Skip to main content

উনিশ শতকের বাংলা গদ্য সাহিত্যের বিকাশে প্যারিচাঁদ মিত্রের অবদান আলোচনা করো।

উনিশ শতকের বাংলা গদ্য সাহিত্যের বিকাশে প্যারিচাঁদ মিত্রের অবদান আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, পঞ্চম সেমিস্টার, বাংলা মাইনর-ইউনিট1)

             আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,বাংলা গদ্যের বিকাশে প্যারীচাঁদ মিত্র, যিনি সাহিত্যের আঙিনায় টেকচাঁদ ঠাকুর নামে অধিক পরিচিত। যিনি বাংলা গদ্যের বিকাশে বা অবদানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দায়িত্ব সহকারে নিজের কাঁধে তুলে নেন। কারণ আমরা জানি যে,উনিশ শতকে যখন বাংলা গদ্য সংস্কৃত প্রভাবিত, কৃত্রিম সাধু ভাষার কঠিন বাঁধনে আবদ্ধ ছিল, তখন তিনি বাংলা ভাষাকে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষার কাছাকাছি এনে একটি নতুন ধারা সৃষ্টি করেন।আর সেই প্রেক্ষিতে আমারা বাংলা গদ্যের বিকাশে তাঁর কৃতিত্ব বা অবদানে দেখতে পাই, সেগুলি হলো -

১)প্রথম সামাজিক সার্থক উপন্যাস রচনা।তাঁর লেখা 'আলালের ঘরের দুলাল' (১৮৫৭) উপন্যাসটিকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম সামাজিক উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। অতঃপর এই উপন্যাস রচনার পর বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের জন্ম হয়। শুধু তাই নয়, বাংলা গদ্যের বিষয়বস্তু ধর্ম ও ইতিহাস থেকে সরে এসে সমাজ ও বাস্তব জীবনের দিকে মোড় নেয়। যা একেবারেই নতুন ও ভিন্ন ভাবধারা।আর এই ভাবধারার পর-

২)চলিত ভাষারীতির প্রবর্তন।প্যারিচাঁদ মিত্র তাঁর রচনায় কলকাতার সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাকে সাহিত্যিক মর্যাদা দান করেন। শুধু তাই নয়,তাঁর ব্যবহৃত এই ভাষাভঙ্গি যা সাহিত্যে 'আলালী ভাষা' নামে পরিচিত।যেটি ছিল সংস্কৃত-বহুল সাধু ভাষার কাঠিন্যমুক্ত, সহজ, সরল, সাবলীল ও ব্যঙ্গাত্মক।যদিও-

          'আলালী ভাষা' পরবর্তীকালে পূর্ণাঙ্গ চলিত ভাষারূপে প্রতিষ্ঠা পায়নি। তবুও এই চলিত বাংলা নিঃসন্দেহে গদ্যরীতির প্রথম সফল প্রচেষ্টা এবং বাংলা গদ্যকে পাঠকের কাছে সহজবোধ্য করে তোলার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী অন্যতম সাহসী পদক্ষেপ ছিল।আর সেখানে আমরা দেখি- 

৩)বাস্তবতা ও সমাজচেতনা।প্যারিচাঁদ মিত্রের অন্যতম কৃতিত্ব হলো-তাঁর লেখায় তৎকালীন সমাজের বাস্তব চিত্র, বিশেষ করে ক্ষয়িষ্ণু সমাজের কুসংস্কার, বাবু সংস্কৃতি ও নৈতিক অবক্ষয় হাস্য-ব্যঙ্গের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।যার ফলে বাংলা গদ্য শুধুমাত্র জ্ঞানচর্চার মাধ্যম না সীমাবদ্ধ না থেকে সামাজিক সমালোচনার শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়-

৪)বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য।প্যারিচাঁদ মিত্র সাহিত্য রচনার পাশাপাশি সমাজসংস্কারমূলক ও জনকল্যাণমূলক রচনাতেও গদ্য ব্যবহার করেন।আর সেখানে আমরা দেখি- 'রামারঞ্জিকা' (স্ত্রী শিক্ষামূলক গ্রন্থ), 'জমিদার ও রায়ত' (কৃষক-জমিদার সম্পর্ক বিষয়ক) বিশেষ গ্ৰন্থগুলি।যে গ্ৰন্থগুলিতে গদ্যের ব্যবহারিক অনেক ক্ষেত্র প্রসারিত হয়। তবে-

৫) বাংলা সরলীকরণের পথপ্রদর্শক প্যারিচাঁদ মিত্র।সংস্কৃতের অনুকরণে সৃষ্ট সাধু গদ্যকে ভেঙে সহজ, সরল, গতিশীল ও সর্বজনগ্রাহ্য একটি গদ্যরীতি প্রবর্তনের ক্ষেত্রে প্যারীচাঁদ মিত্র ছিলেন একজন অন্যতম পথিকৃৎ।আর সেই পথিকৃতের ভাষা পরবর্তী লেখকদের চলিত ভাষা প্রবর্তনে প্রেরণা জোগাতে বিশেষ করে সহায়তা করেছিল।

        পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,প্যারীচাঁদ মিত্র বাংলা গদ্যকে নীরস পাণ্ডিত্যপূর্ণ সাধু জটিল ভাষার কবল থেকে মুক্ত করে জনজীবনের কাছাকাছি নিয়ে আসেন।শুধু তাই নয়, বাংলা সাহিত্যে প্রথম উপন্যাসের জন্ম দিয়ে উপন্যাস সাহিত্যকে এক নতুন মাত্রার দিগন্ত উন্মোচন করেন। আর এখানেই প্যারিচাঁদ মিত্রের বিরল কৃতিত্ব।

     ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা অনার্স (DSE3/4) সাজেশন ২০২৫

       West Bengal State University                                       BA Honours, 6th Semester                                         SUGGESTION 2025                                                      BNGA,DSE05T( DSE3/4)  • বাংলা কথাসাহিত্যঃ মন্বন্তর, দাঙ্গা ও দেশভাগ• একক-১(২০২১) ক) দেশভাগের ইতিহাসের বাস্তব রূপ বাংলা সাহিত্যে  কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে কয়েকটি উপন্যাস অনুসরণে তার পরিচয় দাও। • ১৯৪৬ দাঙ্গা রাজনীতির ট্রাজেডি বাংলা ছোটগল্পের পরিসরে কিভাবে এসেছে, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি রচনা অবলম্বনে আলোচনা করো। (২০২২) পঞ্চাশের মন্বন্তরের বাস্তব বর্ণনা করে বাংলা উপন্যাসে তার কতটা প্রতিফলন ঘটেছে, সে বিষয়ে আলোকপাত করো। •দেশভাগের ক...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...