষরিক অর্থে নাটকটির নামকরণের সার্থকতাঃ

         আমরা জানি যে, ডাকঘর নাটকটির কেন্দ্রীয় চরিত্র বালক অমল।আর তার ঘরের বাইরের জগতকে জানার প্রধান অবলম্বন হল তার জানালার সামনে ডাকঘরটি।যেখানে নাটকটির কেন্দ্রবিন্দু-

       'ডাকঘর'। আর সেখানে নাটকের সমস্ত ঘটনা এই ডাকঘরকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে।আর সেখানে ডাকঘরের কাজ, রাজার চিঠি আসার সম্ভাবনা এবং অমলের সেই চিঠি পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা এগুলিই হলো নাটকের মূল চালিকাশক্তি।পাশাপাশি-

      দইওয়ালা, প্রহরী, মোড়ল, ঠাকুরদা প্রমুখ চরিত্ররা ডাকঘরের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত।এই চরিত্রগুলি বাইরের পৃথিবীর খবর নিয়ে আসে,যা অমলের বদ্ধ জীবনের একমাত্র আলোর উপকরণ।তবে-

           ডাকঘরের মধ্য দিয়েই রাজার চিঠি আসার প্রতীক্ষা অমলের জীবনকে এক ভিন্ন তাৎপর্য এনে দেয়।অমল বিশ্বাস করে,একদিন রাজা স্বয়ং তাকে ডাক দেবেন বা তার কাছে চিঠি পাঠাবেন। আর এই বিশ্বাসই তাকে ঘরের বাইরে মুক্ত পৃথিবীর স্বপ্ন দেখায়।আর অপরদিকে-

     ২)প্রতীকী বা ব্যঞ্জনামূলক অর্থে সার্থকতাঃ

 ডাকঘর নাটকের নামকরণের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত আছে এর রূপক অর্থে।আর সেখানে-

            'ডাকঘর' প্রতীকী অর্থে মুক্তি বা আনন্দের বার্তার কেন্দ্র।এটি বাইরের মুক্ত পৃথিবী বা আধ্যাত্মিক জগতের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম।পার্থিব বন্ধন থেকে মুক্তি বা মৃত্যু-পরবর্তী চিরন্তন শান্তি ও মুক্তিই হলো এই নাটকেরে প্রতীকী অর্থ। তবে-

            'রাজার চিঠি' এই নাটকে প্রতীকী অর্থে মৃত্যুর আহ্বান বা পরলোকের হাতছানি।আসলে এই চিঠি পেলেই অমল এ জগতের  সকল বন্ধন ছিঁড়ে মুক্ত হতে পারবে।আসলে অমলের কাছে এই রাজার চিঠি এক পরম আকাঙ্ক্ষিত বিষয়।যা জীবনের সব দুঃখ দূর করে মুক্তি এনে দেবে। তবে এই নাটকটিতে-

           বালক অমল হল মুক্তিকামী আত্মা-র প্রতীক। রোগ ও সমাজের নিয়মের বেড়াজালে বন্দি হয়েও সে মুক্তির স্বপ্ন দেখে। শুধু তাই নয়-

         আলোচ্য নাটকে ডাকঘর কেবল একটি ইমারত নয়, এটি বাইরের জগতের প্রতি অমলের দুর্নিবার আকর্ষণ এবং তার মুক্তিকামী চেতনার কেন্দ্রবিন্দু।তাই নাটকের শেষে রাজার আগমন বার্তা ও অমলের মৃত্যুর ইঙ্গিত দেয় যে, ডাকঘরের মাধ্যমে আসা রাজার চিঠির প্রতীক্ষা সার্থক হয়েছে। আর সেই কারণে আমরা বলতে পারি, নাটকটির আখ্যানভাগ ও তার গভীর প্রতীকী ব্যঞ্জনা এই দুই দিক থেকেই 'ডাকঘর' নামটি অবশ্যই যথার্থ, সার্থক ও তাৎপর্যপূর্ণ।

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...