ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সীতার বনবাস অনুবাদ গ্ৰন্থটিতে নারী একদিকে নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অপরদিকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কঠোর সমালোচনা করেছেন-আলোচনা করো ।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সীতার বনবাস অনুবাদ গ্ৰন্থটিতে নারী একদিকে নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অপরদিকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কঠোর সমালোচনা করেছেন-আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মাইনর)।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর 'সীতার বনবাস' অনুবাদ রচনার মাধ্যমে প্রধানত এ সমাজের নারী-নির্যাতনের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কঠোর সমালোচনা-র মধ্য দিয়ে অনুবাদ গ্ৰন্থটিকে সার্থকমন্ডিত করে তুলেছেন।শুধু তাই নয়, এই অনুবাদ কর্মের মাধ্যমে নারী সমাজকে যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে উৎসাহিত করেছেন তেমনিভাবে পুরুষ সমাজকে সতর্ক করে দিয়েছেন।আর এই প্রেক্ষিতে সেখানে আমরা দেখি যে-
• মূল রামায়ণ বা ভবভূতির 'উত্তরচরিত' অবলম্বনে সীতার বনবাস অনুবাদ গ্ৰন্থটি রচিত হলেও, বিদ্যাসাগর এই রচনার মাধ্যমে সীতার বনবাসের করুণ আখ্যানকে ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা সমাজের প্রেক্ষাপটে ফেলে সমকালীন নারীজাতির প্রতি ঘটে চলা অন্যায়, অবিচার ও অসহায়ত্বের চিত্রটি তুলে ধরেছেন। আর এই চিত্র তুলে ধরার মধ্যে দিয়ে বিদ্যাসাগর মহাশয় এ সমাজের কিছু বার্তা দিতে চেয়েছিলেন। সেই বার্তার মধ্যে ছিল কিছু উদ্দেশ্য। সেখানে সেই উদ্দেশ্যগুলিতে আমরা পাই-
১)নারীর প্রতি সমাজের অবিচার ও সমালোচনাঃ
সীতাকে জননিন্দা বা প্রজার মনোরঞ্জনের জন্য রামচন্দ্র বনবাসে পাঠান।বিদ্যাসাগর এই ঘটনাকে নারীর প্রতি সমাজের অবিচার এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার চূড়ান্ত রূপ হিসেবে দেখিয়েছেন।সীতা দুইবার সতীত্বের প্রমাণ দেওয়া সত্ত্বেও সমাজ তাকে গ্রহণ করেনি। আসলে-
বিদ্যাসাগর মহাশয় বোঝাতে চেয়েছেন যে,সমাজে যখন ব্যক্তি-সত্যের চেয়ে জন-অপবাদ বড় হয়ে ওঠে, তখন সেই সমাজ ভীষণ নির্মম পরিহাসে পরিণত হয়।যার মাধ্যমে তিনি তৎকালীন হিন্দু সমাজের বিধবা ও সাধারণ নারীদের প্রতি অত্যাচারের চিত্রটি ফুটিয়ে তোলেন।যাদের সামান্য লোকনিন্দার কারণেই চরম দুঃখ ভোগ করতে হতো।আর সেখানে আমরা দেখি-
২)রাজার কর্তব্য ও ব্যক্তিগত সুখের সংঘাতঃ
রামের কাছে রাজধর্ম পালন ছিল ব্যক্তিগত প্রেম ও সুখের থেকেও বড়।রামের এই চরম আত্মত্যাগ নিঃসন্দেহে মহৎ, কিন্তু সীতাকে নির্দোষ জেনেও বনবাসে পাঠানোয় যে করুণ রস সৃষ্টি হয়েছে, তার মাধ্যমে বিদ্যাসাগর এই বার্তা দেন যে, সমাজের তথাকথিত কর্তব্যবোধের নামে ব্যক্তিজীবন ও নারীর প্রতি এই অবিচার অমানবিক।আর সেখানে আমরা দেখি-
৩)মানবিক আবেদনঃ
বিদ্যাসাগর তাঁর সংস্কারমূলক কাজে যেমন বিধবা বিবাহ প্রচলন ও নারীশিক্ষায় জোর দিয়েছিলেন, ঠিক তেমনি এই রচনাতেও তিনি সীতার সহানুভূতি ও করুণা জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন।আর এখানে তিনি সীতাকে একজন রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে দেখিয়েছেন, যিনি মানসিক আঘাতে বারবার মূর্ছা যান, অলৌকিকতার আশ্রয় নেননি (যেমন সীতার পাতাল প্রবেশ অংশটি পরিহার করেছেন)।এর মধ্য দিয়ে তিনি পাঠকের মনে মানবিকতা ও সহমর্মিতার বীজ রোপণ করতে চেয়েছেন।
৪)বাংলা গদ্যের প্রতিষ্ঠা ও সরলতাঃ
বিষয়বস্তুর বাইরেও, 'সীতার বনবাস' রচনার মাধ্যমে বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যের সরলতা ও সাবলীলতা প্রতিষ্ঠা করেন।এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে রামায়ণের মতো শাস্ত্রীয় আখ্যানকে সহজবোধ্য করে তুলে জ্ঞান ও করুণার বার্তাটি সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছে দেওয়াই ছিল তাঁর অন্যতম উদ্দেশ্য। আর সেখানে -
আমরা বলতে পারি যে,'সীতার বনবাস' রচনাটি শুধু অনুবাদ নয়, এটি হল ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা সমাজের নারী-নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিদ্যাসাগরের বজ্রকঠিন প্রতিবাদ, যা করুণরসের আবরণে মানবিকতার বার্তাবহন করে।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏
Comments
Post a Comment